১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’-এর অনুবাদগ্রন্থের জন্য সাহিত্যে নোবেল পেয়েছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিনি প্রথম অশ্বেতাঙ্গ এবং প্রথম এশীয় হিসেবে নোবেল জয় করেছিলেন। রীতি অনুযায়ী, ওই বছর নভেম্বর মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার সুইডিশ একাডেমির নোবেল কমিটি পুরস্কার ঘোষণা করে। সবাইকে চমকে দিয়ে ঘোষণা করা হয় রবীন্দ্রনাথের নাম। রবীন্দ্রনাথের নোবেল পাওয়ার সংবাদটি আসে তারবার্তায়। তিনি শান্তিনিকেতনে থাকাকালে একজন তার কাছে সেই বার্তা নিয়ে আসেন। রবীন্দ্রনাথ তৎক্ষণাৎ তা পকেটে পুরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষমেশ বার্তাবাহকের তাগাদাতে তা পড়েন এবং তিনি জানলেন, তিনি এক অবিস্মরণীয় কীর্তি গড়েছেন। রবীন্দ্রনাথ বলতে ভোলেননি, ব্যাপারটি তার কাছে অবিশ্বাস্য লেগেছিল!
প্রতি বছর ১০ ডিসেম্বর সুইডেনের স্টকহোম সিটির ‘ব্লু হল’-এ জাঁকজমকপূর্ণ এক ভোজসভায় নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। মহাভোজ, সংস্কৃতিক পরিবেশনা; সেই সঙ্গে নোবেলজয়ীদের অনবদ্য ও আকাক্সিক্ষত বক্তৃতা। তবে ডিসেম্বরের ১০ তারিখে রবীন্দ্রনাথ নিজে উপস্থিত থেকে নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করতে পারেননি। ঘটনাচক্রে সেই ভোজসভায় উপস্থিত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন স্টকহোমে নিযুক্ত তৎকালীন ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত। তবে ওইদিনের জন্য তিনি একটি খুদেবার্তা পাঠিয়েছিলেন। তা ছিল এ রকম ‘সুইডিশ একাডেমির বিবেচনার কাছে আমি আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তারা দূরকে নিকট করেছেন এবং এক অপরিচিতকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে বরণ করে নিয়েছেন।’
সেদিনের রাজকীয় ভোজসভায় রবীন্দ্রনাথ যাননি ঠিকই, কিন্তু বক্তৃতা তো তাকে দিতেই হতো। কবিগুরু সেই শর্ত পূরণ করেন ৭ বছর পর, ১৯২১ সালে ২৬ মে।
রয়্যাল সুইডিশ একাডেমির মঞ্চে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ স্মরণ করেছিলেন তার কাছে আসা সেই তারবার্তার কথা, যেদিন শান্তিনিকেতনে তিনি হাঁটছিলেন। সেদিনের স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেছিলেন, ‘সেই দিনের বিকেলবেলার কথা মনে পড়ছে, যেদিন আমি ইংল্যান্ডের সেই প্রকাশকের কাছ থেকে আসা তারবার্তায় আমার নোবেলপ্রাপ্তির কথা জানতে পারি। আমি ওই সময় শান্তিনিকেতনে ছিলাম। আমার মনে হয়, এই বিদ্যালয়ের বিষয়ে আপনারা জ্ঞাত রয়েছেন। আমি একটি দলের সঙ্গে কাছাকাছি একটি জঙ্গলে বেড়াতে যাচ্ছিলাম তখন। ডাক অফিসের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ে একজন দৌড়াতে দৌড়াতে এসে আমার হাতে বার্তাটি দিয়ে যায়।’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পশ্চিমা দুনিয়ার তাকে বেছে নেওয়া নিয়ে যারপরনাই বিস্মিত ছিলেন। সে কথাও উঠে এসেছে তার নোবেল বক্তৃতায়। তিনি বলেন, নোবেলজয়ের খবর প্রাপ্তির দিন রাতে ‘আমি ছাদে একাকি বসে নিজের কাছে প্রশ্ন রাখি, পশ্চিমা দুনিয়ায় আমার এই গ্রহণযোগ্যতা এবং সম্মানের কী কারণ থাকতে পারে? আমি সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ের এক ভিন্নজাতের মানুষ। পশ্চিমের সন্তানদের থেকে সর্ব অর্থেই আলাদা। আমার এই প্রশ্ন কোনো উচ্চমনস্কতা থেকে উৎসারিত নয়, বরং তা প্রকৃতই আমার হৃদয়ের গহিন থেকে উঠে আসা একটা কৌতূহল। সেই মুহূর্তে নিজেকে খুবই তুচ্ছ বলে মনে হয়েছিল।
১৯১৩ সাল পেরিয়ে কেটে গেছে বহুকাল। নিখাদ এক বাঙালির নোবেল পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত। ওই বছর অর্থনীতিতে নোবেল জয় করেন বাঙালি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। তিনি অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী প্রথম বাঙালি। এক অর্থে বিচার করলে বলা যায়, নোবেল পুরস্কারের রাজকীয় ভোজে অংশ নিয়ে বাঙালি হিসেবে সশরীরে হাজির হয়ে নোবেল নিতে গিয়েছিলেন তিনিই প্রথম। অর্থনীতিকে মানুষের জীবনমানের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে যে গবেষণামূলক যাত্রাপথ রচনা করেছিলেন, ১০ ডিসেম্বরের বক্তৃতায় যেন তারই স্ফুরণ ঘটেছিল। দর্শন, সাহিত্যকে নিজের মধ্যে যেভাবে ধারণ করেন সেটাই যেন ঢেলে দিয়েছিলেন ব্লু হলের মঞ্চে।
অমর্ত্য সেন বক্তৃতা শুরু করেন সেই প্রাচীনতম কবি হোরেসের কাছ থেকে ধার করা উদ্ধৃতি দিয়ে। ইনি সেই হোরেস যার জন্ম হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৬৫ অব্দে ইতালির কোনো এক গ্রামে। ‘যথাসময়ে বোকামি প্রদর্শন বেশ জরুরি কাজ’ হোরেসের এমন উদ্ধৃতি অবলম্বন করে বিনয়াবনত হয়ে নোবেল গ্রহণের অনুষ্ঠানে নিজেকে তুলে ধরলেন একজন বোকা কিংবা গড়পড়তা কেউ একজন হিসেবে। কিন্তু তিনি যা বললেন, তা ছিল প্রায় উঁচুদরের কোনো একটি বিদগ্ধজনের লেখার মতো। সাহিত্য থেকে দর্শন, সেখান থেকে বিজ্ঞান নোবেল বক্তৃতায় সব ছুঁয়ে যেন এক অনবদ্য প্রবন্ধের অবতারণা করেছিলেন অমর্ত্য।
বিশ্ববরেণ্য গুণীজনের সামনে অমর্ত্য বলেন, ‘আমার প্রথম বোকামিপূর্ণ ভাবনাটি এমন, নিয়মবিদ্যার সীমা-পরিসীমা বেশ কিছু সন্দেহের উদ্রেক করে। পদার্থবিজ্ঞানীকে উত্তরাধুনিক সমালোচনা মোকাবিলা করতে হয়। সৃষ্টিতত্ত্ববাদীদের বিপরীতে দাঁড়াতে হয় জীববিজ্ঞানীদের। অর্থনীতিবিদ (নিজের কথাকে বুঝিয়েছেন) আর সমাজবিজ্ঞানীদের ক্ষেত্রে সন্দেহটা আরও জোরালো।’
তিনি সেই সময়ে সমাজের প্রচলিত এক ‘তথাকথিত’ চিন্তাপদ্ধতিকে চাঁছাছোলা ভাষায় বিঁধেছিলেন। সেটি হচ্ছে, এটা না হলে ওটা তুমি কোন পক্ষে। অর্থাৎ ‘বাইনারি’ ধাঁচে আমাদের মধ্যে বহু মানুষের চিন্তার গড়নের কথাই তিনি বলছিলেন। উপমহাদেশের ক্রমবর্ধমান প্রতিক্রিয়াশীলতার কাছে যা এক তীক্ষèতম অস্ত্র। অমর্ত্য এ সংক্রান্ত ভাবনাকেও নিজের বোকাটে ভাবনা হিসেবে চালিয়ে দিয়েছিলেন। বাজারব্যবস্থা নিয়ে নিজের অবস্থান, নিজের দারিদ্র্য দর্শন সব মিলিয়ে পুঁজিবাদী প্রতিক্রিয়ার সামনে তিনি বলেছিলেন, ‘এই মুক্তচিন্তার যুক্তিপ্রবাহ থেকে অর্থনীতিবিদদেরও শেখার রয়েছে। কোনো গোঁড়ামি থেকে বেরিয়ে আসতে তা সাহায্য করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এমন প্রশ্নের সামনে আমাদের প্রায়শই পড়তে হয় আপনি বাজারের সপক্ষে না বিপক্ষে? রাষ্ট্রের কর স্পর্শকে সমর্থন করেন, না করেন না? কোনো ‘কিন্তু’, ‘যদি’ বাদ দিয়ে উত্তর দিন। এমন প্রশ্ন এলে বিশ্লেষণকে সরিয়ে রেখে এর সপক্ষে পা বাড়ানোটা এক বৃহত্তর গোঁড়ামির দ্বারা চালিত হওয়া। হয় এটা হও, নয়তো ওটা।’
আর হ্যাঁ, প্রথম বাঙালি নোবেলজয়ী রবীন্দ্রনাথের কথাও ভোজসভার স্মরণে এনেছেন তিনি। তিনি যা বলেছিলেন, তা শোনা যাক তারই বয়ানে। তার ভাষ্য ছিল এমন ‘শৈশবকালে বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংস্পর্শে আসার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। সেই মানুষটির নানা কীর্তির সঙ্গে এটাও বলা প্রয়োজন যে, তিনি ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পেয়েছিলেন। এই কবি ভারত ও বাংলাদেশ, এই দুই দেশের জাতীয় সংগীতেরই রচয়িতা। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ এক আশ্চর্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে আমার ঠাকুরদা শিক্ষকতা করতেন। আমি এই বিদ্যালয় চত্বরেই জন্মগ্রহণ করি। এই বিদ্যালয়ের লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের একই সঙ্গে স্থানীয় আর বিশ্বায়িত শিক্ষাদান করা। রবীন্দ্রনাথ ভাবতেন মানুষের সেই কীর্তি তা যেখানেই হোক, তা শেষ পর্যন্ত সবার সম্পত্তি। তার বিশ^জনীন, সহিষ্ণু আর যুক্তিনিষ্ঠ মতাদর্শ আমার চিন্তা-ভাবনায় গভীর প্রভাব ফেলেছে।’
এই শতকে আরেক বাংলাদেশের ব্যক্তিত্ব ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছিলেন, ২০০৬ সালে শান্তিতে। তার সঙ্গে নোবেল জয় করেছিলেন তারই প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির ৯ প্রতিনিধিকে নিয়ে ডক্টর ইউনূস হাজির হয়েছিলেন স্টকহোমে। শান্তির জন্য দারিদ্র্যকে হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেন। প্রশ্ন তোলেন বিশব্যাপী আয়বৈষম্য নিয়ে, যা আজকের দিনে প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দারিদ্র্যমুক্তিকে মানবাধিকারের সঙ্গেও জুড়ে দেন তিনি। বিশেষ করে তার প্রতিষ্ঠানের ক্ষুদ্রঋণ যে প্রান্তিক নারীদের জন্য আশাপ্রদ ঘটনা, তাকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন তিনি। সেই সময় বিশ্ব গণমাধ্যমে উঠে আসে চট্টগ্রামের সেই ‘জোবরা গ্রাম’, যেখান থেকে শুরু হয়েছিল গ্রামীণ ব্যাংক। ডক্টর ইউনূসের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম প্রাচ্যের নানা প্রান্তের দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলে জায়গা করে নিয়েছে।
ইউনূস বলেছিলেন, শান্তিকে উপলব্ধি করতে হবে মানবিক তাৎপর্যে; সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে। আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা ন্যায়সংগত না হলে এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পরিবেশ বজায় না থাকলে, পরিবেশের মতো উপাদান অবক্ষয় হলে, শান্তি হুমকির মুখে পড়ে। মানবাধিকারের অনুপস্থিতিই হলো দারিদ্র্য। চরম দারিদ্র্যজনিত হতাশা, বৈরিতা ও ক্ষোভে কোনো সমাজে শান্তি টেকসই হতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, ‘সমাজে দরিদ্রদের নিয়েই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসমষ্টি গড়ে উঠেছে। তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করাই আমাদের সব কাজ। এ জন্য গত ৩০ বছরে আমাদের সব প্রয়াস সে কাজেই নিবেদিত রেখেছি।’