পুতিনের আতঙ্ক ছিলেন অ্যালেক্সি নাভালনি

প্রেসিডেন্ট পুতিনের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত অ্যালেক্সি নাভালনি। সরকারের দুর্নীতি প্রকাশ করার মধ্যে দিয়ে রাজনীতিতে তার নাম উঠে আসে। তিনি পুতিনের ইউনাইটেড রাশিয়া দলকে উল্লেখ করেছিলেন ‘অসৎ ও চোরদের দল’ বলে। এ জন্য বেশ কয়েকবার তাকে জেলে যেতে হয়েছে। পুতিনের ইউনাইটেড রাশিয়া সংসদীয় নির্বাচনে ভোট কারচুপি করেছে বলে প্রতিবাদ করার পর, তাকে ২০১১ সালে ১৫ দিনের জন্য গ্রেপ্তার করা হয়। নাভালনিকে তখন অল্প দিনের জন্য জেলে পাঠানো হয়। তিনি ২০১৮-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু প্রতারণার দায়ে তিনি আগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন এ কারণ দেখিয়ে তাকে প্রার্থিতা দেওয়া হয়নি। নাভালনির মতে, এটাও ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এরপর ২০১৯ জুলাইতে নাভালনিকে আবার কারাগারে পাঠানো হয় অনুমোদন না থাকার পরও প্রতিবাদ বিক্ষোভ সংগঠনের জন্য। সে সময় তিনি কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসকরা বলেন, তার কোনো কিছুর স্পর্শ থেকে চামড়ার প্রদাহ হয়েছে। কিন্তু নাভালনি বলেন, তার কোনোদিন কোনো কিছু থেকে অ্যালার্জি প্রতিক্রিয়া আগে হয়নি। তার নিজের চিকিৎসক বলেন তিনি কোনো বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শে এসেছিলেন। নাভালনিও বলেছিলেন, তার ধারণা তাকে বিষ দেওয়া হয়েছে। নাভালনির ওপর ২০১৭ সালে অ্যান্টিসেপটিক রঙ দিয়ে হামলা চালানো হলে তার ডান চোখ রাসায়নিকে গুরুতরভাবে পুড়ে যায়। ২০২২ সালে তার দুর্নীতিবিরোধী ফাউন্ডেশনকে সরকারিভাবে বিদেশি গুপ্তচর সংস্থা বলে ঘোষণা করা হয়। ফলে এই সংস্থার কর্মকাণ্ডের ওপর সরকার কঠোর নজরদারি শুরু করে। ২০২০ সালে বিষ প্রয়োগে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল নাভালনিকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বেঁচে যান তিনি। চিকিৎসা নিতে যান জার্মানিতে। পাঁচ মাস জার্মানিতে কাটিয়ে ২০২১ সালে জানুয়ারিতে মস্কো ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে আটক করা হয়। তাকে অভ্যর্থনা জানাতে মস্কো বিমানবন্দরে হাজার হাজার সমর্থক জড়ো হয়েছিলেন। কিন্তু বিমানবন্দরে নামার আগেই তাকে বহনকারী বিমানটির পথ পরিবর্তন করে নিয়ে যাওয়া হয় শেরেমেতেইয়েভো বিমানবন্দরে। সেখানে ইমিগ্রেশনে পুলিশ আটক করে নিয়ে যায় এই আন্দোলনকারীকে। নাভালনি তাকে হত্যাচেষ্টার জন্য রুশ কর্র্তৃপক্ষকে সবসময় দায়ী করে এলেও, ক্রেমলিন বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের তদন্তে অবশ্য নাভালনির দাবিই সত্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

রাশিয়ার বিরোধী দলের নেতা ও পুতিনের কট্টর সমলোচক অ্যালেক্সি নাভালনির মৃত্যুতে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বিশে^র বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান। কেউ কেউ  এ মৃত্যুর জন্য রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনকে দায়ী করেছেন। ইউরোপ জুড়ে রাজনীতিবিদরা নাভালনির মৃত্যুতে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো নাভালনির প্রশংসা করে বলেছেন, মৌলিক স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য নাভালনির লড়াই ছিল অসাধারণ সাহসের। তার মৃত্যু একটি ট্র্যাজেডি। নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুটে বলেছেন, নাভালনির মৃত্যুর কথা শুনে ‘মর্মাহত’ হয়েছি। এটি রাশিয়ার শাসকের নজিরবিহীন বর্বরতাকে চিত্রিত করে। ক্ষোভ প্রকাশ করে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, আমি অ্যালেক্সি নাভালনির স্মৃতি, তার উৎসর্গ ও সাহসের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাডোসøা সিকোরস্কি বলেছেন, নাভালনিকে সেরা রাশিয়ান রাষ্ট্রপতি হিসেবে স্মরণ করা হবে, যা রাশিয়া কখনো পায়নি। নাভালনি রাশিয়ান ফ্যাসিবাদের শিকার। পুতিনের মুখোমুখি হওয়ার ক্ষেত্রে তিনি সাহসী ছিলেন। আর কেউ যেন বিরোধী না হয় এ জন্য তাকে হত্যা করা হয়েছে। কারণ তাকে ভুয়া অভিযোগে বন্দি করা হয়েছিল। ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি বলেছেন নাভালনি কারাগারে নিপীড়নে মারা গেছেন। ইতালি সরকার সবসময় তাদের পাশে থাকবে যারা গণতন্ত্রের জন্য, চিন্তার স্বাধীনতার জন্য এবং প্রত্যেকের অবিচ্ছেদ্য অধিকারের জন্য লড়াই করবে।

এদিকে নাভালনির মৃত্যুতে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তিনি বলেন, ‘কারাবন্দি অবস্থায় বিরোধী এ রাজনীতিকের মৃত্যুর দায় প্রেসিডেন্ট পুতিনকে নিতে হবে। পুতিন সরকার নাভালনির মৃত্যুর জন্য দায়ী এতে কোনো সন্দেহ নেই। নাভালনির সঙ্গে যা ঘটেছে তা পুতিনের বর্বরতার আরও একটি প্রমাণ।’ যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক নাভালনির মৃত্যুকে ‘ভয়াবহ সংবাদ’ বলে অভিহিত করেছেন। ২০১৮ সালেও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পুতিনের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন নাভালনি। সেই সময় তিনি রাশিয়া জুড়ে যে বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন, তা পুতিনের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। নাভালনির মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু তার প্রতিষ্ঠিত দুর্নীতিবিরোধী তদন্ত সংস্থা এফবিকে রয়ে গেছে। যদিও পুতিন ওই সংস্থার বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে কারাগারে পাঠিয়েছেন, তবুও এফবিকের কাজ পুরোপুরি থামানো যায়নি। এ ছাড়া নাভালনির ছিল ‘নাভালনি লাইভ’ নামে ইউটিউব চ্যানেল। এটি রাশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় ইউটিউব চ্যানেল। এই চ্যানেলের মাধ্যমেই তিনি লাখ লাখ রুশদের কাছে নিজের বার্তা পৌঁছে দিতেন এবং পুতিনের যাবতীয় দুর্নীতি ও অপশাসন তুলে ধরতেন। নাভালনির মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে কি চ্যানেলটিরও মৃত্যু হবে? রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, নাভালনির সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল তার ‘নৈতিক সাহস’। শত বাধা বিপত্তি, নির্যাতন ও দমন-পীড়ন সত্ত্বেও তিনি তার নৈতিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হননি। এসব কারণেই তিনি মৃত্যুর পরও সাধারণ মানুষের মাঝে বেঁচে থাকতে পারেন। নাভালনির কাজকর্ম নিয়ে বানানো একটি তথ্যচিত্র ২০২২ সালে অস্কার পুরস্কার পেয়েছে।

নাভালনির মৃত্যু তার সমর্থকদের মধ্যে শক্তি বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে এবং তার রেখে যাওয়া গণতন্ত্র উদ্ধারের আন্দোলনকে আরও বেগবান করতে পারে। পুতিনের অপশাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য নাভালনি যে কৌশল তৈরি করেছিলেন, তা ইতিমধ্যেই রাশিয়ার অন্যান্য গণতন্ত্রপন্থি দলগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। নাভালনির নিষ্ঠুর মৃত্যু আরও অনেক রুশকে আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করবে বলেই ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।

লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক

raihan567@yahoo.com