কোনো কারণ হয়তো নেই। তবুও কেন জানি না অখণ্ড বঙ্গের বক্তৃতা দেওয়ার কথা মনে পড়লেই দুই কমিউনিস্ট নেতার কথা মনে পড়ে। দুজনকেই দেখেনি। কিন্তু কমিউনিস্ট পরিবারে জন্মেছি বলে, শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে গেছে দুজনের সম্পর্কে নানা গল্প। বঙ্কিম মুখার্জী সম্পর্কে গল্পটা প্রথম শুনেছিলাম সম্ভবত মায়ের মুখে। পরে আমার মেসো খুলনা কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রথম সারির নেতা পুলিন পিপলাই অনেকবার গল্পটা বলতেন বেশ রসিয়ে রসিয়ে। পুলিন পিপলাই বা আমার আর এক ঘনিষ্ঠজন সুধীর বা বুধু চ্যাটার্জীদের সহকর্মী ছিলেন বিখ্যাত কৃষক নেতা বিষ্টু চ্যাটার্জী। আর অনুজ কমরেড ছিলেন, পরবর্তী সময়ের বিখ্যাত বামপন্থি নেতা রতন সেন, রাজশাহী জেলের ভেতরে পুলিশের গুলিতে শহীদ আনোয়ার হোসেন ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ধনঞ্জয় দাশ প্রমুখ। বঙ্কিম মুখার্জী ছিলেন প্রথম যুগের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক, তাত্ত্বিক ও বাগ্মী। তো, মায়ের গল্পটা ছিল এরকম মৌভোগে তখন বিরাট কৃষক কনফারেন্সে বক্তৃতা দিতে কলকাতা থেকে এলেন বঙ্কিম মুখার্জী। দলে দলে কৃষকরা সারা পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জায়গা থেকে ভিড় করে এসেছেন। বঙ্কিম বাবু ওজস্বী ভাষায় টানা দুই ঘণ্টা বললেন। বক্তব্য শেষ হতে না হতে হাততালির ঝড় বয়ে গেল। বঙ্কিম মুখার্জী অত্যন্ত তৃপ্ত মুখে বসতে যাবেন, এমন সময়ে ডিগডিগে চেহারার, খালি গায়ে, লুঙ্গি পরা এক পৌঢ় কিষান চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, ‘বাবু, দারুণ বলসেন, এবার এট্টু বাংলায় কন।’ কমিউনিস্ট পার্টিতে এলিট নেতৃত্বের সঙ্গে জনগণের বিপুল অংশের চলনে, পোশাকে, ভাষায় যে পাহাড়প্রমাণ দূরত্ব, তা ওই আপাত মজার গল্পটা শুনলেই বোঝা যেত। দুর্ভাগ্যবশত এ দূরত্ব আজও রয়ে গেছে। কমিউনিস্ট পার্টি কখনই উপমহাদেশের মাটিকে চিনতে পারেনি। বোধহয় চায়ওনি।
প্রথম যুগের বাম নেতাদের অন্যতম ভুপেশ গুপ্ত, শুনেছি বক্তৃতা দিতে দিতে এমন উত্তেজিত হয়ে পড়তেন যে, অনেক সময়ে তার পরনের ধুতি ভিজে যেত। এসবই আমার শোনা কথা। আমার দেখা বক্তাদের মধ্যে অনেকেই আজ বেঁচে নেই। জ্যোতি বসু মোটেও খুব ভালো বলতে পারতেন না। খানিকটা কেজো বক্তব্য। ছোট ছোট বাক্যে অল্প কথায় বলতেন। ষাট-সত্তর দশকে শুনেছি সোমনাথ লাহিড়ী ও বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায় চমৎকার বক্তা ছিলেন। তারও আগে বক্তা হিসেবে নাম করেছিলেন বরিশালের মেয়ে মণিকুন্তলা সেন। বরিশালের অনেক খ্যাতনামা লোককে নিয়ে চর্চা হয়। অথচ মণিকুন্তলা সেন কেমন যেন বিস্মৃত হয়ে গেলেন। বরিশাল শহরে মণিকুন্তলা পরিবারের রুচিরা রেস্তোরাঁ ছিল স্বাধীনতার আগে ও পরে প্রগতিশীল ছাত্র-যুবদের আড্ডা। আন্দোলন যেমন নেতা তৈরি করে, তেমনি নতুন নতুন বক্তাও জন্ম নেয় সময়ের প্রয়োজনে। বক্তৃতা যে শিল্প তা যারা বামপন্থি তাত্ত্বিক ও প্রাক্তন সাংসদ, অধ্যাপক হীরেন মুখার্জীর বক্তৃতা শুনেছেন তারা নিশ্চিত একমত হবেন। এক ঘণ্টা, দুই ঘণ্টা একনাগাড়ে ক্লান্তিহীন হীরেন মুখার্জীর ভাষণ শোনা জীবনের এক পরম পাওয়া। তিনি বক্তৃতা দিতেন না ধ্রুপদি সাহিত্য পাঠ করতেন বলা কঠিন। হরেকৃষ্ণ কোঙ্গার দীর্ঘ সময় ধরে বলতেন। জনগণ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতেন। শুনেছি স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট নেত্রী অরুনা আসফ আলী অসম্ভব ভালো বলতেন।
উপমহাদেশের নেতাদের মধ্যে বক্তা হিসেবে নাম ছিল মিঞা ইফতেখার উদ্দিনের। তিনি ছিলেন প্রগতিশীল। নেহরু স্বয়ং চেয়েছিলেন তাকে ভারতে রেখে দিতে। কিন্তু তিনি পাকিস্তানে চলে যান। পরবর্তী সময়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপের নেতা হয়েছিলেন। ন্যাপের কথা যখন উঠল, তখন বলতেই হবে যে ন্যাপের প্রতিষ্ঠাতা মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী ছিলেন উপমহাদেশের কিংবদন্তি বক্তা। তার জ্বালাময়ী ভাষণ যারা একবার শুনেছেন, তারা কোনোদিনই ভুলতে পারেননি। ভাসানী হুজুরের কিছু কিছু কথা তো আজও প্রায় প্রবাদ হয়ে আছে। তিনি মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে আচমকা বলে উঠেছিলেন ‘কেউ খাবে আর কেউ খাবে না, তা হবে না, তা হবে না।’ আজও এ স্লোগান, এমনকি কলকাতাতেও জনপ্রিয়। কিন্তু তার স্রষ্টাকে অনেকেই মনে রাখেননি। ভাসানী বলতেন, ‘আমি দমন হইবার বান্দা নই।’ এও আজ লোকের মুখে মুখে ফেরে। যেমন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের কথা, ‘আমাদের দাবায়া রাখতে পারবা না’ এখনো শুনলে রক্ত গরম হয়ে ওঠে। শেখ সাহেব ছিলেন অসাধারণ অ্যাজিটেটর। জনগণকে জাগিয়ে তুলতে মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমানের তুলনা নেই।
নেত্রীদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে মণিকুন্তলা সেন বাদ দিলে শুনেছি সিপিআইয়ের গীতা মুখার্জী ও রেনু চক্রবর্তী ভালো বলতেন। আমার বাবা ছিলেন অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির বিশিষ্ট ট্রেড ইউনিয়ন নেতা। নিজের বাবা বলে বলছি না, বাবা, বিশেষ করে হিন্দিতে অসাধারণ বলতে পারতেন। বাবার চুটিয়ে হিন্দি ভাষণ শুনে হিন্দি ভাষীদের মধ্যে বিতর্ক উঠত। কেউ বলতেন, এ কমরেড আহির, অন্যের ধারণা ছিল তিনি যাদব। আহির ও যাদব এ সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জাত বিভাজনের লড়াইয়ের মাঝপথে বাবা বিনয়ের সঙ্গে বলতেন, আমি ভাই বাঙালি। বাবাই বলতেন যে, ভালো বক্তৃতা দিতে হলে ভালো শ্রোতা হতে হবে। কমিউনিস্ট বাবা এও শেখাতেন যে, দক্ষিণপন্থি হলেও তাদের ভাষণ মন দিয়ে শুনতে হবে। বাবার এ কথাতেই একবার বাস থেকে নেমে পড়েছিলাম ময়দানে জনসংঘের নেতা হরিপদ ভারতীর ভাষণ শুনতে। সাবেক জনসংঘ, আজকের বিজেপি। তখন তাদের এ রাজ্যে করুণ পরিস্থিতি। একটা মিছিলে জনা চল্লিশের বেশি লোক হয় না। তাদের ভেতরে আবার অধিকাংশই অবাঙালি। ময়দানের ওই মিটিংয়ে লোক ছিল নিতান্তই হাতেগোনা। তবুও হরিপদ ভারতীর বক্তৃতা আজও কানে বাজে। যেমন শব্দ চয়ন, তেমনি বাক্যের ব্যবহার। পশ্চিমবঙ্গের হালের বিজেপি নেতাদের বক্তৃতা শুনে কে বলবে এরা সবাই হরিপদ ভারতীর উত্তরসূরি।
আমাদের তরুণ বয়সে কংগ্রেসের প্রিয় রঞ্জন দাস মুন্সী ছিলেন আর এক বাগ্মী বলে আদৃত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবারের সোমেন ঠাকুর ছিলেন ট্রটস্কিপন্থি। শুনেছি তিনিও অসম্ভব ভালো বক্তা ছিলেন। তিনি সব সভায় স্ট্যালিনের নিন্দে করতেন বলে স্ট্যালিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টির লোকজন সুযোগ পেলেই সোমেন ঠাকুরের সভা ভেঙে দিত। কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এসএ ডাঙ্গেও ভালো বলতেন। তবে পরবর্তী সময়ে তার মেয়ে, রোজা দেশপান্ডের বক্তৃতা ভালো লাগেনি একদমই।
এখনকার উপমহাদেশের নেতাদের বক্তৃতা কমবেশি মাঝারি মানের। আসলে এখন রাজনীতিতে আদর্শ সততার লেশমাত্র নেই, তা নেতাদের বক্তৃতা শুনলেই বোঝা যায়। অন্য দেশের কথা বলতে পারব না। ভারতের সর্বভারতীয় নেতাদের বক্তৃতায় গালিগালাজ, কুৎসা যত থাকে তার সিকি ভাগ শিক্ষাদীক্ষার ছাপ থাকে না। আসলে অধিকাংশ সাংসদ এখন উঠে আসছে হয় টাকার জোরে অথবা দলের কৌশলে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সব দলই ইচ্ছে করে ভাঙতে চাইছে। তার অন্যতম দিক হচ্ছে নিম্নমানের, অরাজনৈতিক লোকজনকে সংসদের প্রতিনিধি করা। যাতে তারা দেশের নীতিনির্ধারণে বিন্দুমাত্র ভূমিকা না নিতে পারেন। সুস্থ বিতর্ক এখন পাবেন না। এমনকি পার্লামেন্টেও যা হয় তা স্রেফ কাদা ছোড়াছুড়ি। একেকজন নেতা যেভাবে খোলাখুলিভাবে সাম্প্রদায়িক উসকানি দেন, তা তো পুরোপুরি সংবিধান অবমাননা। এ কাজে মুখ্য ভূমিকা আবার ভারতীয় জনতা পার্টির। ফলে অবমাননা করলেও তাদের সাত খুন মাফ। মানি বা না মানি সারা দুনিয়াতেই বাম আবহের মধ্যেই সাধারণত নতুন নতুন স্লোগান বা বক্তা উঠে আসে। এখন ক্রমেই বাম রাজনীতির পরিসর দখল করছে চরম দক্ষিণপন্থা। তাদের ভাষণে দেশ কাল সমাজ নয়, জায়গা পাচ্ছে অশ্লীল, অশোভন উদ্ধত ভাষা। বিপক্ষ রাজনীতির প্রতি বিজাতীয় বিদ্বেষ। এ ছবি সারা দুনিয়াতেই। ফলে উপমহাদেশ তার থেকে আলাদা হতে পারে না।
ভারতেই স্বাধীনতার পরপরই রাষ্ট্রপুঞ্জে টানা চব্বিশ ঘণ্টা বক্তৃতা দিয়ে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, নেহরু-ঘনিষ্ঠ কৃষ্ণমাচারি বিশ্বরেকর্ড করেছিলেন। মোহিত হয়ে বিশ্বের বরেণ্য রাজনীতিকরা ধৈর্য ধরে সেই দীর্ঘ ভাষণ শুনেছিলেন। সারবত্তা ছিল বলেই। এখন এ দেশের রাজনৈতিক নেতাদের অধিকাংশই গুছিয়ে ঠিকঠাক কথাই বলতে পারেন না। ভুলভাল বলে লোকের হাসির খোরাক হন। তবে কোনো কিছুই তো স্থায়ী নয়। আশা করব রাজনীতির এই নিম্নমান নিশ্চিত চিরকাল থাকবে না। আমরা আবার পাব, কৃষ্ণমাচারি, হীরেন মুখার্জী, এসএ ডাঙ্গে, সোমেন ঠাকুর, গুরুদাস দাসগুপ্ত, মণিকুন্তলা সেন, গীতা মুখার্জী বা হরিপদ ভারতী, প্রিয়রঞ্জন দাস মুন্সীর মতো অনন্যসাধারণ বাগ্মীদের।
তবে পুরনো দিনের সব ভালো, এখন কিস্সু হচ্ছে না এরকম বুড়োটে স্বভাব পছন্দ হয় না বলেই এখনকার দু-তিনজন বক্তার কথা না বললে অন্যায় হবে। জেএনইউর প্রাক্তন ছাত্রনেতা কানাইয়াকুমারের কথা মনে পড়লেই কানাইয়ার পূর্বসূরি আরেক সাবেক জেএনইউর ছাত্রনেতা বিহারের চন্দ্র শেখরের কথা মনে পড়ে। চান্দু ছিল সিপিআইএম লিবারেশনের তুখোড় বক্তা। সিওয়ানে মাফিয়াদের হাতে ওকে খুন হতে হয়। পশ্চিমবঙ্গের দুজনের কথা না বললেই নয়। মীনাক্ষী মুখার্জী ও দেবলীনা হেমব্রম। সেরা বক্তার তালিকায় বামেদের এগিয়ে রাখলেও তৃণমূল কংগ্রেসের মহুয়া মুখার্জীর উল্লেখ করতেই হবে। রাহুল গান্ধী ইদানীং যেভাবে পরিণত মেজাজে রাজনৈতিক বক্তব্য রাখেন, তাও নিঃসন্দেহে প্রশংসার। শেষ বিচারে অবশ্য মহুয়া বা রাহুল, দুজনের বক্তৃতাই বাম ঘরানার। প্রতিষ্ঠানবিরোধী তো বটেই।
লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক