বক্তৃতা মাত্রই আর্ট

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম নেতা হায়দার আকবর খান রনো। বাম তাত্ত্বিক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবেও তার খ্যাতি আছে। শতাব্দী পেরিয়ে, ফরাসি বিপ্লব থেকে অক্টোবর বিপ্লব, বাংলা সাহিত্যে প্রগতির ধারা, পলাশী থেকে মুক্তিযুদ্ধ রনোর উল্লেখযোগ্য বই। তিনি শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও দেশ রূপান্তরের বক্তৃতাবিষয়ক বিশেষ সংখ্যার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে কথা বলেছেন। তার সেই সংক্ষিপ্ত আলাপচারিতায় প্রজ্ঞা ও ইতিহাস চেতনা উজ্জ্বল হয়ে ধরা দিয়েছে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বখতিয়ার আবিদ।

দেশ রূপান্তর : বিশেষ পরিস্থিতিতে বক্তৃতা মানুষের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে থাকে, আপনার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় বক্তৃতার এ প্রভাবের দিকটিকে কীভাবে দেখেছেন?

হায়দার আকবর খান রনো : রাজনীতিতে বক্তৃতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ পরিস্থিতিতে কোনো ঐতিহাসিক নেতা যখন জনগণের আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে কোনো বক্তব্য রাখেন, তখন তার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব হয় বিরাট। অবশ্য বক্তাকে হতে হবে সুবক্তা এবং তাকে বক্তৃতা এমনভাবেই করতে হবে, যেন তা শ্রোতার মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে। একই সঙ্গে ভাষণটি যেন তার মনকে ছুঁয়ে যায় এবং মস্তিষ্ককে নাড়া দেয়। আমাদের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতার কথা স্মরণ করুন। বক্তৃতাটি খুব সংক্ষিপ্ত কিন্তু তা ছিল একদিকে যেমন আবেগময়ী তেমনই বুদ্ধিদীপ্ত। মনে রাখতে হবে বঙ্গবন্ধু সেদিন তার সামনে উপস্থিত কয়েক লাখ মানুষকেই শুধু নয়, সারা দেশের সাত কোটি মানুষকে লক্ষ্য রেখেই বক্তব্য দিয়েছেন। আরও মনে রাখতে হবে, সেদিন তার প্রতিটি কথা শোনার জন্য উৎকণ্ঠিত হয়েছিল পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এবং বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ব্যক্তিবর্গ। সবটা মাথায় রেখেই তাকে বক্তৃতা করতে হয়েছিল। এক কথায় তা ছিল অসাধারণ। পৃথিবীর ইতিহাসে কয়েকটি বক্তৃতা অমর হয়ে আছে। তার মধ্যে একটি হলো, আব্রাহাম লিংকনের গেটসবার্গের বক্তৃতা। এটিও ছিল খুব সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা। এই বক্তৃতার শেষ বাক্যে গণতন্ত্রের যে সংজ্ঞা তুলে ধরেছেন তা আজও অপরিবর্তনীয়। সেটি হলো, ‘government of the people, by the people, for the people, shall not perish from the earth.’ সুবক্তা এবং কৌশলী বক্তা যে, জনগণের মনোভাবকে তিনি পাল্টে দিতে পারেন। তার দৃষ্টান্ত পাই শেক্সপিয়ারের রচনায়। জুলিয়াস সিজার নাটকটিকে আমরা দেখি Antony কীভাবে সিজার বিরোধী বিক্ষুব্ধ জনগণকে বক্তৃতার মধ্য দিয়ে সিজারের পক্ষে নিয়ে এলেন। এটা অবশ্য নাটক এবং বক্তৃতাটি শেক্সপিয়ারের কলম দিয়েই এসেছে। তবু দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, বক্তৃতা কীভাবে জনগণকে প্রভাবিত করে। আমাদের দেশের আরেকটি উদাহরণ আমি আপনাকে বলতে পারি। ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত হাতিয়া দীপ থেকে ফিরে এসে মওলানা ভাসানী পল্টন ময়দানে যে মর্মস্পর্শী ভাষায় হতভাগ্য মানুষের কথা বক্তৃতায় তুলে ধরেছিলেন, তা শুনে আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন কবি শামসুর রহমান। সেই রাতেই তিনি তার অন্যতম বিখ্যাত কবিতাটি লিখলেন ‘সফেদ পাঞ্জাবি’।

দেশ রূপান্তর : আব্রাহাম লিংকনের ঐতিহাসিক বক্তব্যে গণতন্ত্রের যে সংজ্ঞা তুলে ধরেছিলেন, বর্তমানে সেই রূপ গণতন্ত্র কি কোথাও দেখতে পান?

হায়দার আকবর খান রনো : এটি হলো গণতন্ত্রের একটি আদর্শরূপ, যা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হওয়া সম্ভব নয়। বর্তমান বিশ্বে তো আরও নয়। যে সকল দেশকে তথাকথিত গণতান্ত্রিক দেশ বলে ধরা হয় যেমন, যুক্তরাষ্ট্র বা ভারত সেখানে ভোটাধিকার আছে কিন্তু সেই সরকার জনগণের পক্ষের সরকার নয়। কারণ সেখানে রাজনীতিকে পেছন থেকে নিয়ন্ত্রণ করে বিশালাকার ধনী ব্যবসায়ীরা। কোনো পুঁজিবাদী দেশেই সরকার ‘For the people’ হতে পারে না। এক সময় প্রাচীন গ্রিস দেশে এক ধরনের গণতন্ত্র ছিল বলে বলা হয়। জনগণ সরাসরি বিভিন্ন রাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে অংশ নিত, এগুলো হলো নগরসভ্যতা। কিন্তু সেই গ্রিক গণতন্ত্রে, দাস ও নারীদের কথা বলার কোনো অধিকার ছিল না। ইতিহাসে আমেরিকাতেই প্রথম সংবিধান রচিত হয়। কিন্তু সেখানেও নারীদের ভোটাধিকার ছিল না আর দাসদের তো পশুতুল্য জ্ঞান করা হতো। আব্রাহাম লিংকনই এ দাসপ্রথা তুলে দেন। সে জন্য গৃহযুদ্ধ পর্যন্ত হয়েছিল। দাস প্রভুদের একজন তাকে গুলি করে হত্যাও করে। কিন্তু খেয়াল করবেন, লিংকনের বক্তৃতার প্রথম লাইনটিতে আছে, ‘All Men are created equal’. একই বাক্যে তিনি তার নিজের মার্কিন জাতি সম্পর্কে বলছেন, ‘Concieved in liberty’। এর অর্থ ‘মুক্তি’। সেই মুক্তি অর্জিত হতে পারে যখন সব মানুষকে সমানভাবে গণ্য করা হবে। লিংকনের ভাষায় যা হলো, ‘All Men are created equal.’

দেশ রূপান্তর : ছাত্রজীবনে আপনাকে অনলবর্ষী বক্তা বলা হতো বলে শুনেছি। আপনার সেই সময়কার বক্তৃতা দিতেন কোন পরিস্থিতিতে? প্রস্তুতি থাকত, নাকি উপস্থিতভাবেই ভাষণ দিতেন?

হায়দার আকবর খান রনো : ষাটের দশকটি ছিল অগ্নিগর্ভ। বিশেষ করে ৬২ সালে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সময় যে ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টিকারী পরিস্থিতিতে আমাদের বক্তৃতা রাখতে হতো, তাতে এ ধরনের বিশেষণ ব্যবহৃত হতো। তার মানে এই নয় যে, সব পরিস্থিতিতে অনলবর্ষণ করতে হবে। কোন সময়, কী পরিস্থিতিতে কোন শ্রোতার সামনে কতটা সময় নিয়ে বক্তৃতা করতে হবে, তা একজন ভালো বক্তাকে এসব বিবেচনায় নিয়েই বক্তৃতা করতে হয়।

দেশ রূপান্তর : যদি বলা হয় যুগের পরিবর্তনে বক্তৃতার সামাজিক রূপান্তর ঘটে। এ সম্পর্কে আপনি কী বলবেন?

হায়দার আকবর খান রনো : বক্তৃতার সামাজিক রূপান্তর বলে কিছু নেই। অবশ্যই স্থান, কাল, পাত্রভেদে ভাষার ও শব্দ চয়নে পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু এর সঙ্গে সামাজিক রূপান্তর কথাটিকে জড়িয়ে ফেলা একেবারেই অবান্তর।

দেশ রূপান্তর : রাজনীতির মাঠে নেতাদের অলিখিত বক্তৃতার কথাই আমাদের প্রথমে মাথায় আসে, কিন্তু অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির লিখিত ভাষণও মানুষের চেতনাকে প্রভাবিত করেছে। এমন উদাহরণ ইতিহাসে পাওয়া যায়। তেমন ভাষণের কথা জানতে চাইলে কোনটির কথা বলবেন?

হায়দার আকবর খান রনো : অবশ্যই অনেক বড়মাপের মানুষের লিখিত ভাষণ সমাজ-সংস্কৃতিকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছে, ইতিহাসে এমন উদাহরণ আছে। রবীন্দ্রনাথের জীবনের শেষ বক্তৃতাটি, ‘সভ্যতার সংকট’ এই শিরোনামে লিখিত আছে। তিনি অসুস্থতার কারণে ওটা নিজে পাঠ করেননি। তবে ওই ভাষণে সেই সময় পৃথিবীর রাজনৈতিক ঘটনাবলির সুগভীর বিশ্লেষণ আছে। কবিগুরু বলছেন, যে ইংরেজরা তাকে একদিন আকৃষ্ট করেছিল এখন আর তা পারে না। পাশ্চাত্য সভ্যতার বীভৎসতা তাকে আহত করেছিল, একেই তিনি বলছেন সভ্যতার সংকট। এই রবীন্দ্র ভাবনা সেদিনের পরাধীন ভারতবাসীর মনে রেখাপাত করতে পেরেছিল। এটা মাঠের বক্তৃতা নয়, এটা ভাষণ। লিখিত ভাষণ। কিন্তু তার ঐতিহাসিক তাৎপর্য ছিল বিরাট।

দেশ রূপান্তর : বক্তৃতা কি আর্ট?

হায়দার আকবর খান রনো : বক্তৃতা মাত্রই আর্ট। আপনি যে কথা বলতে চাচ্ছেন, শ্রোতাকে যে কথায় টানতে চাচ্ছেন তাকে অবশ্যই আর্টের স্তরে উন্নীত করতে হবে। অন্যথায় ভালো কথাও শ্রোতাকে আকর্ষণ করবে না। এ ক্ষেত্রে বক্তৃতা অনেকটা অভিনয়ের সঙ্গে তুলনীয়। তবে নাটকে শিল্পীরা অন্যের লেখা মুখস্থ করে বলেন। কিন্তু বক্তৃতার ক্ষেত্রে বক্তাকেই নিজের মতো করে কথা সাজাতে হয়।

দেশ রূপান্তর : বক্তা ও বক্তৃতার সম্পর্ককে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? অনেক সময় জনতাকে প্রলুব্ধ করার কৌশল নেন...

হায়দার আকবর খান রনো : বক্তা যদি কোনো জনপ্রিয় নেতা হন অথবা কোনো বড়মাপের মনীষী হন তখন স্রোতারা আগের থেকেই প্রস্তুত থাকে তার কথা শোনার জন্য। তখন তাকে ‘ডেমাগগি’ করতে হয় না। তিনি সরাসরি তার বক্তব্য উপস্থিত করতে পারেন। স্বল্প পরিচিত বক্তাদের অনেক কলাকৌশল অবলম্বন করতে হয় স্রোতাকে আকৃষ্ট করার জন্য, তখন তাদের ‘ডেমাগগি’র আশ্রয় নিতে হয়। আমার বিবেচনায় ডেমাগগি কখনোই ভালো নয়। এমনকি লেনিন পর্যন্ত বলেছিলেন যে, ডেমাগগরা শ্রমিক শ্রেণিকে ঠকায়। তার বিখ্যাত ‘What’s to be done’ গ্রন্থে এ কথাটি তিনি একাধিকবার বলেছেন। লেনিনের শিষ্য হিসেবে আমিও তাই মনে করি।

দেশ রূপান্তর : তারুণ্য বা যৌবনকালে আপনাদের বক্তৃতায় প্রতিপক্ষকে কি ব্যক্তিগত আক্রমণ করতেন? যা আজকাল করা হয়ে থাকে।

হায়দার আকবর খান রনো : আমাদের সেই সময় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবেই বক্তৃতায় আক্রমণ করা হতো। তাদের কাজ ও নীতির সমালোচনা করা হতো। স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী বক্তৃতাও হতো। কিন্তু ব্যক্তিগত কুৎসা বা চরিত্র হননের ব্যাপারটি ছিল না, যা এখন দেখা যায়। রাজনৈতিক শিষ্টাচার বলে একটা জিনিস আছে, যা রাজনীতিবিদদের মেনে চলা উচিত। অবশ্য সে ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। গণতন্ত্র অনুপস্থিত হয়ে গেলে, এ রকম অনাকাক্সিক্ষত অনেক ঘটনাই ঘটতে পারে।

দেশ রূপান্তর : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

হায়দার আকবর খান রনো : আপনাকেও ধন্যবাদ।