ফারদিনের রহস্যময় মৃত্যু

১৫ মাস ধরে বিচারের আশায় ঘুরছেন বাবা 

`এক বছর ৩ মাস আগে আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়, কিন্তু আজও আমার ছেলের হত্যাকারী ও হত্যার কারণ জানাতে পারেনি পুলিশ। আদালতে ডিবি (গোয়েন্দা পুলিশ) যে প্রতিবেদন জমা দেয় সেখানে সত্য ঘটনা ওঠে আসেনি, ফলে আমি নারাজি দেই। এরপর অধিকতর তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় সিআইডিকে, কিন্তু আদালত থেকে ১০ বার সময় বাড়িয়ে দেওয়ার পরও তারাও সত্য উদঘাটনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। আর এদিকে সন্তান হারানোর বেদনায় আমি প্রতিদিন কেঁদে যাচ্ছি। আমার কষ্টটা আপনারা বুঝবেন না, কেবল সন্তান হারানো পিতারাই আমার কষ্ট উপলব্ধি করতে পারবে। 

এই এক বছর ৩ মাস সময় ধরে পুলিশ, সিআইডি, ডিবি আদালতে প্রতিটি জায়গায় আমি বিচারের আশায় ঘুরছি। কিন্তু কোনো ফল পাচ্ছি না'- শনিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) দেশ রূপান্তরকে কথাগুলো বলছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র ফারদিন নূর পরশ হত্যা মামলার বাদী ও ফারদিনের বাবা নূরউদ্দিন রানা। 

নূরউদ্দিন রানা বলেন, আমার ছেলের হত্যা রহস্য ও তদন্ত প্রতিবেদন সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের রহস্যের মতো হয়ে যাচ্ছে। সাগর-রুনির তদন্ত প্রতিবেদন জমার সময় ১০০ বারের বেশি পেছানো হলেও তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি তদন্ত সংস্থা। একইভাবে আমার ফারদিনের তদন্ত প্রতিবেদন জমার সময় ১০ বার পিছিয়েছে, তবুও রহস্য উদঘাটন করা হচ্ছে না।  

নূরউদ্দিন রানার দাবি, তদন্ত সংস্থাই অপহরণকারী ও খুনিদের আড়াল করে রাখছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, চিকিৎসকরা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে জানিয়েছেন ফারদিনকে হত্যা করা হয়েছে অথচ ডিবি ও র‍্যাব বলছে আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়নি, সে আত্মহত্যা করেছে। এখন আমি কার কথা বিশ্বাস করব চিকিৎসক নাকি ডিবি ও র‍্যাবের? 

তিনি বলেন, আমার ছেলে যদি আত্মহত্যাই করবে তাহলে বান্ধবীকে রামপুরায় নামিয়ে দেওয়ার পর আত্মহত্যার জন্য হাতিরঝিল থাকতে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে কেন যাবে? এসব ডিবির অসাধু ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বানোয়াট কেচ্ছাকাহিনী।

বুয়েট ছাত্র ফারদিন নূর পরশ নিখোঁজ হন ২০২২ সালের ৪ নভেম্বর। নিখোঁজের ৩ দিন পর নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। ৯ নভেম্বর তার বাবা রামপুরা থানায় বান্ধবী বুশরাকে আসামি করে মামলা করেন। এরপর ১৭ই নভেম্বর ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন দেয় ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, আঘাতজনিত কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। মাথায় ও বুকের পাঁজরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। মূলত মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ফলেই তার মৃত্যু হয়। নারায়ণগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন এএফএম মশিউর রহমান সে সময় 
গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, ‘ফারদিনকে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। তার বুকের দুপাশে দুই-তিনটি ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন আমরা পেয়েছি। পাশাপাশি তার মাথায় চার-পাঁচটি আঘাতের চিহ্ন ছিল। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে।’

ফারদিন হত্যার পর প্রাথমিকভাবে র‍্যাব জানিয়েছিল মাদক চোরাকারবারিরা ফারদিনকে খুন করে থাকতে পারে। কিন্তু এক মাস তদন্তের পর ডিবি ও র‌্যাব এক সঙ্গেই জানিয়েছিল, ফারদিনকে খুন করা হয়নি, ফারদিন 'আত্মহত্যা' করেছেন।

বুয়েট ছাত্র আবরার হত্যাকাণ্ডের পর পুরো বুয়েট জুড়ে ছাত্র রাজনীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে ওঠে তার অন্যতম ছিলেন ফারদিন। বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের ১৫ আগস্ট ২০২২-এর অনুষ্ঠান প্রতিহত করতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা যে লাউড এনড ক্লিয়ার' ক্যাম্পেইন করে ফারদিন ছিলেন তার অন্যতম। আববার ফাহাদ হত্যার প্রেক্ষাপটে তার প্রোফাইল পিকচারটি (যাতে তিন বানরের চোখ, কান ও মুখবন্ধ কার্টুন) ভাইরাল হয়েছিল। নূরউদ্দিন রানার কণ্ঠে বুয়েটের বিরুদ্ধেও ক্ষোভ ফুটে ওঠে। 

তিনি বলেন, যে বুয়েটে আমার ছেলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে লড়াই করল, সেই বুয়েট আমার পরিবারের পাশে দাঁড়ায়নি। আমার ছেলের বিচারটা পর্যন্ত চায়নি। শিক্ষার্থীর প্রতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কী কোনো দায়বদ্ধতা নেই? 

ফারদিন ভালো মানের বিতার্কিক ছিলেন। মৃত্যুর আগে স্পেনের মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিজ ডিবেটিং চ্যাম্পিয়নশিপ'-এ অংশ নেওয়ার কথা ছিল তার। ডিবি ও র‍্যাব গণমাধ্যমে দাবি করেছিল- হতাশা ও আর্থিক চাপের কারণে ফারদিন আত্মহনন করেছেন। ফলাফল খারাপ হওয়া ও স্পেনের বিতর্ক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার খরচ মেলাতে না পারা নিয়ে ফারদিন হতাশায় ছিলেন। তবে এই দুই সংস্থার দাবি প্রত্যাখ্যান করেন ফারদিনের বাবা। তিনি বলেন, খুনী ধরতে গিয়ে যখন ভিক্টিম আত্মহত্যা করেছে বলে খোদ তদন্ত সংস্থাই দাবি করে তখন বুঝতে বাকী থাকে না, ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। 

পুত্র হারানো পিতাকে যখন হত্যাকারীকে গ্রেপ্তারের দাবি বাদ দিয়ে ছেলে আত্মহত্যা করেনি তা প্রমাণ করতে হয় তা খুবই মর্মান্তিক দাবি করে কাঁদতে থাকেন ফারদিনের বাবা নূরউদ্দিন রানা। 

তিনি বলেন, ফারদিন যে রাতে নিখোঁজ হয় সে রাতে তার গতিবিধি ছিল অস্বাভাবিক। যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও জানিইয়েছিল। এ বিষয়ে বারবার তাগাদা দিলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে সদুত্তর পাইনি। ওই রাতে সিসিটিভিতে দেখা যায়,  ফারদিন যাত্রাবাড়ীতে লেগুনায় উঠছে, কিন্তু সেই লেগুনায় ফারদিনের আগে কারা উঠেছিল সেই ফুটেজ নেই। তার লেগুনায় ওঠার ৩০ মিনিট আগের ফুটেজ উদ্ধার করলেই দেখা যেত লেগুনায় কারা কারা উঠেছিল। লেগুনায় আগে থেকে যারা উঠেছিল তারাই ফারদিনকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে হত্যা করে। শুধু তাই নয় খুনিদের বাঁচাতে ওই রাতের যাত্রাবাড়ীর টেম্পু স্ট্যান্ডের পুরো সিসিটিভি ফুটেজটি গায়েব করা হয়েছে। অথচ লেগুনায় ওঠার পর আমার ফারদিনকে আর জীবিত পাওয়া যায়নি।

তিনি দাবি করেন, সেই রাতে ফারদিনের অস্বাভাবিক মুভমেন্টের রহস্যময়তা ভাঙতে হবে তদন্তের দায়িত্বে থাকা সিআইডি’কে। তাহলেই খুনিদের শনাক্ত করা যাবে। 

নূরউদ্দিন রানা অভিযোগ করেন, শুরুতে ডিবি ও র‍্যাব দাবি করেছিল ফারদিনকে হত্যা করা হয়েছে। শুরুতে তারা ফারদিন হত্যায় চনপাড়ার সিটি শাহীন ও চেয়ারম্যান বজলুর রহমানের সম্পৃক্ততার কথা জানায়। অথচ পরে খুনিদের সাথে সমঝোতায় গিয়ে আমার ছেলে আত্মহত্যা করেছে বলে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে তদন্ত সংস্থা ডিবি। আমি এর বিপক্ষে আদালতে নারাজী দিয়েছি। 

কেবল তাই নয় হত্যার দীর্ঘদিন পেরিয়ে যাওয়া ও মামলার তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার ১০ মাস পর গত ৬ ফেব্রুয়ারি সিআইডি’র তদন্ত কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর বেলায়েত হোসেন তাকে হোয়াটঅ্যাপে ম্যাসেজ দেন। রানা বলেন, সেই ম্যাসেজে আমার কাছে জানতে চাওয়া হয় ফারদিনের বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণ নাম, বিভাগ ও শাখা, রোল নম্বর, কোন হলে থাকত, তার আইডি’ কার্ড আছে কি না? –এর চেয়ে বড় বিস্ময়ের আর কী হতে পারে?