প্রবীণ হিতৈষী সংঘ

কর্তাদের দুর্নীতি কর্মচারীদের ভোগান্তি

সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধিভুক্ত ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে পরিচালিত বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরাবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানটি (বাইগাম) দুর্নীতি এবং নানা অনিয়মে ডুবতে বসেছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন এর ১১৭ কর্মকর্তা ও কর্মচারী। জানা গেছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ থেকে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন হয়ে থাকে। পরিচালনা পর্ষদের দুর্নীতির প্রমাণ মেলায় ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে বেতন ও ভাতা বন্ধ রয়েছে বাইগামের ১১৭ কর্মকর্তা-কর্মচারীর।

গত রবিবার দুপুর ১টার দিকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বাইগামের প্রবেশপথে গিয়ে দেখা যায়, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়মিত বেতন-ভাতা ও কার্যনির্বাহী কমিটি দ্বারা পরিচালনা পদ্ধতি পরিবর্তন করে প্রতিষ্ঠানটিকে সরাসরি সরকারি তত্ত্বাবধানে নিয়ে পরিচালনা করার দাবিতে আন্দোলন করছেন। এ লক্ষ্যে তারা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী, সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য সচিব বরাবর স্মারকলিপি ও খোলা চিঠি দিয়েছেন।

আন্দোলনকারীরা বলেন, বাজারে আগুন আর আমরা বেতন পাই না। যারা দুর্নীতি করছে তদন্তে তাদের নাম উঠে এসেছে, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। আমরা তো কোনো অনিয়ম করিনি, নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছি। তাহলে আমরা কেন শাস্তি পাব।
তারা অভিযোগ করেন, বাইগাম মূলত পরিচালিত হয় তিন বছর মেয়াদি একটি কার্যনির্বাহী কমিটি দ্বারা। এই কমিটিতে যখন যারা দায়িত্বে ছিলেন তারাই নিয়োগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন কেনাকাটায় অনিয়ম করেছেন এবং বিভিন্ন ফান্ডের টাকা তছরুপ করেছেন। কার্যনির্বাহী কমিটির সব অপকর্মে সহযোগিতা করেছেন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা। তাদের পারস্পরিক যোগসাজশে সংঘটিত দুর্নীতির কারণেই মূলত ডুবছে প্রতিষ্ঠানটি, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ কর্মচারীদের।

বাইগামের বর্তমান উপপরিচালক (প্রশাসন) ও আন্দোলনকারীদের নেতা মহসীন কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতিষ্ঠানটিতে শুদ্ধি অভিযানের ভেতর দিয়ে উপপরিচালক হিসেবে আমি দায়িত্ব গ্রহণ করি। বাইগামের যত অনিয়ম ও দুর্নীতি তার মূলে রয়েছে পরিচালনা পর্ষদ। এই পর্ষদের দুর্নীতির কারণেই আমাদের বেতন-ভাতা বন্ধ রাখা হয়েছে। এ পর্ষদের নির্বাচন হলেও ঘুরেফিরে নির্দিষ্ট কিছু মানুষ দায়িত্ব পালন করে। তাই আমরা চাই এ পর্ষদ স্থায়ীভাবে বাতিল করে বাইগামের দায়িত্ব সরাসরি সমাজসেবা অধিদপ্তর নিয়ে এ সংকটের সমাধান করুক এবং আমাদের স্থগিত বরাদ্দ অবিলম্বে ছাড় দেওয়া হোক। 

বাইগামের আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তে গত বছর মার্চে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে সমাজসেবা অধিদপ্তর। এই কমিটি একই বছরের ২৮ মার্চ প্রতিবেদন জমা দেয়, যা হাতে এসেছে দেশ রূপান্তরের।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১০০০ হাজার কেভি সাব-স্টেশন (ট্রান্সফরমার) স্থাপনের জন্য ৭২ লাখ টাকায় কাজ দেওয়া হয় ঠিকাদারকে। দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ না দিয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতা এআর পাওয়ারটেক ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড কোম্পানিকে কাজ দেওয়া হয়। এ কাজ ২০২২ সালের ১০ মার্চের মধ্যে সমাপ্ত করার কথা থাকলেও মাত্র ৪০০ কেভি স্থাপন করেই ৬২ লাখ টাকার বিল তুলে নেওয়া হয়। এরপর থেকে আর কাজে হাত দেননি ঠিকাদার। এই বিল পরিশোধেও কোনো প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে দুর্নীতি করে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। এ ছাড়া দরপত্রে এই স্টেশনের সঙ্গে সোলার প্যানেল দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয়নি। বুয়েটের মাধ্যমে সার্টিফায়েড হওয়ার শর্তও পূরণ হয়নি। শুধু তাই নয়, হাসপাতালের রোগীদের সেবার কথা চিন্তা করে ডায়ালাইসিস মেশিন কেনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু দুর্নীতি করে নতুন মেশিনের জন্য বরাদ্দ টাকা হাতিয়ে নিয়ে একটা পুরনো মেশিন কেনা হয়। এমনকি মেশিন কেনার কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়নি কোনো কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিকেও।

এখানেই শেষ নয়, এই প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির আরও বড় বড় প্রমাণও উঠে এসেছে তদন্ত কমিটিতে। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৯ কোটি টাকার এফডিআর ভেঙে ৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ভাঙানো হয় যার প্রবৃদ্ধিসহ মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে মাত্র ৯৭ লাখ টাকা বিভিন্ন খাতে খরচ করে ৪ কোটি টাকাই আত্মসাৎ করা হয়। টাকা আত্মসাৎ করতে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে একটি পিকনিকের আয়োজন করা হয়। যেখানে ৯০৪ জন অংশগ্রহণকারীর জন্যই কেনা হয় ১ হাজার ৫০০টি শাল। বিলের কাগজে কাশ্মীরি শালের কথা লেখা হলেও পিকনিকে অংশ নেওয়াদের দাবি, এই শাল খুবই নিম্নমানের ছিল। এই শাল কিনতে খরচ দেখানো হয় ১৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা, কিন্তু বাস্তবে খরচ হয়েছে এর চেয়েও অনেক কম টাকা। এই পিকনিকে একেকজন প্রবীণকে আধাকেজি করে খাসি ও মুরগির মাংস খাওয়ানো হয়েছে দাবি করে বিল বানিয়ে টাকা নিয়েছে। এ ছাড়া শুধু ভেন্যু ভাড়া হিসেবেই খরচ দেখানো হয়েছে ৫ লাখ টাকা। একইভাবে প্রয়োজন না থাকার পরও ২০২০-২৩ সাল পর্যন্ত ৬৮ জনকে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ নিয়োগের পেছনে বড় অঙ্কের লেনদেন হয়েছে।

এদিকে যে প্রবীণদের জন্য এ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠেছে তারা মোটেও ভালো নেই। বর্তমানে বাইগামে নারী-পুরুষ মিলিয়ে ৩৬ জন প্রবীণ থাকেন। এই প্রবীণদের খাবার জন্য প্রতিদিন তিনবেলা মিলিয়ে বরাদ্দ থাকে মাত্র ১০০ টাকা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে এ টাকা দিয়ে পুষ্টির কোনো চাহিদাই পূর্ণ হয় না। একাধিক প্রবীণ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানে খাবারের মান খুবই নিম্নমানের। দুপুর ও রাতে মাছ ও মাংস নামমাত্র দেওয়া হলেও এর সাইজ খুবই ছোট থাকে। ভালোমানের খাবার চাইতে গেলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা খারাপ আচরণ করেন প্রতিনিয়ত। এ ছাড়া প্রবীণদের সেবায় যারা নিয়োজিত থাকেন, তাদের বিরুদ্ধেও বাজে আচরণের অভিযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে আবদুল মান্নান ও আমির হোসেন মোল্লার পরিচালনা পরিষদে। তিন বছর মেয়াদি পরিষদে এ দুজন সভাপতি ও মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। তাদের সঙ্গে মিলে বাইগামের উপপরিচালক বদরুল আহসান, সহকারী পরিচালক আশরাফুল আলম মাসুম ও সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা আবদুর রহমান সরকার সুমন যাবতীয় অনিয়ম করেন। সমাজসেবা থেকে যে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছিল সেই কমিটি অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় এবং বিভিন্ন অনিয়মে জড়িত থাকার দায়ে ওই তিন কর্মকর্তাকে শাস্তি হিসেবে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে বাইগাম পরিচালনার জন্য প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (সামাজিক নিরাপত্তা) মো. মোকতার হোসেনকে।
এদিকে সমাজসেবা থেকে প্রশাসক দিয়ে বাইগাম পরিচালনা করা হলেও প্রতিষ্ঠানটিতে পুনরায় পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচনের দাবিতে শামসুল হক-এন্তেজার ও আবদুল মান্নান-রওশনের নেতৃত্বে সক্রিয় হয়েছে দুটি প্যানেল। তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন দিয়ে বিজয়ীদের হাতে আগের মতো প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব দিতে তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের নেপথ্যে রয়েছেন দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত তিন কর্মকর্তা বদরুল আহসান, আশরাফুল আলম মাসুম ও আবদুর রহমান।

বাইগামের পরিচালক মো. মোকতার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই প্রতিষ্ঠানে লাগামহীন দুর্নীতি করেছে সবশেষ পরিচালনা পরিষদ। তাদের অনিয়মের কারণে গত বছর ও চলতি বছরের জন্য বরাদ্দ বন্ধ করে দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ফলে বেতন বন্ধ রয়েছে। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কিছু জায়গায় সংস্কারের চেষ্টা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের চেষ্টা করছি। এখানে বেশ কিছু চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ছিল, চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় তা আর নবায়ন করিনি। এতে ব্যয় কমেছে। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বরাদ্দ না দিলে তো বেতন-ভাতা পরিশোধের কোনো উপায় নেই। বেতন বন্ধ থাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের আগ্রহ কমে গেছে, তারা হতাশায় ভুগছেন। এতে করে সেবার মানও কিছুটা কমে গেছে।