কহিবার সাধ এক মরিয়া ঘোষণাপত্র

বক্তৃতা খুবই অতিরঞ্জিত, অতিমূল্যায়িত একটা মনুষ্যক্রিয়া এক্সেরেটেড আর ওভাররেটেড। যেসব কাজ কমবেশি মানুষজন হাজার হাজার বছর ধরে করে আসছেন, যে কাজটা একটা জৈবক্রিয়াই মাত্র, যেটার জন্য এমনকি একটা বাঁশের বাঁশিতেও ফুঁক দেওয়া লাগে না, সেটাকে মূল্যবান অনুশীলন বিবেচনা করার খুব একটা কারণ এমনিতেই পাই না আমি। দার্শনিক-বুদ্ধিবৃত্তিক-রাজনৈতিক যেসব অর্থ বক্তৃতার মধ্যে চালান করে দেওয়া আছে, সেখান থেকেই যে এই মূল্যমান তাতে অবশ্যই সন্দেহ নেই এবং সেটা আমার গোচরে আছে। তা সত্ত্বেও একে নিয়ে এই-ই আমার রায়। আমি বার কয়েক বক্তৃতার একটা পুনঃনামকরণের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। বকবকক্রিয়া কিংবা বকবক-ত্রাতা। যথেষ্ট উৎসাহী লোকজন না পাওয়ায় এবং একটা ভক্তিশীল বাহিনি না পালতে থাকার অভ্যাসের কারণে শব্দটিকে জনপ্রিয় করা যায়নি। যাতে পাছে ভুলভাল বোঝাবুঝি না হয়, আমি আবারও নিশ্চিত করে উচ্চারণ করছি যে, বক্তৃতা একটা অতিমূল্যায়িত মনুষ্য-কর্ম। আলাপ, সংলাপ, প্রলাপ এমনকি বিলাপের তুলনাতেও বক্তৃতাকে আমি কম সক্ষম বিবেচনা করে থাকি। আর এই বিবেচনার প্রধান কারণটা আপনাদের বলে দিলে এক্ষুনি টের পাবেন আমার ফয়সালার গুরুত্ব। বক্তৃতাগুণ সততই অন্যের তাঁবেদারি-সাপেক্ষ শ্রোতার, ভক্তের, অনুগতের, প্রতিপক্ষের, সংবহনকারীর, সংবাদসংগ্রাহকের, বিদ্যালোভীর, জ্ঞানসৈনিকের, সংগঠনের ঝাণ্ডাধারীর, এবংবিধ। এর কোনো সার্বভৌমত্ব নেই।

বক্তৃতা মূলত একটা নিষ্কাশন অভ্যাস। ফলত আর পাঁচটা নিষ্কাশনের মূল্যমানেই একে দেখার পক্ষপাতী আমি। তবে এ কথাও ঠিক যে, মানুষের দেহের সব নিষ্কাশনকে এক কাতারে রাখার সুবিধা নেই। এবং কিছু নিষ্কাশন লোকচক্ষুর অন্তরালে ঘটে থাকে তাই-ই কেবল নয়, সেগুলো লোকসমক্ষে করার আমি বিপক্ষে। ফলে নিষ্কাশনের মধ্যকার তুল্যবিচার করা দরকার। সেই বিচারে, আমি বক্তৃতার সমীপবর্তী যে নিষ্কাশনকে রাখতে পারি তা হলো হাই-তোলা। জনসমক্ষে এটার গ্রহণযোগ্যতা আছে, যদিও দেখতে কদাকার। কিন্তু সেটা বক্তৃতার বেলাতেও ঘটতে পারে। অনেক মানুষের বক্তৃতাই প্রায় হাইতোলার মতোই কদাকার। এমনও হতে পারে, চর্চায় হাইতোলাও দৃষ্টিনন্দন হতে পারে; যেমন কিনা, কিছু মানুষের বক্তৃতা বা কিছু সময়ে তাদের বক্তৃতা শ্রুতিমধুর লাগতে পারে। হাই-তোলার বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের তাসের দেশ যে আবিষ্কার জানায়, তাতে অবশ্য আমার গুরুতর আপত্তি আছে। ব্রহ্মা কত হাই-তুলতেন বা এখনো তুলে থাকেন কিনা তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই, কিন্তু তাসের সঙ্গে এই হাইজনিত আলস্যের সংযোগ এবং কাঠখোট্টামির সংশ্লেষ নিতান্তই রবীন্দ্রনাথের তাসবিদ্বেষ হওয়ার সম্ভাবনা। আমি তাসক্রীড়াতে অতিশয় পাকা বলেই এই আপত্তি করলাম তা নয়, বরং নাটকটি অত্যন্ত উপভোগ্য সে জন্যও। তবে পরম নিরাকার ব্রহ্মের উপাসক রবীন্দ্রনাথ সাকার ব্রহ্মাকে নিয়ে মশকরা করেছেন এ রকম একটা সিদ্ধান্তে আমি আপাতত আসছি না। যে জন্য মনে পড়ল তা হাই-তোলার ঘটনাটি যেমন, তেমনি তাসের দেশ-এর কারিগররা মোটের ওপর যে কম বক্তৃতাপ্রবণ সে জন্যও। ওখানে যা ও যতটা বক্তৃতাধর্মী তা কিন্তু সেন্টিমেন্টাল রাজ্যের লোকজনই করে থাকেন। তাসের দেশ চালকেরা বিধান আওড়ান। বিধান পাঠ বা আউড়ানিকে বক্তৃতা ভাবলে এজলাসের চাপরাশিকে লোকে বক্তা হিসেবে দেখতেন। বিধিবিধান পঠন বক্তৃতা হিসেবে অত্যন্ত গৌণ বা নগণ্য। এটা ভেবে দেখার মতো একটা প্রস্তাব দিলাম। আপনারা মেহেরবানি করে ভেবে দেখবেন।  

এই যে বক্তৃতা মুখ্যত একটা নিষ্কাশন অভ্যাস তা বক্তারা সামান্যই বোঝেন। এটা জগতের সেই পরিহাসময় চর্চার একটা যেখানে চর্চাকারী কিছুতেই চর্চার চরিত্র ধরতে পারেন না। আধুনিককালে সারা দুনিয়ায় খুব অল্প বক্তাই আছেন যারা টের পান যে তার বক্তৃতাটি একটি নিষ্কাশন অভ্যাস বিশেষ। বিপরীতে, তিনি বা তারা ভাবতে থাকেন যে, বক্তৃতা হলো জেনেরেটিভ বা সঞ্জননী কর্মকাণ্ড (এই পরিভাষাটির জন্য শিশির ভট্টাচার্য্যরে প্রতি আমি আমৃত্যু খুশি হয়ে থাকব) যা সম্মুখে অভ্যাগতদের চিত্তে-মস্তিষ্কে ফল্গুধারার মতো প্রবাহিত হয়ে চলেছে। এ রকম বোধ প্রায়ই বক্তার ভেতরে জাগরূক থাকে যে, তার বক্তৃতাতে সম্মুখের শ্রোতৃকুলের দারুণ-দারুণ সব উপকার হচ্ছে। আর এই উপচিকীর্ষা বোধ তাকে আরও আরও বলতে বেগবান করে বা বেগ চাপিয়ে দেয়। প্রায়শই। মুশকিল হচ্ছে, বক্তৃতার শ্রোতৃকুলও এই প্রচারণা জারি রাখেন প্রায়ই। ‘আপনি যা বললেন গুরু, আপনি জ্ঞানের জাহাজ! সেই জাহাজ ভেঁপু বাজিয়ে আমার মাথার গিঁট সব ছাড়িয়ে দিল।’ তখন বক্তাটি আরও বড় জাহাজে রূপান্তরিত হওয়ার লোভে, আরও বড় ও আরও ঘন ঘন বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ বানিয়ে ছাড়েন। এসব দুর্যোগে বক্তৃতা আরও অতিরঞ্জিত হতে থাকে।

এতক্ষণের আলাপে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর টক-শোগুলোর কথা না মনে পড়ার কারণ নেই। আমি এখানে স্পিচ, লেকচার, টক, প্রফেসি ইত্যাদির মধ্যে অর্থময়তার ভেদবিচারের দায়িত্ব নিচ্ছি না। ভেদবিচার চলে কিনা সেই নীতিশাস্ত্রীয় আলাপ তো আরও তুলব না। সেই হিসেবে টক-শো বক্তৃতাই। তবে বিদ্যমান ব্যবস্থায় এটা কিছুটা বিচিত্র বক্তৃতা। এই বক্তৃতার ধরনটি ঠিকমতো বুঝতে আপনাদের বিসিএসের প্রিলিমিনারি দেওয়ার অভ্যাস থাকলে ভালো হতো। যাদের বয়স বেশি, এমনকি আমিও, আর সেই সুযোগ পাবেন/পাব না। ফলে বিকল্প হিসেবে মফস্বল বা গ্রামে রসগোল্লা বা লুচি খাবার পাল্লা/প্রতিযোগিতাতে যোগ দিলেও চলবে। কেবল দর্শক হিসেবে থাকলে চলবে না। অংশ নিতে হবে। আবার ঠিক যে কোনো রসগোল্লা-পাল্লাপাল্লিতে থাকলে চলবে না। যেগুলোতে সময়কাল নির্দিষ্ট থাকে সেগুলো লাগবে। এক ঘণ্টায় কে কয়টা খাইতে পারলি! অবশ্য জিনিসপত্রের যে দাম তাতে এখন এসব প্রতিযোগিতা হয় কিনা আমার সন্দেহ! যা হোক, ওই যে সময়কাল ওটা টকশো-বক্তৃতাকে বুঝবার জন্য জরুরি। চারজন বা ততোধিক লোক বসে টিভিসি/বিজ্ঞাপন সময় বাদ দিয়ে ওই নির্দিষ্ট সাড়ে ২৬ মিনিটে পেটভর্তি বক্তৃতার কাঁচামাল কে কতটা ও কত দ্রুতগতিতে পিচকিরির মতো ছিটাতে পারছেন তার একটা প্রতিযোগিতা বিশেষ। সেই কারণে এই বক্তৃতাটি (রাজি) বেশ অনন্য এবং মোটের ওপর কদাকার। উপরন্তু কদাকার হিসাবেও অনন্য। কিন্তু জনপ্রিয় অনুষ্ঠান। হয়তো চারজনের বক্তৃতার পিচকিরির ক্রসকানেকশনের কারণে ক্রীড়াময়তার উত্তেজনা তৈরি হয় এতে। তা ছাড়া রসগোল্লা খাবার প্রতিযোগিতার সঙ্গে তুলনা করলে এই বক্তৃতা-ছিটানোর-প্রতিযোগিতাটির খরচ নিতান্ত কম। যারা টিভি-অনুষ্ঠান উৎপাদন বিষয়ে ধারণা রাখেন তারা সেটা সহজেই মনে করতে পারবেন। 

তবে টিভির টক-শোগুলোর লাগাতার নিন্দাই যে আমার লক্ষ্য তাও নয়। বরং এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ উপকার করেছে। রাজনীতির বক্তৃতাগুলোতে আস্ত একটা বইয়ের দৈর্ঘ্যে জ্ঞান-বিকিরণের চাপমুক্ত হয়েছেন রাজনীতিবিদরা। আমি স্পষ্ট করি বরং। এখনো বিরাট বিরাট বেহুদা আস্ফালনসর্বস্ব বক্তৃতা রাজনীতিবিদরা দিয়ে থাকেন। সেটা নিয়ে বলছি না। আমি বলছি যেসব রাজনীতিবিদ ‘উৎকৃষ্ট জ্ঞাননির্ভর বক্তৃতা দিতে হইবে’ এই চাপে থাকতেন তারা মোটের ওপর একটা ইতিহাসগ্রন্থ মুখস্থ করে এসে দাঁড়ানোর কঠিন ব্রত পালন করতেন। কেবল বামনেতাদেরই এই বড় রোগটি ছিল তা নয়, হয়তো তাদের মধ্যে উৎকট ছিল; এই চাপে-পড়া বক্তৃতানুশীলন ছিল মুখ্য বুর্জোয়া দলগুলোরও ‘পণ্ডিত’ বলে স্বীকৃত লোকজনের। তাদের দুইটা বড় দায়িত্ব সামলাতে হতো। একটা হলো ওই ইতিহাস পুস্তক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বলতে থাকা, আরেকটা হলো টোনাল বা ধ্বনিগত একটা সরগম অনুশীলন। কেমন কাঁপা কাঁপা গলায় লোপিচ থেকে হাইপিচে তারা আসা-যাওয়া করতেন সেটা আপনাকে অবিকল করতে দিলে আপনার হাত-পা কাঁপতে শুরু করবে। মাত্র দুই দশক আগেও এগুলো ছিল ‘পণ্ডিত’ রাজনীতিবিদগণের সাধারণ দক্ষতার আবশ্যিকতা। টিভি-টকশো এসে তাদের মুক্ত করে দিয়েছে। ময়দানে লম্বা লম্বা বক্তৃতা এখন পাণ্ডা এবং প্রধানদের কাজ, তার মান যাই হোক না কেন। পার্টির পণ্ডিতরা টকশোর ২৬ মিনিটের পিচকিরি চালাতে পারলেই চলে। বিরাট মোডালিটির বদল এসেছে রাজনৈতিক অভিব্যক্তিতে।  

তবে সৃষ্টির আদিকাল থেকেই বক্তৃতা অতিমূল্যায়িত তা আমি ভাবি না। আদিকাল থেকে আমি সৃষ্টিতে ছিলাম না সত্য, কিন্তু অন্য অনেকের মতোই আমি আন্দাজ করতে পারি যে, পুস্তকহীনকালে বক্তৃতার প্রধান গুণ ছিল শ্রুতিময়তার উন্মেষ ঘটানো। শ্রুতিভিন্ন সেখানে সংযোগের পথ নাই জ্ঞানের সঙ্গে, তথ্যের সঙ্গে, অনুভাবের সঙ্গে। শ্রুতিভিন্ন প্রজ্ঞার পথে যাত্রার উপায় নেই। শ্রুতিপাঠে ঈশ্বর পর্যন্ত বিরাজিত থাকতেন, বিকশিত হতেন। নিঃসীম শ্রুতিরাজ্যে বক্তৃতা কেবল নিষ্কাশন নয়, সংশ্লেষণ। শ্রবণ ও ভাষণের যে অবধারিত মিথষ্ক্রিয়া ও তা অবাধে থাকতে পেরেছে যখন লিপি নেই। লিপির বিধিবদ্ধতায় বক্তৃতা হয়ে পড়েছে লিপির অনুষঙ্গ মাত্র। এমন এক অনুষঙ্গ যাকে লিপির কারসাজি দিয়ে সিদ্ধ হতে হয়। আর শ্রোতৃকুলেও লিপিমালার জয়জয়কার। তাদের হাতেও লিপিমালার তথ্যসূত্রের গজফিতা সারে সারে সাজানো। শ্রোতৃকুলের পুনঃপুনঃ হর্ষধ্বনি আর জোরারোপ (বা অন্যত্র প্রত্যাখ্যান ও দুয়োধ্বনি) ছাড়া বক্তৃতার কোনো ব্যক্তিত্ব তৈরি হয় না। লিপির শাসনে বক্তৃতা কমজোর অভ্যাস, একটা লিগ্যাসি। বক্তা বড়জোর প্রাণপণ এটাই বলতে থাকেন যে, তিনি আছেন!

লেখক : অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক