গণমাধ্যমে ভিডিও বার্তার একটা আলাদা ভ্যালু চলছে। টেলিভিশন মিডিয়ায় নিউজ হিসেবে এর কদর একটু বেশি। তা আন্তর্জাতিকভাবেও। যুদ্ধ ময়দান থেকে কোনো পক্ষের শীর্ষ পর্যায়ের কারও বা বিশ্বের কোনো প্রান্ত থেকে নির্যাতিত কারও ভিডিও বার্তা সংবাদের বিশেষ উপাদান হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে হংকং একাদশের বিপক্ষে ইন্টার মায়ামির প্রীতি ম্যাচে লিওনেল মেসির মাঠে না নামা নিয়ে নানান মন্দ কথার কচলানির লাগাম শেষ পর্যন্ত তাকেই টানতে হয়েছে। ভিডিও বার্তা দিয়ে তাকে বলতে হয়েছে, অনেক চেষ্টার পরও সেদিন চোটের কারণেই খেলতে পারেননি তিনি। এ ক্ষেত্রে ভিডিও বার্তা কাজ করেছে অব্যর্থ দাওয়াই হিসেবে।
এক সময় গণমাধ্যম বলতে ছিল ‘সংবাদপত্র’। তারপর রেডিও। সময়ের ব্যবধানে এরপর যুক্ত হলো টেলিভিশন। এখন প্রাত্যহিক ব্যবহৃত হাতের মোবাইল ফোনটিও গণযোগাযোগের উৎকৃষ্ট মাধ্যম। ইন্টারনেটের বদৌলতে কোটি কোটি মানুষের অংশগ্রহণে সোশ্যাল মিডিয়া নবজাগরণ। বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমের ধারা-ধারণা প্রতিনিয়ত বদলের পথের পথিক বাংলদেশও। এর পেছনের অন্যতম কারণ ডিজিটালাইজেশন। আর ডিজিটালের হালনাগাদ প্রতিশব্দ স্মার্ট। বাঁকবদলের এ পথে গণমাধ্যম আর সামাজিক মাধ্যম অনেকটা একাকার। প্রিন্ট-ইলেকট্রনিক-ব্রডকাস্ট-ভিজুয়াল শব্দগুলোও আপেক্ষিক হতে বসেছে। গণমাধ্যমের এ শাখাগুলো রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান থেকে শুরু করে একজন সাধারণ মানুষ পর্যন্ত মতবিনিময়ের একটি অসাধারণ সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। মানুষ নিজের মতামত জানাতে পারছে। বিপরীতে গোলমালও কম ডাকছে না।
গণমাধ্যম এখন শুধু ঘটনা-দুর্ঘটনা বা তেজারতি কাজে সীমিত নয়। মেধা বিকাশের সিঁড়ি, বিনোদনের হাতিয়ার এবং অধিকার আদায়ের মুখপাত্র হিসেবেও বহুলভাবে ব্যবহৃত। রাজনৈতিক মহলের বক্তব্য-তথ্য জানানোর মধ্যেও রকমফের এসেছে। তা প্রযুক্তির বদৌলতে। গ্লোবাল ভিলেজ বা বিশ্বগ্রামের সুফল। তার ওপর গণমাধ্যমকে নতুন মাত্রায় উন্নীত করেছে ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব ইত্যাদি। ছোট্ট একটি সেলফোন হয়ে উঠেছে অনেক কিছুর চালিকাশক্তি। আটলান্টিকের ওপারে প্রথম বেতার সংকেত পাঠান এবং পাল্টা সংকেত গ্রহণ করেন মার্কনি নামের প্রযুক্তি ব্যবসায়ী ১৯০১ সালে। এটাকে প্রথম বেতার বার্তা হিসেবে মনে করা হয়। তারও আগে ১৮৯৯ সালে বাংলার জগদীশচন্দ্র বসুর সঙ্গে মার্কনির যোগাযোগ স্থাপনের একটি তথ্য সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। এটি দিয়েছেন খোদ মার্কনির নাতি পারসেশচে মার্কনি।
টেলিভিশন খুব বেশিদিন আগের নয়। গ্রিক শব্দ টেলি অর্থ দূরত্ব। আর ল্যাটিন শব্দ ভিশন। এই দুই ভাষার শব্দ দুটি মিলে টেলিভিশন। বাংলায় দূরদর্শন যন্ত্র। ১৮৬২ সালে তারের মাধ্যমে প্রথম স্থির ছবি পাঠানো সম্ভব হয়। এরপর ১৮৭৩ সালে বিজ্ঞানী মে ও স্মিথ ইলেকট্রনিক সিগন্যালের মাধ্যমে ছবি পাঠানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জন লোগি বেয়ার্ড ১৯২৬ সালে প্রথম টেলিভিশন আবিষ্কার করেন। এরপর রুশ বংশোদ্ভূত প্রকৌশলী আইজাক শোয়েনবারগের কৃতিত্বে ১৯৩৬ সালে প্রথম টিভি সম্প্রচার শুরু। বিশ্বে প্রথম বাণিজ্যিক টেলিভিশন সম্প্রচার শুরু করে বিবিসি। বাংলাদেশে টেলিভিশনের যাত্রা শুরু ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর। ২০০৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে চালু হয় ফেসবুক ইনক। শুরুতে এর ব্যবহারকারীরা বন্ধু সংযোজন, বার্তা প্রেরণ এবং তাদের ব্যক্তিগত তথ্যাবলি আদান-প্রদান করতেন। মার্ক জাকারবার্গ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন তার রুমমেট ও কম্পিউটার সায়েন্সের ছাত্র এডুয়ার্ডো স্যাভেরিন, ডাস্টিন মস্কোভিত্স এবং ক্রিস হিউজেসের যৌথ প্রচেষ্টায় ফেসবুক নির্মাণ করেন। এরপর ২০০৫ সালে চালু হয় ইউটিউব চ্যানেল। দ্রুত সাড়া জাগায় এবং টেলিভিশনের সঙ্গে পাল্লা দিতে থাকে। নিত্যনতুন ভিডিও দেখে অল্প দিনে ইউটিউব চলে আসে দর্শকদের পছন্দের তালিকায়। ফেসবুকও চালু করে ভিডিও আপলোডসহ লাইভ টিভি প্রোগ্রাম সুবিধা।
জীবন, বিজ্ঞান ও তথ্যের এ ছুটে চলায় গণমাধ্যমের এখন দুরন্ত গতি। এ গতির সুযোগ নিচ্ছেন রাজনীতিক-ব্যবসায়ীসহ সব মহলই। এখানে কেউ এক বা একা নন। অনন্যও নন। যুক্তরাষ্ট্র উইকিলিকসকে ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। অনলাইন-অফলাইন বিরোধও আর থাকছে না। অডিও বার্তার সঙ্গে ভিডিও বার্তা এখন এক লাগসই কৌশল। গণমাধ্যমের এই অসীম ব্যাপকতা, বিশালতায় শরিক রাজনৈতিক দলগুলো। সরকারের দিক থেকে আরও বেশি। কূটনৈতিক বা আন্তর্জাতিক মহলকেও এক করে ফেলা হচ্ছে ভিডিও বার্তায়। তা সবার কাছেই সমাদৃত, বৈধও। বাংলাদেশে এর সূচনার একটা বিশেষ পর্যায়ের সূচনা করে বিরোধী দল। বিশেষ করে ২০১৪-১৫ সালের ভিন্ন মাত্রার আন্দোলনের সময় বিএনপির কয়েক নেতা লুকোচুরিতে অজ্ঞাত জায়গা থেকে ভিডিও বার্তা পাঠাতেন। দলটির দেশান্তরী নেতা লন্ডন থেকেও মাঝেমধ্যে গণমাধ্যমের ওপর ভর করতেন ভিডিও বার্তা দিয়ে। বিপরীত শক্তি থেকে একে তেরাবোরা পাহাড়ের বাণী বলে ব্যঙ্গ করা হতো। এই ব্যঙ্গ-মস্করার মধ্যেই ২০২১ সালে এসে করোনা মহামারীর মধ্যে আরেক দৃশ্যপট। ভিডিও বার্তা তখন অনেকটা মামুলি হয়ে যায়। সরকার ও সরকারি দলের যাবতীয় বার্তা এবং তথ্য ভিডিওতে দেওয়া শুরু হয়।
বাস্তবতা, সম্ভাবনা ও বহুমাত্রিকতার কারণে বিশ্বের সর্বত্র এখন ভিডিও বার্তার প্রচলন। সনাতনী মহলের কাছেও এটির বেশ গ্রহণযোগ্যতা। আর গণমাধ্যমে সংবাদের চিরাচরিত প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে এটি নান্দনিতকার বিষয়। তা মূলধারার গণমাধ্যম আর স্যোশাল মিডিয়ার পুরো ক্যানভাসটাকে পাল্টে দিয়েছে। রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, খেলোয়াড় প্রকাশ্যে সরব না হয়ে নিরিবিলি জায়গায় বসে তার বার্তা দিয়ে দিচ্ছেন ভিডিওতে। গণমাধ্যম তা অগ্রাহ্য করছে না। বরং লুফে নিচ্ছে। নৈতিকতার প্রশ্নে এখন এর সীমানা টানার প্রশ্ন এসেছে। কারণ তথ্যের সত্যতা এবং ক্রস চেকের প্রশ্নে এটি কেবল অপর্যাপ্তই নয়, একতরফা-একপেশেও। যাচ্ছেতাই ভাবে এই সুযোগটা নিচ্ছেন অনেকে। মন যা চায়, মুখ দিয়ে যা আসে তারা বলে দিচ্ছেন। এটি মোটেই কাম্য নয়। ১৯৬৪ সালে কানাডীয় সমাজ বিশেষজ্ঞ মার্শাল ম্যাকলুহান যে ‘গ্লোবাল ভিলেজ বা বিশ্বগ্রাম’ ধারণার কথা বলেছিলেন, এটি মোটেই তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং অপব্যবহার।
অনলাইন আর অফলাইন সব মাধ্যমেরই এখন অসীম ব্যাপকতা। প্রচারের ক্ষেত্রে বিশাল শক্তি। এই শক্তির অপব্যবহার আজ কারও কারও জন্য সুযোগ ও সম্ভাবনার। ঠিক বিপরীতে অন্যের জন্য সর্বনাশের। ভিডিও বা অডিও কোনো বার্তাকেই আনকাট চালানো বা চলতে দেওয়া অপ্রত্যাশিত। তাই এই ভাষা-মাত্রা নির্ধারণ জরুরি। মনে রাখতে হবে এটি প্রেস রিলিজের আপডেট। সব প্রেস রিলিজ কি পুরোটা বা আনকাট ছাড়া হয়? অথবা আদৌ ছাড়া হয়। এছাড়া প্রেস রিলিজের রচনা এবং কাঠামোর বিষয় আছে। তা ঠিক করা দরকার ভিডিও বার্তায়ও। সাংবাদিকরা অবশ্যই তথ্যের মহাসমুদ্রে বাস করছেন। সরকার, বিরোধী দল, বিশেষ কোনো ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান যেন তাদের যথেচ্ছা ব্যবহার করতে না পারে তা পেশাগত-ব্যক্তিগত দুই স্বার্থেই রোধ করা দরকার। যেকোনো সংবাদ প্রতিবেদনের আগে ফ্যাক্ট চেকিং অবশ্যই দরকার। কিন্তু, ভিডিও বার্তায় তা করা একটু কঠিন। একতরফা বার্তায় বক্তার দেওয়া বিভ্রান্তি, মিথ্যা বা গুজব তাৎক্ষণিক বোঝা সম্ভব হয়ে ওঠে না।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট