প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। ছিলেন বাংলাদেশ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন আর্ট গ্যালারি ‘শিল্পাঙ্গন’। প্রগতিশীল পাঠাগার ‘সমাজতান্ত্রিক পাঠাগার’-এর প্রতিষ্ঠাতা। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রথম প্রধান সম্পাদক অকৃতদার এই কবি ও ছড়াকার মারা যান ২০১২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। অতীতের সঙ্গে অধুনার সংযোগ ঘটাতে চিন্তা পাতায় ছাপা হলো তার লেখা উপসম্পাদকীয়
পাকিস্তান আমলের এপিপির কেন্দ্রীয় অফিস বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত খবরাখবর লাভের জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন গ্রাহক-যন্ত্রগুলো করাচিতে প্রতিষ্ঠা করেছিল। উক্ত কেন্দ্রীয় অফিস থেকেই সমস্ত খবর ঢাকাসহ আঞ্চলিক অফিসগুলোতে সরবরাহ করা হতো সেখান থেকে স্থানীয় গ্রাহক দৈনিক পত্রিকা ও রেডিও-টেলিভিশনে। এমনকি ঢাকার প্রধান সংবাদসমূহ পর্যন্ত সরাসরি প্রচার করা হতো না; প্রথমে করাচিতে প্রেরণ করা হতো এবং সেখান থেকে (প্রয়োজনে এডিট ও সেন্সর করে) পুনরায় সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল। সুতরাং বিএসএস প্রকৃতপক্ষে একটি পঙ্গু প্রতিষ্ঠানরূপে জন্মলাভ করে। শুধু তাই নয়, টেলিযোগাযোগ বিভাগও ত্বরিত ও তাৎক্ষণিক কোনো প্রকার আধুনিক সুষ্ঠু ব্যবস্থা করে দেওয়ার মতো ক্ষমতাসম্পন্ন ছিল না। অপরদিকে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, তথ্য দপ্তর, বৈদেশিক বিভাগ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে সে সময় একজন ব্যক্তিও ছিলেন না, যিনি সংবাদ সংস্থা পরিচালনা বা তার গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত। প্রধানত বিদেশি নিউজ এজেন্সিগুলোর সরবরাহকৃত সংক্ষিপ্ত সংবাদ ও পিটিআইয়ের ওপর নির্ভর করেই আমাদের সংবাদ সংস্থা চালু করতে হয়েছিল। আমাদের দেশের একপেশে খবরগুলোর গুরুত্ব বিদেশে ছিল সীমিত; কোনো বিদেশি সংবাদ প্রতিষ্ঠানের সাথে সে সময় খবর সরবরাহের কোনো চুক্তিই আমাদের ছিল না। কোনো দেশের কেবল নিজস্ব সংবাদ দিয়ে দৈনিক পত্রিকা, রেডিও-টেলিভিশনের চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে খবরের জগতে শূন্যতার সৃষ্টি হয় এবং জনসাধারণে বিশ্বের কর্মকা- ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। সে জন্য ত্বরিৎগতিতে বিদেশি সংবাদ লাভের উদ্দেশ্যে রয়টার ও পিটিআইর সাথে জরুরি ভিত্তিতে অলিখিত সমঝোতায় পৌঁছাতে হয়- আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি নয়। অবশ্য পরে সে চুক্তি করতে হয়েছিল। এভাবে বিদেশি সংবাদ সংগ্রহের প্রাথমিক ব্যবস্থা করলেও, বাংলাদেশ থেকে অন্যান্য দেশে খবর পাঠাবার কাজ দুরূহ থেকেই যায়। বিদেশি সংবাদদাতাগণ স্ব-স্ব দূতাবাসের সুযোগ গ্রহণ করতেন এবং অনেক ক্ষেত্রে কলকাতায় গিয়ে কেন্দ্রীয় অফিসে খবর পাঠিয়ে ফিরে আসতেন। কিন্তু স্থানীয় সংবাদ সংস্থা হিসেবে আমাদের সে সুযোগ ছিল না। বেতার ও তার যোগাযোগের এই অবিশ্বাস্য পরিস্থিতির মধ্যে আমরা যখন নিক্ষিপ্ত, সে সময় কলকাতার মাধ্যমে দিল্লির সাথে সংবাদ গ্রহণ ও প্রেরণের একটি চ্যানেল বের করা হয়। সরাসরি টেলিস্টার উপগ্রহের মাধ্যমে ঢাকা থেকে সংবাদ প্রেরণ বা ঢাকায় সংবাদ গ্রহণের কোনো পন্থাই ছিল না। তখন নবপ্রতিষ্ঠিত একটি দেশের অর্থনৈতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অন্যান্য দেশের স্বীকৃতি প্রদানের খবর, হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর ধ্বংসলীলা ও গণহত্যা সংক্রান্ত তথ্য, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ইত্যাদি সম্পর্কিত খবরাখবর বিদেশে প্রেরণের অবশ্য প্রয়োজনে প্রথমদিকে অল্পদিনের জন্যে হলেও এ ব্যবস্থা অবলম্বন করা ছাড়া উপায় ছিল না। এ ব্যবস্থার ফলে দিল্লি ও কলকাতা থেকে বিদেশি সাংবাদিকগণ বাংলাদেশ সম্পর্কে আমাদের দেয়া সংবাদাদি পিটিআই থেকে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি অনুযায়ী নিতে পারতেন। এই অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে পতিত সংবাদ আদান-প্রদানের ব্যবস্থা মোটেই সুষ্ঠু ছিল না এবং এমনকি আইনানুগও নয়, বলা চলে।
বাহাত্তর সালের মে মাস পর্যন্ত অর্থ দপ্তর জানতোই না যে, জাতীয় সংবাদ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হলে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন এবং বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে বিদেশি সংবাদ ক্রয় করতে হয় যা তারা দৈনিক সংবাদপত্রে পড়েন রয়টার, এপি, ইউপিআই, এএফপি, পিটিআইর নামে। সংবাদপত্র, রেডিও-টেলিভিশনে যে সমস্ত বিদেশি সংবাদ পরিবেশন করা হয়, তার সমস্তটাই বৈদিশিক মুদ্রায় কেনা সে তথ্য জানতে পেরে তারা বিস্ময় প্রকাশ করেন! একদিন জনৈক উচ্চপদস্থ অফিসার তো বলেই দিলেন কেন, কেন, অন্য দেশের সংবাদের সাথে আমাদের সংবাদ এক্সচেঞ্জ করুন। বিদেশে আমাদের দেশের সংবাদের মূল্য ও গুরুত্ব কতো সামান্য সে বিষয়ে তিনি অজ্ঞ। সংবাদ সংস্থা সম্পর্কে তিনি যে নির্দোষ নির্বোধ! তিনি এটাকে দেশলাই কারখানা বা পাটকল বা ট্যানারির মতো উৎপাদক শক্তিরূপে কল্পনা করেছেন। হয়তো দুদিন পর এই সংস্থাকে সরকারি আয়ের একটা উৎস ভেবে বসবেন। এই মনোভাবের ফলে আমাকে প্রতিষ্ঠানের প্রথম দুমাসের বেতনের ঘাটতি পূরণ করতে হয়েছে ব্যক্তিগত দায়িত্বে জনতা ব্যাংক (ইউবিএল) থেকে সিকিউরিটি ছাড়া অগ্রিম টাকা ধার করে। এমনই একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের সদ্য কারামুক্ত রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীন দেশে প্রত্যাবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ বিশ্বময় প্রচার করতে হবে এ দায়িত্ব মুখ্যত জাতীয় সংবাদ সংস্থার ওপরই বর্তায়; তা যতো ক্ষুদ্র, যতো নতুনই হোক না কেন। রাইফেল ও স্টেন ছিল তখন সবচাইতে সহজলভ্য হাতিয়ার, আর সর্বাধিক বিশ্বস্ত বন্ধু। প্রতিদিন হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা গ্রাম, জঙ্গল, গঞ্জ, ট্রেঞ্চ থেকে উঠে আসছেন রাজধানী ঢাকা শহরের দিকে বীরদর্পে। কৃষক, শ্রমিক-ছাত্র-যুবক, সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাগণ প্যারেড করে রাজপথ অতিক্রম করছেন সারাদিন। তাদের পদভারে কম্পিত শহরের লক্ষ লক্ষ নাগরিক আনন্দে আর উচ্ছ্বাসে, গৌরবে আর বৈভবে ম-িত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের ঋত্বিকদের আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে রেখেছিল। পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবকে মুক্তিদানের পর তিনি ঢাকার পথে লন্ডন যাত্রা করেছেন এই সংবাদ পৌঁছানোর পর ঢাকায় বিএসএসে আমরা ছিলাম সবচাইতে অসহায়। বিধ্বস্ত অবস্থার মধ্যে নিক্ষিপ্ত আমরা অপ্রস্তুত সরকারের কোনো প্রান্ত থেকেই কোনো উপদেশ বা নির্দেশ কিছুই পেলাম না। অবস্থাটা যেন ছিল ‘নো ম্যান্স রুল’। জনগণ যেন সহজাত অভ্যাসে আইন মেনে চলছে। একদিন পূর্ব থেকেই বর্তমানে উক্ত প্রতিষ্ঠানের কূটনৈতিক প্রতিনিধি রিপোর্টার হাবীবুল্লাহকে আঠারো নম্বর রোডে আশ্রিত বেগম মুজিবের বাসায় নিয়োগ করা হয়েছিল। অপরদিকে তদানীন্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদের সাথে মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক আতাউস সামাদকে (সংস্থার বিশেষ প্রতিনিধি) দিল্লিতে পাঠানো হলো অগ্রগামী রিপোর্টার হিসেবে। রিপোর্টার হাবীবুল্লাহ সবার আগে জেনেছিলেন যে, সদ্যমুক্ত প্রেসিডেন্ট লন্ডন থেকে দিল্লি হয়ে ঢাকা ফিরবেন। এ তথ্যের প্রতি সরকারি সমর্থন ছিল। তিনি আঠারো নম্বর রোডে কর্মরত থাকাকালে লন্ডন থেকে প্রাপ্ত টেলিফোন কলে শেখ মুজিবের সাথে বেগম মুজিবের কথোপকথন শুনতে পেরেছিলেন। শেখ মুজিব তাঁকে জানান যে, মন্ত্রিসভা তাঁকে দিল্লি হয়ে ঢাকা ফেরার ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছেন।
ইতিমধ্যে রয়টার ও অন্যান্য বিশিষ্ট সংবাদ পরিবেশক সংস্থা, যাদের সাথে সংবাদ লেনদেনের আলোচনা শুরু হচ্ছিল, শেখ মুজিবের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের সার্বিক খবর দ্রুত চেয়ে পাঠিয়েছে। এই অবস্থায় ব্যর্থতাই স্বাভাবিক। বিএসএস থেকে সিদ্ধান্ত হলো আমরা যেভাবেই হোক এই পঙ্গু অস্তিত্ব নিয়ে ত্বরিতগতিতে ময়দান থেকেই বিদেশে খবর পাঠাবার চেষ্টা করবো। সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে জরুরি ভিত্তিতে আমরা সংস্থার নামে বারোটি পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট টেলিফোন স্থাপনের দ্রুত ব্যবস্থা করলাম। আধুনিক যুগে এ ছিল এন্টিক পদ্ধতি। দুটো ফোন ছিল এয়ারপোর্টে এবং চারটি ফোন সোহরাওয়ার্দী ময়দানে স্থাপন করা হলো মঞ্চের কাছে ও রিপোর্টার্স কর্নারে প্রত্যেকটির সরাসরি যোগাযোগ অফিসে স্থাপিত অপর ছটি ফোনের সাথে। এর ফলে নির্দিষ্ট টেলিফোন ময়দান থেকে কোনো রিপোর্টার উঠালেই উল্টো পয়েন্টে সংযোজিত ফোনই কেবল বেজে উঠতো কারণ অন্যভাবে সংযুক্ত রাখার পথ ছিল না। অফিস প্রান্তে ছটি ফোনে ছজন দক্ষ সাংবাদিককে বসিয়ে দেয়া হয়েছিল এডিটর হিসেবে। তাঁরা ফোনে যা পেতেন তাৎক্ষণিক সম্পাদনা মুহূর্তের মধ্যে সেরে প্রেরক যন্ত্রে পাঠাতেন রিলিজের জন্যে।
১০ জানুয়ারি, বাহাত্তর সাল শেখ মুজিবের ঢাকা আগমনের দিন এয়ারপোর্ট, শোভাযাত্রা, আঠারো নম্বর রোডের বাসা, সোহরাওয়ার্দী ময়দানের ভাষণ ইত্যাদির ব্যাপক দায়িত্ব পালন করেছিলেন সম্ভবত ষোলোজন সাংবাদিক। ময়দানের রিপোর্টিংয়ের সার্বিক দায়িত্ব ছিল চিফ রিপোর্টার জাওয়াদুল করিমের ওপর এবং রিপোর্টারদের সমস্ত কপি অনুমোদনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন সংস্থার সম্পাদক এস.এম.এ. চৌধুরী ও নিউজ চিফ হাসানুজ্জামান। ডন পত্রিকার প্রাক্তন রিপোর্টার গিয়াস কামাল চৌধুরী শহরের সমস্ত অঞ্চলের প্রতিক্রিয়া ও মিছিলের খবরাখবর রিপোর্ট করেছেন সেদিন। সাপ্তাহিক ওয়েভ পত্রিকার সম্পাদক কে.বি.এম. মাহমুদ, বর্তমানে বিএডিসির জনসংযোগ অফিসার ও অধুনালুপ্ত ঢাকা টাইমস-এর এককালীন সম্পাদক জহিরুল ইসলাম, বর্তমানে বিএসএসের দ্বিতীয়-প্রধান ডিপি বড়ুয়া প্রমুখ অফিসে সম্পাদনার কাজে যে সহযোগিতা করেছিলেন, তা আমাদের কাজকে সাফল্যমন্ডিত করতে সাহায্য করে।
বিশেষ সংবাদদাতা আতাউস সামাদ প্রেসিডেন্টের সাথে দিল্লি থেকে একই প্লেনে ঢাকা ফিরেছিলেন। সামাদ ভিড়ের মধ্যে প্লেন থেকে নামতে না পেরে দিল্লির লিখিত রিপোর্ট ছুড়ে দিয়েছিলেন আমার হাতে। কূটনীতিক ফারুক চৌধুরীও তাঁদের সাথে ছিলেন। সেদিন অধিক রাত্রি পর্যন্ত বিভিন্ন অংশে কার্যরত রিপোর্টারদের অনেকের সাথেই অফিসে আমাদের সাক্ষাৎ হয়নি। শহরের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তাদের কণ্ঠস্বরই কেবল শুনেছি। চিফ রিপোর্টার চারজন রিপোর্টার নিয়ে ময়দান থেকে নির্দিষ্ট ফোনের ওপর ধারাবাহিকভাবে ইংরেজিতে অনূদিত রিপোর্ট করে গেছেন। তাঁর সহযোগীদের কণ্ঠস্বর এভাবে আমরা পেয়েছি। তাঁদের রিপোর্ট এডিটরদের হাত হয়ে সরাসরি প্রেরক প্রিন্টারে চলে যেতে থাকে। সমস্ত সংবাদই পিটিআইর মাধ্যমে বিদেশে পাঠাতে হয়।
দেশে প্রত্যাগত অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের বক্তৃতা শেষে প্রচন্ড স্লোগানের সাথে ময়দানের মিটিং যখন সমাপ্ত, করিমের কণ্ঠস্বরও তখন স্তিমিত হয়ে আসে। অবিশ্বাস্য জনস্রোতের মধ্যে বহুসংখ্যক বিদেশি রিপোর্টার দ্রুত সংবাদ প্রেরণে জন্যে যখন হোটেল ইন্টারকনে পৌঁছান, তখন আমাদের সেদিনের সমস্ত রিপোর্ট বিশ্ব সংবাদের প্রাণকেন্দ্র লন্ডনে পৌঁছে গিয়েছিল। লন্ডন থেকে রয়টার তিন মিনিটের মধ্যে টেলিস্টারের মাধ্যমে কম্পিউটারের সাহায্য নিয়ে বিশ্বের সর্বকেন্দ্রের গ্রাহক যন্ত্রে ইতিমধ্যে সমস্ত সংবাদ পরিবেশন শুরু করে দিয়েছিল। (সংক্ষেপিত)
লেখক: বরেণ্য সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব