মিটার বন্ধ যাত্রী চলন্ত

২০০৩ সালের জানুয়ারি মাস থেকে সাধারণ যাত্রীদের জন্য ঢাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা সেবা চালু হয়। প্রথম দিকে মিটারে চলা অটোরিকশা কিছুটা ভালো সেবা দিলেও, কখনোই তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি সরকার। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) লোকদেখানো কড়াকড়ির চেষ্টা করলেও অধিকাংশ অটোরিকশা চলে না মিটারে। অনেক সময় যাত্রীদের সঙ্গে চালকরা চুক্তি করার পর আবদার করে বলেন, ‘মামা সার্জেন্ট জিগাইলে কইবেন মিটারে যাইতেছি’।

ঢাকা মহানগরীতে সরকার অনুমোদিত সিএনজি অটোরিকশার সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) বলছে, মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ায় এসব অটোরিকশার সবই প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে ঢাকায়  মেয়াদোত্তীর্ণ অটোরিকশা নেই দেখানো হলেও বাস্তবতা হচ্ছে, ঢাকার অলিগলি থেকে শুরু করে ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় অবাধে চলাচল করছে আনফিট ও আয়ুষ্কাল পেরিয়ে যাওয়া সিএনজি অটোরিকশা, যার সংখ্যাও প্রায় ১৬ হাজার। ট্রাফিক পুলিশকেও এখন মিটার নিয়ে মাথা ঘামাতে দেখা যায় না। ফলে অনিয়মই পরিণত হয়েছে নিয়মে। এ বিষয়ে শনিবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত ‘মিটার ভুলেই গেছেন যাত্রীরা’ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। 

রাজধানীতে মিটারের সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলে চুক্তিতে। কখনো মিটারে যেতে রাজি হলেও যাত্রীদের গুনতে হয় বাড়তি বকশিশ। এমন নৈরাজ্যে রীতিমতো নাভিশ্বাস যাত্রীদের। অথচ আইন অনুযায়ী সিএনজি অটোরিকশা যাত্রীর ইচ্ছামতো গন্তব্যে চলাচল করার কথা। দীর্ঘ সময়েও সেই আইন বাস্তবায়ন করা যায়নি। চালকদের যথারীতি একই অভিযোগ ‘জমা বেশি’। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) নিয়ম অনুযায়ী, একজন যাত্রীকে তার পছন্দমতো জায়গায় নির্দিষ্ট মিটারে নিয়ে যেতে একজন চালক বাধ্য। তিনি  কোনোভাবেই তাকে ‘না’ বলতে পারবেন না। মিটার ছাড়া কোনো অবস্থায় চুক্তিতে যাত্রী বহন করতে পারবেন না। কিন্তু এখন অটোরিকশা চালকরা সেই নিয়মের ধারেকাছেও নেই।  

রাজধানীতে বৈধ সিএনজিচালিত অটোরিকশার পাশাপাশি আরও ২০-২১ হাজার অবৈধ অটোরিকশা চলছে। একজন সিএনজি চালক যখন বলেন ‘মিটারে গেলে পোষায় না। সব খরচ শেষে ৮০০-১০০০ টাকা নিয়ে বাসায় ফেরা যায়। কোনো কোনো দিন এর কমবেশি হয়। মালিকও তো সরকারের বেঁধে দেওয়া জমার নিয়ম মানে না। মিটারে চালালে সারা দিনেও জমার টাকা উঠবে না। যানজটে পড়লে সারা দিনের লাভ শেষ। দিনে কয়েকবার নিতে হয় গ্যাস। গ্যাস নিতে দীর্ঘ সময় ব্যয় হয়। মাঝে মাঝে বেশি টাকা দিয়ে গ্যাস নিতে হয়।’ অভিযোগ রয়েছে মিটারে সিএনজি অটোরিকশা চলে না তার অন্যতম কারণ, মালিকরা অর্ধেক বেলার জন্য ৯০০ এবং পুরো দিনের জন্য ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা জমা নেন। বিআরটিএ থেকে ২০১৫ সাল থেকে অটোরিকশার মালিকদের ৯০০ টাকা করে জমা নেওয়ার নির্দেশনা ছিল। অর্থাৎ কোনো চালক এ টাকায় দিনচুক্তিতে ভাড়ায় চালাতে পারবেন। কিন্তু মালিকরা ১৩০০ থেকে ১৮০০ টাকা পর্যন্ত জমা নিচ্ছেন বলে অটোরিকশার চালকরা দাবি করেন। সর্বশেষ ২০১৫ সালের ১ নভেম্বর থেকে প্রথম দুই কিমি ৪০ টাকা, পরবর্তী প্রতি কিলোমিটার ১২ টাকা এবং ওয়েটিং বিল প্রতি মিনিট দুই টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে চালকরা হরহামেশা দুই থেকে পাঁচ গুণ বেশি ভাড়া আদায় করছেন যাত্রীদের কাছ থেকে। মিটার থাকলেও বেশিরভাগ চালক মিটারে যেতে চান না। অভিযোগ রয়েছে সিএনজিচালিত অটোরিকশার মালিকরা জমার হার বাড়িয়ে নিচ্ছেন। এ কারণে চালকরাও মিটারে গাড়ি চালাতে চান না। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল নিয়ে শাস্তির বিষয়ে সড়ক আইনে সুস্পষ্ট কিছু বলা নেই। এ কারণে মিটারে না চললেও এসব অটোরিকশার বিরুদ্ধে ট্রাফিক পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। যাত্রীদেরও বিষয়টি যেন গা সওয়া হয়ে গেছে।

সড়ক আইন অনুযায়ী দরকষাকষি করে চলাচলকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত অবিলম্বে চালু করার বিকল্প নেই। কোনো অটোরিকশা চালক মিটারে না চললে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া ভাঙা যাবে না সিএনজি অটোরিকশা চালকদের এই সিন্ডিকেট। প্রশ্ন হচ্ছে, এভাবেই কি চলবে?