ইবনে হিশামের সিরাতে উল্লেখ মতো হযরত মুহাম্মদ (সা.) তার জীবনে একবার মাত্র হজ পালন করেন। সেই হজের সময় তিনি মোট তিন দিন ভাষণ দেন। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন সেই হজ হয়তো তার জীবনের শেষ হজ। হজের ৮৩ দিন পর তিনি ইন্তেকাল করেন। দশম হিজরির এই হজের এই ভাষণে রাসুল (সা.) তার উম্মতদের জন্য বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন যা যুগ, ধর্ম, জাতি নির্বিশেষে মানব জাতির জন্য মানবাধিকার, গণতন্ত্র, সুশাসন, ব্যক্তি ও ব্যষ্টির জীবনাদর্শেও স্থায়ী দিক নির্দেশক। ইসলাম ধর্ম যে ধাপে ধাপে ও পর্যায়ক্রমে পূর্ণতা পেয়েছিল, তারই চূড়ান্ত ঘোষণা ছিল নবীজির (দ.) এই ভাষণ। এই ভাষণের তাৎপর্য কালোত্তীর্ণ। এর ঐশী স্বীকৃতির কথাও উল্লেখ্য ভাষণ প্রদানকালের সেই মুহূর্তে আল্লাহর সর্বশেষ অহি নাজিল হওয়া। কোরআনের ৫ সংখ্যক সুরা মায়িদার ৩ নম্বর আয়াতেই আল্লাহ ঘোষণা দেন যাতে প্রকাশ পায় রাসুল (সা.) আল্লাহ প্রদত্ত সব দায়দায়িত্ব পালনের পরিপূর্ণতার স্বীকৃতি :
‘আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং আমার নিয়ামত তোমাদের জন্য পরিপূর্ণ করে দিলাম। ইসলামকে তোমাদের জন্য একমাত্র জীবন ব্যবস্থা হিসেবে মনোনীত করলাম।’
ভাষণটি পূর্ণাঙ্গরূপে সংরক্ষিত হয়নি। বিভিন্ন হাদিস, তাফসির, ইতিহাস ও জীবনীগ্রন্থে আংশিক এবং খন্ড খন্ড আকারে তা সংকলিত হয়েছে। সকল হাদিসে বিদায় খুতবার উদ্ধৃতি অন্তর্ভুক্ত আছে। বুখারি শরীফের ১৬২৩, ১৬২৬ এবং ৬৩৬১ নম্বর হাদিসে ভাষণের বিভিন্ন অংশ উদ্ধৃত হয়েছে। সহিহ মুসলিম শরীফে ৯৮ নম্বর হাদিসে এবং তিরমিজি শরীফের ১৬২৮, ২০৪৬ এবং ২০৮৫ সংখ্যক হাদিসে বিদায় হজের খুতবার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। বিদায় খুতবার দীর্ঘতম উদ্ধৃতি দিয়েছেন ইমাম আহমদ বিন হাম্বল। তার সংকলিত হাদিসগ্রন্থ ‘মুসনাদ’-এর ১৯৭৭৮ সংখ্যক হাদিসে এই বর্ণনা পাওয়া যায়।
এই ভাষণে ইসলাম ধর্মের মর্মবাণী সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছিল। মুসলিম জাতির সাফল্যের ধারা বজায় রাখতে মুসলমানদের করণীয় সম্পর্কে বিশ^নবী, রাহমাতুল্লিল আলামীন চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। এই ঐতিহাসিক ভাষণ কেবল উপাসনামূলক অনুশাসন ছিল না, বরং মানবসমাজের জন্য করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ভাষায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপদেশও এতে ছিল। আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, তার সার্বভৌমত্বের সাক্ষ্য, মানবজাতির ঐক্য, আধ্যাত্মিক ভ্রাতৃত্ব, সামাজিক স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক সাম্য ইত্যাদি সমাজ বিনির্মাণের অন্যতম সব বিষয়ই এই ভাষণের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই ভাষণে দায়িত্ব নিষ্ঠতার গুরুত্ব যেমন দেওয়া হয়েছিল তেমনি পাপাচারের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল। এতে সমাজ ও রাষ্ট্রে অরাজকতা, বিদ্রোহ এবং কুপরামর্শ প্রদানকারী শয়তানদের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। এই ভাষণে বিভিন্ন ধরনের সুদপ্রথা রহিত করে শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছিল। নারীর পূর্ণ নিরাপত্তা, সম্মান ও অধিকারকে নিশ্চিত করার জন্য মুসলমানদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এই ভাষণে। মানুষে মানুষে আত্মীয়তার বন্ধন, বিশেষ করে রক্তের সম্পর্কের ওপর সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল। সামাজিক কুসংস্কার থেকে মানুষের মুক্তি লাভের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। এই ঐতিহাসিক ভাষণে স্বর্গ-মর্ত্যরে সব কিছুর ওপর আল্লাহর কর্র্তৃত্ব সুনিশ্চিত করা হয়েছিল এবং মানুষকে এসব কিছুর আমানতদার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল অর্থাৎ জলবায়ু সংকটের এই বর্তমানকালে প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় আমাদের দায় সম্পর্কে এই ভাষণে ইঙ্গিত দেওয়া ছিল। আল্লাহর মালিকানায় সবার অধিকার স্বীকৃত বলে উত্তরাধিকার আইনের ওপর অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করা হয়েছিল। আমানতের খেয়ানতকারীর প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছিল। মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্ভ্রমের নিরাপত্তা বিধানের জন্য কাজ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল। সাম্য, স্বাধীনতা, ন্যায়পরায়ণতা, ভ্রাতৃত্ব এবং বদান্যতা ও মানবতার পরম ধর্ম হিসেবে ইসলামকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল এই ভাষণে।
সহিহ মুসলিমের বর্ণনা থেকে ভাষণটির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ
কারও কাছে যদি কোনো আমানত রক্ষিত থাকে, তাহলে সে যেন তা আমানতকারীর কাছে পৌঁছে দেয়।
আজ থেকে সব ধরনের সুদ রহিত করা হলো। তোমাদের কেবল মূলধনের ওপর অধিকার রইল। সর্বপ্রথম আমি হজরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের সুদ রহিত করছি।
তোমরা অন্যের ওপর অত্যাচার করবে না, নিজেরাও অত্যাচারিত হবে না।
অন্ধকার যুগের সব কৌলীন্য বিলুপ্ত করা হলো। শুধু কাবাঘরের তত্ত্বাবধান ও হাজিদের পানি পান করানো ছাড়া।
আজকের পর তোমাদের ভূখন্ডে শয়তানের উপাসনার ব্যাপারে সে নিরাশ হয়ে গেছে। কিন্তু কিছু ব্যাপার, যেগুলোকে তোমরা বড় পাপ মনেই করো না তার অনুসরণ করলে শয়তান খুশি হবে।
তোমাদের নিজ স্ত্রীদের ওপর যেমন তোমাদের অধিকার রয়েছে, তদ্রুপ তাদেরও তোমাদের ওপর অধিকার রয়েছে।
সব মুমিন পরস্পর ভাই ভাই। কারও জন্য অন্যের সম্পদ বৈধ নয়। তবে যদি কেউ স্বেচ্ছায় কাউকে কিছু দেয়, তাহলে সেটা স্বতন্ত্র ব্যাপার।
আমার পর তোমরা কুফরিতে ফিরে যেও না। পরস্পর খুনোখুনি করো না। আমি তোমাদের মাঝে এমন দুটি জিনিস রেখে গেলাম, তোমরা তা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরলে কখনো বিভ্রান্ত হবে না। তা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব (পবিত্র কোরআন) ও তার রাসুলের হাদিস।
তোমাদের প্রভু একজন। তোমাদের পিতাও একজন। তোমরা সবাই আদম থেকে, আর আদম মাটি থেকে সৃষ্টি। তোমাদের মাঝে যারা সর্বাধিক মুত্তাকি, খোদাভীরু তারাই আল্লাহর কাছে সর্বাধিক মর্যাদাবান। তাকওয়া ছাড়া কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই।
আল্লাহতায়ালা প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর অংশ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। উত্তরাধিকারীর জন্য কোনো অসিয়ত প্রযোজ্য নয়। অন্যদের জন্য এক-তৃতীয়াংশের অধিক অসিয়ত করা বৈধ নয়।
তোমরা আমির বা নেতার আনুগত্য করো এবং তার কথা শ্রবণ করো, যদিও তিনি হন হাবশি ক্রীতদাস। যতদিন পর্যন্ত তিনি আল্লাহর কিতাব অনুসারে তোমাদের পরিচালিত করেন, ততদিন অবশ্যই তার কথা শুনবে, তার নির্দেশ মানবে ও তার প্রতি আনুগত্য করবে। আর যখন তিনি আল্লাহর কিতাবের বিপরীতে অবস্থান গ্রহণ করবে, তখন থেকে তার কথাও শুনবে না এবং তার আনুগত্যও করা যাবে না।
সাবধান! তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি থেকে বিরত থাকবে। জেনে রেখো, তোমাদের পূর্ববর্তীরা এই বাড়াবাড়ির কারণেই ধ্বংস হয়ে গেছে। (এ নির্দেশনাটি হচ্ছে অমুসলিমদের ক্ষেত্রে) অর্থাৎ কোনো বিধর্মীকে বাড়াবাড়ি বা জোরজবরদস্তি করে ইসলামে দীক্ষা দেওয়া যাবে না। তবে একজন মুসলমানকে অবশ্যই পরিপূর্ণ ইসলামি জিন্দেগী অবলম্বন করে জীবনযাপন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সুবিধাবাদের কোনো সুযোগ নেই।
আমাদের কিয়ামতের দিবসে জিজ্ঞাসা করা হবে। তোমাদেরও জিজ্ঞাসা করা হবে। তখন তোমরা আমার ব্যাপারে কী বলবে? আমি কি তোমাদের কাছে আল্লাহর দ্বীন পৌঁছে দিয়েছি? উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম উত্তর দিলেন, আমরা সাক্ষ্য দেব যে আপনি আপনার দায়িত্ব পৌঁছে দিয়েছেন। হিত কামনা করেছেন।
অতঃপর মুহাম্মাদ (দ.) আকাশের দিকে হাত তুলে তিনবার বললেন, আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকুন। তারপর বললেন, তোমরা এখানে যারা উপস্থিত আছ তারা অনুপস্থিতদের কাছে (কথাগুলো) পৌঁছে দেবে।
লেখক : সরকারের সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান