বিবর্তন

ভাষণের ভূষণ

ভাষণ নামক ব্যাপারটার ক্যারিশমা বুঝতে আমাদের কিছুক্ষণের জন্য ফিরে যেতে হবে কয়েক হাজার বছর আগে, বনবাদাড়ের পাশে গড়ে ওঠা শিকারি-সংগ্রাহক মানুষদের ছোট ছোট গোষ্ঠী সমাজে এবং সেখানে গিয়ে ভাষণের বদলে আমাদের প্রথমে খুঁজতে হবে গান। আধুনিক সমাজে যেমন একজন গায়ক গান গায় এবং শ্রোতারা তা মুগ্ধ হয়ে শোনে, আদি সমাজে ব্যাপারটা আসলে তেমন ছিল না। সেখানে গানের আয়োজন হতো দলগত, দিন শেষে গোষ্ঠীর সবাইকে একাত্ম করতেই হয়েছিল গানের উদ্ভব। অন্তত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক, জৈবিক নৃবিজ্ঞানী ও বিবর্তনীয় মনোবিদ রবিন ডানবারের তেমনটাই ধারণা।

দিনের সব প্রবৃত্তিগত কাজবাজ সেরে গোষ্ঠীকে চাঙ্গা রাখার ক্ষেত্রে দলগত না গানই ছিল তাদের প্রধান মাধ্যম। সেই গোষ্ঠীগুলো ছিল খুবই কম সদস্যের, বড়জোর হয়তো ১৫০ মানুষের। সেখানে দলবদ্ধভাবে গান গেয়ে হয়তো গোষ্ঠীকে একত্রিত রাখা সহজ ছিল। কিন্তু গোষ্ঠী যখন বড় হতে শুরু করল, দলগত সংগীত হতে থাকল ততই অকেজো। এখনকার কনসার্টগুলোর সাউন্ড সিস্টেমের মতো কোনো প্রযুক্তি তখন ছিল না। ফলে গান দিয়ে সবাইকে একত্রিত করার উপায়কেও কিছু সমস্যার ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছিল। তার চেয়ে বড় বিষয়, কিছুটা বড় দলের ক্ষেত্রে একক ‘দলপতি’ বলে কোনো ব্যাপার তখনো তৈরি হয়নি। বড় গোষ্ঠীর দলপতি থেকে জাতির পিতা, এসবই আধুনিক মানুষের নির্মাণ!

তো যা বলছিলাম, সেই গোষ্ঠীগুলো তৈরি হতো রক্তের পরম্পায় নির্মিত কয়েকটি পরিবার নিয়ে। ছোট গোষ্ঠীতে কম পরিবার আর বড় গোষ্ঠীতে বেশি। পরিবারের মুরব্বিরাই সেখানে হর্তাকর্তা। হর্তাকর্তারাই গোষ্ঠীর ছোটখাটো সমস্যা সমাধানে যথেষ্ট ছিল, কিন্তু বড় গোষ্ঠীতে হর্তাকর্তাও এত বেশি হয়ে যেত যে, নতুন ক্যাচাল সৃষ্টির জন্য তারাই যথেষ্ট ছিল। এভাবেই চলে গেছে বহুকাল, স্বার্থ নিয়ে ক্যাচাল বাঁধলে কিছু পরিবার আলাদা হয়ে নতুন কোথাও গোড়াপত্তন করেছে নতুন গোষ্ঠীর। এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যে কতকাল ধরে চলেছে, নিশ্চিত বলতে পারব না। এভাবে চলছিল, যতক্ষণটা মানুষ আবিষ্কার করল, একই সঙ্গে গোষ্ঠীর সবার উদ্দেশ্যেই কিছু বলা যায়। এ জন্য একে অপরের প্রতি মনের ভেতর দ্বন্দ্ব নিয়ে সবাইকে একসঙ্গে গান গাইতে হয় না, কোনো শারীরিক কসরতেরও প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু একটা জিনিসেরই মনোযোগ দিয়ে শোনার। এই পদ্ধতিটিতে একসঙ্গে গোষ্ঠীর সবার উদ্দেশ্যেই কিছু বলা যায়, সহজেই সংহতি এবং সম্মতি উৎপাদন করা যায়। সবচেয়ে বড় কথা, খুব কম কষ্ট করেই চাঙ্গা রাখা যায় সবার গোষ্ঠীবোধ। এমন ঘটনা প্রবাহেই তৈরি হয়েছিল পৃথিবীর প্রথম ভাষণ।

আমাদের জাতীয় জীবনেও ভাষণ গুরুত্ব অসীম। ১৯৪৮ সালে ঢাকায় জিন্নার সেই ভাষণের উদাহরণ দিয়েই শুরু করা যাক। ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে এক ভাষণে তিনি জাতির উদ্দেশে বলেছিলেন, কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র মাতৃভাষা। ২৪ মার্চ কার্জন হলে আরেক ভাষণেও তিনি একই কথা বলেছিলেন। সেই ভাষণের উদ্দেশ্য ছিল, সবাইকে একই ভাষার আওতায় নিয়ে এসে পাকিস্তানের গোষ্ঠীবোধ চাঙ্গা রাখা।

যেহেতু তিনিও জানতেন গোষ্ঠী নির্মাণের অন্যতম প্রধান শর্তই সবার ভাষা অভিন্ন হওয়া। নিজ উদ্দেশ্যে তিনি কিছুটা সফল হয়েছিলেন তা বলাই যায়। তার ভাষণ মানুষের মাঝে অবশ্যই গোষ্ঠীবোধ তৈরি করেছিল। তবে সেই গোষ্ঠীবোধ সমগ্র পাকিস্তানের ছিল না। তার ভাষণের প্রতিক্রিয়ায় গোষ্ঠীবোধ তৈরি হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষীদের ভেতর। নিজেদের ভাষার মর্যাদা টিকিয়ে রাখতে। আমরা আজ যেই বাংলাদেশে বাস করছি, সেই বাংলাদেশের জন্মের শুরুটা হয়েছিল জিন্নাহর সেই ভাষণের প্রতিক্রিয়া থেকে। যেই ভাষণ না হলে এর প্রতিবাদে মিছিল হতো না, কারফিউ হতো না, মাতৃভাষার মর্যাদার মিছিলে গুলি চালানো হতো না, লোকে শহীদ হতো না, আমাদের ক্যালেন্ডারে ১৯৫২ গুরুত্বপূর্ণ হতো না। আর ১৯৫২ না হলে হতো না ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ।

১৯৭১-এ যেহেতু চলেই এলাম, তাই ৭ মার্চে সেই রেসকোর্স ময়দানেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মহাকাব্যিক ভাষণকেও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সেই ভাষণেও মূলত ছিল ক্রান্তিকালে গোষ্ঠীবোধকে চাঙ্গা রাখার আহ্বান, যা শেষমেশ পরিণত হয় স্বাধিকারের জন্য সর্বাত্মক সংগ্রামের আহ্বানে। সেই আহ্বানে মানুষ অভূতপূর্বভাবে সাড়া দিয়েছিল। জনযুদ্ধের মাধ্যমে একটা প্রতিষ্ঠিত সেনাবাহিনীকে হারিয়ে দিয়েছিল সুচারু কৌশলে। তবে সেই বিজয়ের মূল্য নিতান্তই কম ছিল না, ৩০ লাখ তাজা প্রাণ আমাদের মাঝে থেকে ঝরে গেছে স্বাধীনতার সংগ্রামে।

তবে জিন্নাহ আর শেখ মুজিবের ভাষণের প্রতিক্রিয়ার ফলে আমরা যে বাংলাদেশ পেয়েছি, সেই বাংলাদেশে ভাষণের নেতিবাচক প্রভাবও কম নয়। বিশেষ করে ধর্মীয় এবং জাতিগত সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে এই ভাষণই প্রায় আমাদের কলঙ্ক হয়ে দাঁড়ায়। এমন প্রতিটি নিপীড়নের ক্ষেত্রেই আমরা দেখব, আক্রমণের আগে কেউ একজন আক্রমণকারীদের গোষ্ঠীবোধ চাঙ্গা করতে তাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিচ্ছে, সেটা যত ছোট কিংবা বড় পরিসরেই হোক। অ্যাডলফ হিটলার এ ক্ষেত্রে ভালো উদাহরণ হতে পারে, তার উত্তেজনাময় ভাষণের বলি হয়ে আছে ৬০ লাখ ইহুদির দেহ।

কিন্তু কেউ ভাষণ দিলেই যে তার উদ্দেশ্য সফল হয়ে যাবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, ভাষণ আসলে কখন সফল হয়? ভাষণে কে কতটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলছে, কে কতটা তথ্যবহুল কিংবা রুচিশীল কথা বলছে ভাষণের সফলতা কখনওই সেটার ওপর নির্ভর করে না। ভাষণের প্রাথমিক সফলতা বরাবরই নির্ভর করে ভাষক নিজেকে শ্রোতাদের সঙ্গে কতটা একাত্ম করে নিতে পারছে তার ওপর।

জিন্নাহ সেটা পারেননি, মুজিব পেরেছিলেন। তিনি ভাষণ শুরুই করেছিলেন ‘ভাইয়েরা আমার’ শব্দযুগল দিয়ে। শুধু এই দুই শব্দের বদলে ওখানে অন্য যে কোনো দুটো শব্দ বসিয়ে দিলেই দেখবেন এই ভাষণ একেবারে আবেদন হারিয়ে ফেলছে। কারণ তখন ভাষক আর শ্রোতাদের সঙ্গে একাত্ম থাকতেছেন না।

এখানেই নিহিত ভাষণের প্রথম সফলতার চাবিকাঠি, আপনি যাই বলেন না কেন, তা বলতে হবে নিজেকে সবার সঙ্গে একাত্ম করে। যেন সবারই মনে হয় আপনি যেন তার হয়েই কথা বলছেন। কিন্তু কেবল নিজেকে অন্য সকার সঙ্গে একাত্ম করতে পারাই যথেষ্ট নয়। ভাষণ সফল হওয়ার দ্বিতীয় শর্ত লুকিয়ে আছে আপনার কণ্ঠনালিতে। ভারী গলার অধিকারী না হলে, আপনার ভাষণ অসফল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

একটা মজার উদাহরণ দিই। ১৯৭৫ সালে মার্গারেট থ্যাচার যখন ব্রিটিশ কনজারভেটিভ পার্টির নেতা হন, তখন মার্গারেটের ভাবমূর্তি রক্ষকেরা তাকে গলার স্বর বিষয়ে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। তাকে শেখানো হয়েছিল নিজের সাধারণ কণ্ঠস্বরের চেয়ে কীভাবে প্রায় আধ অক্টেভ নিচে স্কেমে নেমে কথা বলতে হয়। অনেকেরই ধারণা, যদি এই কাজ তিনি না করতেন, তাহলে ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে জিততে পারতেন না। 

থ্যাচারের প্রশিক্ষকরা মূলত চেয়েছিলেন, তার গলার স্বর যেন অনেকটা পুরুষের মতো হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কেন? হালকা গলায় কথা বলা মানুষদের তো অন্য কাউকে নিজের সঙ্গে একাত্ম করে নিতে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না! এর উত্তর আসলে সমাজবিজ্ঞানে খুঁজে পাওয়ার চেয়ে বিবর্তনের প্রক্রিয়ায় খুঁজে পাওয়া সহজ।

প্রার্থনা, জিকির, গজল বা ভক্তিগীতির মতো উদ্দীপনামূলক সংগীতগুলোর দিকে খেয়াল করলে দেখবেন যে, সেই সংগীত সবসময় নিচু স্কেলের হয় এবং ব্যাপারটা নিছক কাকতালীয় নয়। নিচু গলায় ভারী শব্দ উচ্চারণ করা বেশ কঠিন। সাধারণত বিশালাকার মানুষের পক্ষেই ভারী শব্দ উচ্চারণ করা সম্ভব হয়, কারণ শরীরের বর্ধিত আকারের ফলে শব্দ থেকে প্রতিধ্বনি উৎপাদিত হয়।

প্রাণিকুলের ওপর করা বিভিন্ন গবেষণা থেকে বেরিয়ে এসেছে, অনেক প্রাণী ভারী গলায় ডাক দিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করে। কারণ ভারী গলার মালিক সাধারণত গায়ে গতরে বড় হয়। এই বৈশিষ্ট্য কোলাব্যাঙ থেকে শুরু করে লাল হরিণের মতো বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়। জীববিজ্ঞানীদের কাছে বিষয়টি ‘ডিপ ক্রোয়াক’ হিসেবে পরিচিত।

শত্রুদের ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দিতে এই কৌশলটি বেশ কাজে দেয়, কারণ ভারী গলা নকল করা বেশ কঠিন। শুধু বড় বড় প্রাণীরাই সফলভাবে ভারী গলায় ডাকার কৌশলটি আয়ত্ত করতে পারে এবং এ জন্য যে পরিমাণ শক্তিক্ষয় হয়, তা সামাল দিতে পারে। ভারী গলা আসলে এক বিশাল ও শক্তিশালী দেহের প্রতীক।

এমনকি মানুষের মাঝেও এই প্রবণতা দেখা যায়। খেয়াল করলেই দেখবেন, বড়সড় দেহের ভারী গলার মানুষ খুব সহজেই অপরের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। মানে, ভাষণের সময় মানুষ তাদের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার মতো ভাষক যেমন চায়, একই সঙ্গে চায় তাদের লড়াইয়ের ডাক দেওয়া লোকটা অন্তত যেন তাদের চেয়ে শক্তিশালী কেউ হয়। এতে আসন্ন লড়াইয়ে নিজ গোষ্ঠীর দুর্বল সদস্যদেরও অন্তত গড়ে কিছুটা শক্তি বাড়বে।

লেখক : কবি ও লেখক