বিক্রমাদিত্যের রাজসভায় ৯ জন মনীষী ছিলেন। সেই নবরত্নের একজন হচ্ছেন কালিদাস। যিনি সংস্কৃত ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। কিন্তু নবরত্নদের মধ্যে ছিল ভীষণ রকমের রেষারেষি। কেউ কেউ কালিদাসকে রত্ন থেকে বাদ দেওয়ার জন্য তার কান ভারী করতেন নিয়মিত। কিন্তু সম্রাট তাদের কথায় কর্ণপাত করতেন না। তিনি জানতেন যোগ্যতায় কালিদাসের বিকল্প কেউ নেই রাজ্যে। একদিন অতিষ্ঠ হয়ে সেনাপতিকে বললেন ঠিক আছে, তোমরা একটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করো। রাজ্যে ঢোল পিটিয়ে দাও। আমি চাই, রাজ্যবাসীর মতামত নিয়ে ‘কবিরত্ন’ চূড়ান্ত করতে। কী করতে হবে, সেই বিষয়েও তিনি বলে দিলেন।
ঘটনার দিন হাজার হাজার রাজ্যবাসী উপস্থিত হয়েছেন। তারা দুই পন্ডিতের কাব্য এবং ভাষার লড়াই দেখবেন। তাদের মতামতের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত হবেন পন্ডিতরত্ন। সম্রাটের কথামতো, খোলা জায়গায় বিশাল একটি শুকনো মরা গাছ রেখে দেওয়া হয়েছে। সম্রাট দুই পন্ডিতের উদ্দেশে বললেন আপনারা একজন একজন করে বলবেন ‘আমার চোখের সামনে একটি শুষ্ক বৃক্ষ পড়ে আছে’। প্রথমে এলেন সেই পন্ডিত, যিনি মনে করেন কালিদাসের চেয়ে যোগ্য। কিন্তু সম্রাট বিক্রমাদিত্য কালিদাসের যোগ্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন। এবার পন্ডিত উচ্চৈঃস্বরে বললেন ‘শুষ্কং কাষ্ঠং তিষ্ঠতি অগ্রে’। যার বাংলা হচ্ছে সামনে একটি শুষ্ক কাঠ দেখতে পাচ্ছি। উপস্থিত অনেকেই করতালি দিলেন। বললেন বাহ্, বাহ্ এর চেয়ে আর ভালো অর্থবোধক বাক্য কী হতে পারে? এবার কালিদাসের পালা এলো। চোখ বন্ধ করে তিনি বললেন ‘নীরস তরুবর পুরত ভাতি’। মানে ‘সামনে রসহীন একটি বৃক্ষ দেখতে পাচ্ছি’। এবার রাজ্যবাসীর সশব্দ করতালিতে মুখরিত হয়ে উঠল সেই জায়গা। সম্রাট বিক্রমাদিত্য অন্যান্য রত্ন এবং সেনাপতির দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। এর মানে হচ্ছে যথাস্থানে, যথাযোগ্য শব্দের ব্যবহারকে অর্থবহ করতে হলে প্রথমেই তাকে শ্রুতিমধুর, সরস এবং সহজবোধ্য হতে হয়। আমাদের দেশে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ আদেশ মেনে সরকারি কর্মকর্তারা বাংলা ভাষায়ই চিঠিপত্র লিখছেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এসব জায়গায় যে বাংলা ভাষা প্রয়োগ করা হচ্ছে, সাধারণ মানুষের কাছে তা বোধগম্য নয়। সাধু ও চলিত ভাষার মিশ্রণে লেখা এসব সরকারি কাগজের ভাষা জটিল ও দুর্বোধ্য। কর্মকর্তাদের ভাষাটা স্বাচ্ছন্দ্যে পড়া যায় কি না, সে সম্পর্কে তারা সচেতন নন। তাদের লেখায় জীবন-ঘনিষ্ঠ শব্দ চয়ন হয় না। দুর্বোধ্যতার সঙ্গে সঙ্গে লেখাগুলো হয়ে যায় শুকনো ও নীরস। জানা গেল, বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত ‘দাপ্তরিক চিঠি এত জটিল’ প্রতিবেদনের মাধ্যমে।
সরকারি চিঠিপত্রে বাংলার ব্যবহারটা জগাখিচুড়ি ধরনের। ফলে কেউ কেউ এসব নোটিস, আদেশ ও প্রজ্ঞাপনে ব্যবহৃত ভাষার ভুলও বোঝেন। প্রশাসন ও আরও কয়েকটি ক্যাডারের প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জন্য গাড়ি সেবা নগদায়ন নীতিমালা খুবই কাক্সিক্ষত বিষয়। এ নীতিমালার গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ধারাটি দীর্ঘ ও জটিল। এ ধারার প্রথম বাক্যটি সাড়ে পাঁচ লাইনের, শব্দ রয়েছে ৬০টি। প্রাধিকারপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা জানান, এ বাক্যটি একবার পড়ে বোঝা যায় না। কয়েকবার পড়তে হয়। ভূমি মন্ত্রণালয় চূড়ান্তভাবে মুদ্রিত ও প্রকাশিত খতিয়ানের করণিক ভুল, প্রতারণামূলক লিখন এবং যথার্থ ভুল সংশোধন সংক্রান্ত পরিপত্র জারি করে ২০২১ সালে। সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ পরিপত্রের ভাষা খুবই জটিল। অনেক জায়গায় ইংরেজি ব্যবহার করা হয়েছে। এ পরিপত্রের ভাষার পাঠোদ্ধার করা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।
সরকারি অফিসে মাতৃভাষার ব্যবহার সহজ করতে প্রয়োজন প্রশিক্ষণ। কিন্তু সরকারি প্রশিক্ষণে যারা প্রশিক্ষণ দেন তাদেরই ভাষার ওপর পর্যাপ্ত দখল থাকে না। শুদ্ধ বাংলা লেখার জন্য কর্মকর্তাদের কোন পর্যায়ে তাগিদ দেওয়া হয় এবং সেই তাগিদের ভাষা কারা দেবেন এবং ঠিক কী রকম এটা জানা গেলে, আমাদের জীবন সার্থক হতো।