ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবি

শোকে ভাসছে মাদারীপুর, লাশের অপেক্ষায় স্বজনরা

ভূমধ্যসাগরে কিছুতেই থামছে না মৃত্যুর মিছিল। লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে প্রাণ হারিয়েছেন আট বাংলাদেশি। এদের মধ্যে ৫ জনের বাড়ি মাদারীপুর। আর বাকি তিনজন গোপালগঞ্জের। মঙ্গলবার (২০ ফেব্রুয়ারি) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এদিকে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর মাদারীপুরে নিহতদের বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

নিহতরা হলেন- মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার শেনদিয়া গ্রামের সজল, একই উপজেলার কদমবাড়ি উত্তরপাড়া গ্রামের পরিতোষ বিশ্বাসের ছেলে নয়ন বিশ্বাস, সরমঙ্গল গ্রামের মামুন শেখ, তেলিকান্দি গ্রামের কাজী মিজানুরের ছেলে কাজী সজীব, রাজৈর উপজেলার কেশরদিয়া গ্রামের কায়সার, গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার রাগদী ইউনিয়নের দাদনের ছেলে রিফাত, একই উপজেলার দিগনগর ইউনিয়নের রাসেল এবং গঙ্গারামপুর গোহালা ইউনিয়নের মো. পান্নু শেখের ছেলে ইমরুল কায়েস আপন।

মঙ্গলবার সরেজমিনে নিহতদের বাড়ি গেলে স্বজনরা জানান, গত ২ মাস আগে মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কবিরাজপুর ইউনিয়নের কিশোরদিয়া গ্রামের মৃত তোঁতা খলিফার ছেলে কায়সার খলিফা (৩৫), বাজিতপুর ইউনিয়নের কোদালিয়া গ্রামের মিজানুর রহমান কাজীর ছেলে সজীব কাজী(১৮), খালিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম স্বরমঙ্গল গ্রামের ইউসুফ আলী শেখের ছেলে মামুন শেখ (২০) ও সেনদিয়া গ্রামের সুনীল বৈরাগীর ছেলে সজল বৈরাগী (২৫) সহ বেশ কয়েকজন যুবক ইতালির উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়। পরে গত বুধবার লিবিয়া থেকে ইঞ্জিনচালিত একটি ছোট নৌকায় দেওয়া হয় তাদের। ৩২ জন ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন নৌকায় ৫২ জনকে নিয়ে ইতালি যাওয়ার পথে তিউনিসিয়ার ভূমধ্যসাগরে নৌকার ইঞ্জিন ফেটে যায়। এতে কায়সার, সজীব, মামুন ও সজলসহ ৯ জন মারা যায়। পরে খবর পেয়ে বেশ কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধার করে স্থানীয় কোস্টগার্ড। এছাড়া এখনো নিখোঁজ রয়েছে একই উপজেলার কদমবাড়ি ইউনিয়নের উত্তর কদমবাড়ি গ্রামের পরিতোষ বিশ্বাসের ছেলে নয়ন বিশ্বাস(২০)।

নিহত কায়সার খলিফার স্ত্রী নাজমা বেগম বলেন, রাজৈরের পাইকপাড়া ইউনিয়নের দামেড়চর গ্রামের মোতালেব মাতুব্বরের ছেলে অবুঝ মাতুব্বর প্রথমে সাড়ে ৮ লাখ টাকা চুক্তিতে লিবিয়া নেয়। পরে বড় ইঞ্জিন চালিত নৌকায় দেওয়ার কথা বলে আরও সাড়ে ৪ লাখ টাকা নিয়ে ছোট একটি নৌকায় পাঠালে দুর্ঘটনাকবলিত হয়ে আমার স্বামী মারা যায়। সব কিছু বিক্রি করে এবং সুদে টাকা এনে স্বামীকে বিদেশে পাঠানোর স্বপ্ন দেখেছিলাম। এখন আমার সবই শেষ হয়ে গেল। আমার দুটি মেয়ে নিয়ে এখন কীভাবে বাঁচবো। দালাল অবুঝ ইতালি থাকে, বাংলাদেশ থেকে তার বাবা মোতালেব চুক্তির টাকা সংগ্রহের কাজ করে বলে জানান তিনি।

নিহত সজীব কাজীর বাবা মিজানুর রহমান কাজী বলেন, গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার রাঘদী ইউনিয়নের গজনিয়া গ্রামের রহিম দালালের সঙ্গে ১৪ লাখ টাকা চুক্তি হয়। রহিমের ভাই কামাল আমার কাছ থেকে নগদ ১২ লাখ নিয়ে আমার ছেলেকে লিবিয়া পাঠায়। পরে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ইতালি পাঠানোর সময় ঘটে এ দুর্ঘটনা। শুনেছি আমার সজীব আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন ছিল। দুইদিন পরে মৃত্যুর খবর পেয়েছি।

নিখোঁজ নয়ন বিশ্বাসের ভাই আকাশ বিশ্বাস বলেন, আমার ভাই ঢাকার এক দালালের মাধ্যমে লিবিয়া গিয়েছিল। পরে এ দুর্ঘটনার খবর শুনেছি। কিন্তু দালালের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ রয়েছে। সে বলেছে আমার ভাই ভাল আছে।

সরকারিভাবে তাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন নিহতের স্বজনরা। এই ঘটনার অভিযুক্ত দালালরা দীর্ঘদিন ধরে লিবিয়া ও ইতালিতে বসবাস করায় তাদের পরিবারের লোকজন এখান থেকে টাকা সংগ্রহের কাজ করে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাজৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদুজ্জামান হাওলাদার আসাদ বলেন, এ বিষয়ে এখনো কেউ অভিযোগ করেনি। নিহতদের পরিবার থেকে অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।