৭ মার্চের ভাষণ

শুধু শব্দ দিয়ে জাতিকে জাগিয়ে দেওয়া

রেহমান সোবহান ১৯৭১ সালে ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্সের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ দূত। গবেষণা সংস্থা সিপিডি-সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের সভাপতির সাতই মার্চের ভাষণের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা  জানতে তার মুখোমুখি হয়েছিলেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন

প্রশ্ন : স্যার, স্বাগত আমাদের আয়োজনে। আপনি বলছিলেন একটু আগে আমাকে, সেদিন ফার্স্ট রোতে বসে আপনি এই ভাষণ শুনেছিলেন।

রেহমান সোবহান : যখন উনি ভাষণ দিয়েছেন, হি ওয়াজ স্পিকিং এজ দি রুলার অব এ ইন্ডিপেন্ডেন্ট সোভেরেন স্টেট। ঠিক আছে, একটা ব্যাপার আছে এখানে।

প্রশ্ন : উনার ভাষণটাকে আপনি বলছেন একটা স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির ভাষণ।

রেহমান সোবহান : দ্যাটস রাইট। কিন্তু অভিয়েসলি ফর অভিয়াস রিজনস যে ওনাকে এভাবে ভাষণ দিতে হলো। কী উনি বলেননি, ডিক্লিয়ারিং ইন্ডিপেন্ডেন্টস। উনি এভাবে বললেন এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। এটা কিন্তু ক্রুশিয়েল ওয়ার্ড ছিল এইবার! ওই টেনসটা পরিষ্কার ছিল। মানে এইটা কখন হবে? কিন্তু ব্যাপারটা হয়ে গেছে। কিন্তু কখন আমি এখন একটা দায়িত্ব ফরমোলাইজ করব; এইটা ডিপেন্ড করছে। বিকজ হি ওয়ান্টেড টু লিভ ইট ওপেন। অনেক তর্ক-বিতর্ক হলো রাত্রে, সিক্স নাইটে (৬ মার্চ)। হাইকমান্ডের সঙ্গে বসেছিলেন পুরো রাত। মোস্টলি হাইকমান্ড; ওই যে কাপালিক (সিরাজুল আলম খান)  ও আরও কয়েকজন ইয়াংগার লিডার। আমি কি অফিশিয়ালি এইটা ডিক্লিয়ার করব নাকি করব না, একরম জায়গা থেকে একটা ফাঁক রাখতে হবে। এটা পিসফুলি হতে পারে এখানে। সিনিয়ার লিডার সব। বঙ্গবন্ধুর নিজের চিন্তা ছিল- উই হ্যাভ টু ডু ইট গ্রজুয়েল প্রসেস। আমি সরাসরি বলব না, Today we are officially independent. কারণ উনি জানতেন। এইটা খাদেম হোসেন রাজা বইতে লিখেছেন,sent a massage to them. এ রকম একটা পরিষ্কার একটা ডিক্লারেশন দিয়ে ওই সময় থেকে পুরো একটা ফুল স্কেল আক্রমণ আমি করব।

প্রশ্ন : স্যার, আপনি তো একদম সামনের সারিতে ছিলেন। সেই দিন মানে এই সমস্ত পরিকল্পনার সময় আপনি সারারাত বসেছিলেন, ৬ তারিখ রাতে...

রেহমান সোবহান : আমি তো বসেছিলাম না। আই গট দ্য ইনফরমেশন। অ্যান্ড দেন, আমার মনে আছে সকলে; আফটার দ্যাট আমি, প্রফেসর নুরুল ইসলাম ওই সময় ঢাকা ছিলাম। আমার গাড়ি করে উই ড্রপ রাউন্ড। আমি ইকবাল হল গেলাম। ইকবাল হল গেটে আমার কাপালিকের সঙ্গে দেখা হলো। আমি বললাম, কাপালিক কী হইল গত রাত? উনি বললেন, ‘আজকে তো হবে না।’ উনার মুড একটু খারাপ ছিল। বিকজ ওনার এইটা এক্সপেক্টেশন ছিল। টু বি রিয়ালাইজ, তারপর হি ওয়াজ বিয়িং দ্যান। উনি যে ভাষণ দিলেন, আমার ফার্স্ট ইমপ্রেশন ছিল, এই যে- একটা মাস্টারপিস ভাষণ। স্বাধীনতা প্রাকেই¬ম করেছেন, আবার  প্রাক্লেইম করেননি। এ রকম একটা কিছু বলা যায়। এই স্কিলটুকু তো ছিল ওইখানে।

প্রশ্ন : স্কিল এবং ইটস পোয়েটিক। মানে আপনি বলছেন যে, টেনস নাই হয়ে গেছে এখানে। মানে এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। এখানে বলা হচ্ছে না যে, আজকে থেকে ঘোষণা করছি বা কখন আমরা করব সেটাও বলা নাই। ইটস এ পোয়েটিক ভাষণ অলসো।

রেহমান সোবহান : খুবই স্কিলফুল। যেভাবে উনি ওয়ার্ডস ব্যবহার করেছেন এখানে তাতে তাই বলতে বলতে হবে। এইটা মেইন ইস্যু ছিল, পুরো বাংলাদেশকে মোবিলাইজ করেছেন, উদ্বুদ্ধ করেছেন। তখনকার সরকারের হাত থেকে পুরো ক্ষমতা ওইখান থেকে ওনার মধ্যে চলে গেল। ব্যাপার হচ্ছে, আমি নন-কোপারেশন মুভমেন্টে (অসহযোগ আন্দোলন) চলে যাচ্ছি।  নন-কোপারেশন মুভমেন্ট গান্ধী করেছে, ম্যান্ডেলা করেছে, অনেক লিডার করেছেন। কিন্তু কোনো আন্দোলনের ইতিহাস আমার মনে নাই। ইতিহাসে অত শক্তিশালী কিছু নাই যে, নন-কোপারেশন মুভমেন্ট থেকে সরকারের ক্ষমতা পরিবর্তন হয়ে গেছে। কিন্তু হি (বঙ্গবন্ধু) ওয়াজ নট অনলি লিডিং এ নন-কোপারেশন, সরকারের ক্ষমতাই সিইজড টু এক্সিস্ট। তো যেখানে কোনো ক্ষমতা নেই, তারপর দেশ চলবে কেমন করে? বেতন কে দেবে? ব্যাংক কে খুলবে? টাকার কী হবে? কৃষকের কাছে মাঠে কেরোসিন কেমনে যাবে? বীজ কেমন যাবে? যে কোনো কিছু এখন একটা ইকোনমি চালাবার ক্ষেত্রে তো ওইসব সাডেনলি হি ফাউন্ড দ্যাট এটা ফাঁকা হয়ে গেছে। হি হ্যাড টু টেক ওভার দি লিডারশিপ, অ্যান্ড হি ওয়াজ ফ্লেক্সিবিলি প্রাইম মিনিস্টার ইন বাংলাদেশ। ইউ ওয়ার ওয়ার্কিং এজ এ অ্যাসিস্ট্যান্ট। নুরুল ইসলামের ঘরে বসে সকলের সমস্যা কী ছিল তা আলোচনা হতো। কোন জায়গায় ইকোনিমির চাপ আসে। কোন জায়গায় কী করা যাবে। ওই আমলার সঙ্গে বসে উই হ্যাভ ডিসকাশন। বিকেলে কামাল হোসেনের সার্কিট হাউজের ওই ঘরে উনি ও তাজউদ্দীন সাহেব আলাপ করতেন, আমলার গ্রুপ আসত এই ঘরে। দ্যাট হি ডাজ হোয়াট ওয়াজ অব দ্য ডে। একটা অর্ডারের পেছনে তো একটা ক্ষমতা থাকতে হবে। ক্ষমতা তো ওনার ছিল। তো ওনার ক্ষমতা দিয়ে তারপর অর্ডার ওয়াজ অ্যালাউন্স। কত ঘণ্টার জন্য ব্যাংক খুলবে, কতটা কিভাবে দায়িত্ব দেবে, এগ্রিকালচারের সেক্টরের কি হবে, কেমন করে একটা ডিস্ট্রিবিউট করা যাবে; সব কিছুর ওপরই দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে।

প্রশ্ন : আপনার মতে সেটা ৫ মার্চ হয় এখানে?

রেহমান সোবহান : হ্যাঁ। ওই সময় থেকে ইফেকটিভলি দেশ স্বাধীন হয়ে গেল।

প্রশ্ন: স্যার, আপনি যে সামনে বসেছিলেন সেদিন এবং আপনি যে প্রত্যক্ষদর্শী। আপনি সেদিন মাঠে কী দেখলেন? ময়দানে কী দেখলেন?

রেহমান সোবহান : ময়দানে দেখলাম কী লাখ লাখ লোক রেডি আছেন। স্বাধীন দেশের পক্ষে যুদ্ধ করার জন্য। সবার হাতে লাঠি। আর উনি যুদ্ধ করেছেন শেষে, যখন প্রয়োজন হলো। কারণ শেষে উনি যখন ডাক দিয়েছেন, ডাক কত লোক শুনেছেন আর কত লোক শোনে নাই, এইটা তো অপরিষ্কার। কিন্তু যেসব লোক মাঠে নেমেছে, এমনি নেমেছে। এখন একটা মেসেজ আসছে কী, দেশ স্বাধীন আছে। তারপর ওই ডিফেন্স করে উনি মাঠে নেমে গেলেন। এই যে জিয়া সাহেব যখন ওই অ্যালাউন্স করেছেন অনেক লোক তো শুনে নাই। আবার যখন খালেদ মোশাররফের সঙ্গে আমার বাড়ি যাওয়ার পথে দেখা হলো, মার্চের শেষে ওই তেলিয়াপাড়া চা বাগানে। খালেদ আমাকে বলেছেন, আমি শুনেছি জিয়া এ রকম একটা ডিক্লারেশন করেছে। বাট হি ডিড নট ওয়েট ফর দ্যাট। উনি ওনার কমান্ডিং অফিসারকে অ্যারেস্ট করে উনি মাঠে নেমে গেলেন।

প্রশ্ন : স্যার, আমি যেটা জানতে চাই, আপনি ৭ মার্চের আগেই মানে ধরেন দুই পাকিস্তানের ইস্ট ও ওয়েস্ট পাকিস্তানের যে মানে প্রায় আমাদের দিক থেকে অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল, সেটা নিয়ে স্যার, আপনি প্রচুর লিখেছেন সেই সময়ে এবং আপনার লেখালেখিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে তখন। এ দেশের মানুষ ক্ষেপে উঠেছে যে কারণে। স্যার, ওই সময় আপনি এই সাহস কই পেয়েছেন আসলে?

রেহমান সোবহান : ওই সময় তো আমার বয়স কম ছিল। আমার তো অসম্ভব সাহস ছিল। বয়স হওয়ার কারণে কমে যায়। ওই সময় সব কিছু করার রাজি ছিলাম। এইটা তো আমার চিন্তা ছিল না, কী হবে আমাদের? আমি করে দিই দেখি তারপর কী হয়।

প্রশ্ন: স্যার, ওইসব লেখালেখির জন্য আপনি মানে বঙ্গবন্ধুর পরে তো বঙ্গবন্ধুর সাহচর্য পেয়েছেন আপনি। বঙ্গবন্ধু আপনার লেখালেখিগুলো নিয়ে কী বলেছেন? আমার জানার খুব আগ্রহ।

রেহমান সোবহান : না, ওনার জন্য আমার তো ইকোনমিক লেখা। এই শব্দ ওনি ব্যবহার করেছেন, ওনার মেনিফেস্টোর মধ্যে ঢুকেছে। তারপর কোনো ভাষণে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল ওইটা তো আমার ফার্স্ট ভাষণ ১৯৬৪ সালে। উনি আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে ছিলেন। আইয়ুবের তো বেশ এ রকম... আমি ভালো ডেভেলপমেন্ট করছি...। তো ইলেকশনের সময় উনার এ রকম একটা তাগিদ  ছিল। বঙ্গবন্ধু বলছিল আমি সরাসরি এটার উত্তর দেব। তারপর উনি আমাকে বলেছেন যে, তুমি আমার ভাষণের প্রিপারেশনের মধ্যে একটু হাত নাড়াইও এখানে। এভাবে হি উড ইউজ আস। তারপর আমি যেসব পলিটিক্যাল কথা, এসব যে লিখে যাচ্ছি এখানে। উনি তো আমার ফ্রন্ট পত্রিকা যে ছিল, এর ফার্স্ট সাবস্ক্রাইভার বঙ্গবন্ধু ছিলেন। পরে উনি লাইফটাইম সাবস্ক্রাইভার ছিলেন। এইটা তো আমার দুঃখের ব্যাপার, ওনার জীবন শেষ হয়ে গেল, আমারও পেপারের জীবন শেষ হয়ে গেল। বাট ফার্স্ট সাবস্ক্রাইভার উনি হাজার টাকা দিয়ে সাবস্ক্রাইভার হয়েছেন। অ্যান্ড হি ওয়াজ রিড ইট।

প্রশ্ন : স্যার, এখন যখন আপনি এই ভাষণটা শোনেন, হাউ ইউ ফিল?

রেহমান সোবহান : হাউ ডু আই ফিল। আই ফিল দ্যাট, এটা তো আমার ইট ইজ বিকাম পার্ট অব মাই লাইফ অ্যান্ড মাই মেমোরি। বিকজ এটা তো এখন একটা বড় অভিজ্ঞতা আমার জীবনের মধ্যে ছিল। এইটা ইন্সপিরেশন ছিল আমার জন্য। একা ছিলাম না তো, লাখ লাখ লোক ওইখানে বসে শুনছে। তো এ রকম একটা ম্যাচ মোটিভেশন, একটা মোবিলাইজেশন, একটা ইনস্পারেশন, এইটা তো একটা অসাধারণ জিনিস।

প্রশ্ন : দারুণ। স্যার, এ সময়ে ধরেন ওই ভাষণ তো, একটা সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে তখন ভয়ংকর প্রাসঙ্গিক, একটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছে, মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, তারপর আমরা স্বাধীন হয়েছি, দেশে অনেক পটপরিবর্তন হয়েছে। এই ভাষণটি স্যার, এখনো আমাদের তরুণদের কী বার্তা দেয় আসলে?

রেহমান সোবহান : এই ভাষণ থেকে দুইটি জিনিস নেওয়া উচিত। একটা, এখানে একটা ব্যক্তির এ রকম একটা ক্ষমতা ছিল। শুধু শব্দ ব্যবহার করে উনি এখন একটা দেশকে মোবিলাইজ করতে পারেন। কেন? কারণ, ওই দেশ, ওই লিডার যে আছে, উনার এ রকম একটা বিশ্বাস আছে। এই লোক যে আমাকে এখনও একটা ইন্সপিরেশন দিচ্ছে। আমার তো বাঙালি ইতিহাসের মধ্যে অনেক লিডারের অভিজ্ঞতা আছে। একটা কথা বলে, আরেকটা করে। এইটা উনার বিশ্বাস ছিল, হি ওয়াজ এ ম্যান হু কুড গো এনি হোয়ার, হি উড, ইনফাক্ট ডু দিস অ্যান্ড হি টেক আস এনিহোয়ার।

প্রশ্ন : আমি জানতে চাই যে, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আপনার সংশ্লিষ্টতা দীর্ঘকাল। আপনি লিখেছেনও, কিছু কিছু আমরা পড়েছি। মানে এজ এ ম্যান হাউ ইউ ডিসক্রাইব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান?

রেহমান সোবহান : এজ এ ম্যান, আমি বলব কী, উনি অসাধারণ লোক। অনেক লিডারের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে লোকালি, ইন্টারন্যাশনালি কিন্তু কোনো ব্যক্তির সঙ্গে এই লেভেলে আমার দেখা হয়নি। একটা হিউম্যান টাচ গভীর ছিল এখানে। হিউম্যান টাচ মানে পারসোনালি তোমার সঙ্গে যদি উনি আজকে বসে কথা বলে, ইউ উইল রিমেম্বার ইউ ফর দ্য রেস্ট ইন লাইফ। এটা আমি খুব দেখি নাই, বিকজ অনেক মানুষ ইভেন পিপল লাইক আস, অনেক লোকের সঙ্গে দেখা হয়- ১০ মিনিট কথা হয়, দেন আই উইল নেভার রিমেম্বার ইউ গেট আফটার দ্যাট। হি ওয়াজ নট লাইক দ্যাট, এভরি হিউম্যান বিয়িং ওয়াজ ইন্ডিভিজুয়াল টু হিম। দ্যাট ওয়াজ উনার স্পেশাল কোয়ালিটি। উনার শক্তি ছিল, দুর্বলতাও ছিল। উনার মানুষকে লয়ালিটি মোবালাইজ করা খুবই একটা মেজর কোয়ালিটি ছিল। এ রকম মানুষ আমাকে দেখে, আমি একটু সাধারণ লোক কিন্তু উনি আমার মনের ভেতরে চলে আসছে, আমার হার্টের ভেতরে চলে আসছে। অ্যান্ড হি ইজ লুকিং অ্যাট মি, অ্যান্ড হি ইজ নোইং মি। আই গিভ মাই লাইফ ফর দিজ ম্যান। বিকজ হি ইজ ফিটিং মি এজ এ হিউম্যান বিয়িং। অ্যান্ড হি ইজ ইকুয়াল।

প্রশ্ন: অনেক ধন্যবাদ স্যার। আপনি আমাদের অনেক সময় দিলেন।

রেহমান সোবহান : আপনাকেও ধন্যবাদ।