কনডেম সেলে নারীর মানবাধিকার

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে রাখা হয় কনডেম সেলে। এটি কারাগারের বিশেষ সেল।  অন্যান্য বন্দির তুলনায় কনডেম সেলের বন্দিদের জন্য ভিন্ন আচরণবিধি রয়েছে কারাগারে। অন্যান্য বন্দির থাকার জায়গার সঙ্গেও কনডেম সেলের বেশ পার্থক্য রয়েছে। কোনো কারাগারে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামিদের অন্য অপরাধীদের চেয়ে আলাদা ধরনের কক্ষে রাখা হলেও, বাংলাদেশের জেল কোড বা কারাবিধি মোতাবেক সে রকম কোনো আইন নেই। 

কারাবিধি অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার পর একজন বন্দিকে কারাগারে সার্বক্ষণিক পাহারায় রাখা, দর্শনার্থীদের সঙ্গে দেখা করার বিষয়ে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হলেও আলাদা কক্ষে রাখার বিষয়টি আইনে নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি। এই সেলের ভেতরে আলো-বাতাস চলাচলের জন্য সাধারণত অন্যান্য সেলের তুলনায় অনেক ছোট আকারের জানালা থাকে। আর এসব সেলে থাকা বন্দিদের দিনে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেলের বাইরে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে বহু নারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়নি। দেশের বিভিন্ন কারাগারের নির্জন সেই সেলগুলোর কয়েক ফুট দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের ছোট কক্ষে বর্তমানে ৮২ জন নারী মৃত্যু আর জীবনের প্রহর গুনছেন। তাদের প্রায় সবাই হত্যা মামলার আসামি। আর কনডেম সেলে নারী আসামিদের এ সংখ্যা এখন ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তাদের মধ্যে কমপক্ষে ৫-১০ বছর বা এর বেশি সময় ধরে বন্দি আছেন ৫৪ জন নারী জানা গেল দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত “ ‘মৃত্যু’ সেলে নারীদের জীবনযন্ত্রণা” প্রতিবেদনে।

বিচারিক আদালতে মৃত্যুদ-ের রায় হলেও হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে সাজা রহিত হয়ে হয় যাবজ্জীবন, অন্য মেয়াদের সাজা, নয়তো খালাস। এই-ই যখন বাস্তবতা, তখন বিষয়টি একটু অন্যভাবে চিন্তা করা দরকার। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, কেন কনডেম সেলকে বলা হচ্ছে, কারাগারের ভেতর আরেক ‘কারাগার’? এর মানে হচ্ছে,  স্বাভাবিকভাবেই সেখানে একজন নারী বন্দির দুর্বিষহ জীবনগাথা লিপিবদ্ধ হচ্ছে।  সাধারণত কনডেম সেলগুলো দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে ৮-১০ ফুটের মতো। নারী বন্দিদের কক্ষগুলোতে দরজা, জানালা, ছোট বারান্দাসহ টয়লেট, সিলিং ফ্যান ও লাইটের ব্যবস্থা রয়েছে। নির্ধারিত পোশাক, ঘুমানোর জন্য কম্বল, বালিশসহ খাবারের জন্য দেওয়া হয় থালা, বাটি ও মগ। সকালের নাশতায় মাসের ১৮ দিন রুটি ও সবজি, ৯ দিন খিচুড়ি এবং ৪ দিন রুটি ও হালুয়া খেতে দেওয়া হয়। দুপুর ও রাতের খাবারে নির্ধারিত পরিমাণে ভাত, মাছসহ মাসের ১০ দিন গরু, খাসি ও মুরগির মাংস দেওয়া হয়। এ ছাড়া জাতীয় দিবস ও উৎসবে পোলাও, মাংস, ডিম, পায়েস ও মিষ্টির ব্যবস্থা থাকে। তবে কক্ষের চার দেয়ালের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই তাদের। প্রতি বেলার খাবার তাদের সেলে পৌঁছে দেওয়া হয়। দিনের নির্দিষ্ট কিছু সময়ে সেলের ছোট বারান্দায় হাঁটাহাঁটির সুযোগ রয়েছে। প্রচলিত বিধান অনুযায়ী, ফাঁসির আসামিদের কোনো প্রশিক্ষণ বা কাজ করতে হয় না। কনডেম সেলে নারীদের দিনের বেশিরভাগ সময় কাটে প্রার্থনা, পড়া, লুডু খেলা ও অন্য বন্দিদের সঙ্গে গল্প করে। যাদের বই, পত্রিকা পড়ার ঝোঁক রয়েছে, তাদের সেলেই তা সরবরাহ করা হয়। প্রতি মাসে একবার স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং সপ্তাহে একবার মোবাইল ফোনে কথা বলার সুযোগ পান তারা। মৃত্যুদ-প্রাপ্ত হওয়ায় তারা সার্বক্ষণিক কারারক্ষীদের নজরদারি ও চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে থাকেন।

সবচেয়ে বড় বিষয়, দেখা গেল একজন নারী কনডেম সেলে ৫-১০ বছর পার করে চূড়ান্ত বিচারে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন, তখন এর দায় কে নেবে? তাদের ক্ষতিপূরণ নির্ধারণইবা হবে কীভাবে? আইন কী বলে? জানা গেছে, অধিকাংশ নারী অপরাধী বিষন্নতায় ভোগেন। এ বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা দরকার। কারণ ‘বিষন্নতা’ একটি ভয়াবহ মানসিক রোগ। এর পাশর্^প্রতিক্রিয়াও মারাত্মক। যে কারণে কারাগারে নারী বন্দিদের দৈনন্দিন জীবনযাপন আরও উন্নত করা দরকার। যেহেতু মৃত্যুদ- অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়, সে কারণে নারী বন্দিদের মোটিভেশনের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরে রাখা উচিত। কারাবিধি অনুযায়ী, নারী বন্দিদের প্রয়োজনীয় যত কিছুই দেওয়া হোক, কনডেম সেলের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ আরও উন্নত করা শুধু দায়িত্বই নয়, মানবিকতাও।

বিচারে প্রমাণিত নারী অপরাধী শাস্তি পাবে এটা নিয়ে কোনো কথা নেই। কিন্তু কনডেম সেলে একজন প্রমাণিত অপরাধীও যেন মানবাধিকারবঞ্চিত না হন।