পৃথিবীর নানা প্রান্তে মানুষের স্বাধিকার, সার্বভৌমত্বসহ নানা দাবিতে মানুষ সোচ্চার হয়েছে। উপনিবেশবাদ, বর্ণবাদ এবং যুদ্ধবিগ্রহ আর সংঘাতের বিরুদ্ধে অধিকারবোধের চেতনা দেখা গেছে প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যে। বিপ্লব ও আন্দোলনধর্মী এসব গণজোয়ারে কিছু ভাষণ-বক্তব্য মানুষকে আন্দোলিত করেছে, যার অমর হয়ে রয়েছে ইতিহাসে। আমেরিকায় আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ ভাষণ কিংবা উপমহাদেশের গান্ধীর ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বক্তৃতা মানুষ আলোড়িত হয়েছে সেসব কথায়। বিশ্বের আলোড়ন সৃষ্টিকারী এমন পাঁচ ভাষণের চুম্বকাংশ এখানে তুলে ধরা হলো। গ্রন্থনা : মুজাহিদ অনীক
আব্রাহাম লিংকন : গেটিসবার্গ অ্যাড্রেস
‘তাদের (পূর্বপুরুষ) আত্মত্যাগকে বিফলে যেতে দেব না। তাদের অসমাপ্ত কাজ শেষ করে তাদের আত্মত্যাগকে আরও মহিমান্বিত করে তুলব তখন ঈশ্বরের কৃপায় স্বাধীন দেশের জন্ম হবে যেখানে জনগণের, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য সরকার তৈরি হবে। সেই দেশকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব হবে না।’ এটি অষ্টাদশ শতকের আমেরিকান রাষ্ট্রনায়ক আব্রাহাম লিংকনের বিশ্বখ্যাত ভাষণের প্রসিদ্ধতম অংশ। রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের ক্ষত তখনো শুকায়নি, ঠিক এমন এক মুহূর্তে লিংকন ভাষণটি দেন। পেনসিলভানিয়ার সেই গেটিসবার্গ যেখানে আমেরিকান গৃহযুদ্ধের চূড়ান্ত লড়াই হয়, সেখানেই ১৮৬৩ সালের ১৯ নভেম্বর তিনি এ ভাষণ দিয়েছিলেন। গেটিসবার্গ লড়াই শেষ হওয়ার চার বছরেরও বেশি সময় পর লিংকন এ ভাষণ দেন। এটি ইতিহাসের সেই বিখ্যাত ‘গেটিসবার্গ অ্যাড্রেস’।
ফিদেল ক্যাস্ত্রো : ‘ইতিহাস
আমাকে দায়মুক্তি দেবে’
১৯৫৯ সালের সফল কিউবা বিপ্লবের আগে ১৯৫৩ সালের ২৬ জুলাই মনকাডা দুর্গে এক ব্যর্থ আক্রমণ চালায় বিপ্লবীরা। সেই সূত্রে ফিদেল ক্যাস্ত্রোসহ শতাধিক বিপ্লবীকে বিচারের মুখোমুখি করে স্বৈরশাসক বাতিস্তা। ১৯৫৩ সালের ১৬ অক্টোবর আদালতে অভিযোগের পাল্টা যুক্তি খ-ন করতে প্রায় চার ঘণ্টাব্যাপী বক্তব্য তুলে ধরেন ফিদেল। তিনি বক্তব্য শেষ করেন এই বলে, ‘আমি কারাগারকে ভয় পাই না। আমি এই অত্যাচারী শাসকের রক্তচক্ষুকেও ভয় করি না, যিনি আমার ৭০ জন কমরেডকে হত্যা করেছে। আপনারা নিন্দা করুন। ইতিহাস আমাকে দায়মুক্তি দেবে।’ মনকাডা দুর্গ আক্রমণ স্মরণে ফিদেলের বিপ্লবী সংগঠনের নাম হয় ‘দ্য টোয়েন্টিসিক্সথ জুলাই মুভমেন্ট’ যেটির ইশতেহার হয়ে যায় ঐতিহাসিক এই বক্তৃতা।
মহাত্মা গান্ধী : ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’ আহ্বানের ভাষণ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি সময় অর্থাৎ ১৯৪২ সালের ৮ আগস্ট মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী (মহাত্মা গান্ধী) মুম্বাইয়ের (তৎকালীন বোম্বে) গোয়ালিয়া ট্যাংক ময়দানে (বর্তমানে আগস্ট ক্রান্তিকারী ময়দান) ব্রিটিশদের ভারত ছেড়ে চলে যাওয়ার ডাক দিয়ে ঐতিহাসিক ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’ শুরু করেন। ভারতের স্বাধীনতার জন্য মরণপণ লড়াইয়ের ডাক দেন মহাত্মা। ভারতবাসীকে আলোড়িত করা সেই ভাষণের চুম্বকাংশে তিনি বলেন, ‘একটি মন্ত্র শুনুন, সংক্ষেপে বলি, আপনাদের জন্য বলছি। আপনাদের হৃদয়ে গেঁথে নিতে পারেন, প্রতিটি নিঃশ্বাসের সঙ্গে একে অনুভব করুন। মন্ত্রটি হলো হয় কিছু করব, নয়তো মরব। আমরা হয় ভারতকে মুক্ত করব না হয় মরব; আমরা আমাদের দাসত্বের স্থায়িত্ব দেখতে দেখতে বাঁচব না।’ এই অহিংস আন্দোলনের ডাক দেওয়ার পরই মহাত্মা গান্ধীসহ কংগ্রেসের প্রথম সারির নেতাদের কারাগারে পাঠায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসক।
মার্টিন লুথার কিং : ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’
২০০৯ সালে যখন বারাক ওবামা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হন, সেই মুহূর্তে বিশ^বাসী মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’ শীর্ষক ভাষণের কথা সবচেয়ে বেশি স্মরণ করেছে। ওয়াশিংটন ডিসির লিংকন মেমোরিয়ালে দাঁড়িয়ে যেদিন লুথার কিং বক্তৃতা দিচ্ছিলেন, সেদিন একজন
কৃষ্ণাঙ্গের পক্ষে আমেরিকার শাসক হওয়ার স্বপ্ন কল্পনারও অতীত ছিল। তিনি ভাষণে কালোদের নাগরিক অধিকারের কথাগুলো বলতে গিয়ে অনেকবার ‘স্বপ্ন দেখার’ কথা বলেন। ১৯৬৩ সালের ২৮ আগস্ট সেই ভাষণে সবচেয়ে আলোচিত অংশটুকু বোধহয় এটিই ‘আমি স্বপ্ন দেখি, আমার চারটি ছোট্ট সন্তান একদিন এ দেশে বাস করবে যেখানে তাদের কাউকে তাদের চরিত্রের উপাদান ব্যতিরেকে তাদের গায়ের রঙ দিয়ে বিচার করা হবে না। আমি আজ স্বপ্ন দেখি।’
নেলসন ম্যান্ডেলা : ‘আমি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত’
দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ শাসনব্যবস্থার আদালতে নেলসন ম্যান্ডেলাসহ আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের (এএনসি) অনেকের বিরুদ্ধে রাজধানী জোহান্সবার্গের রিভোনিয়া বন্দিশিবিরে বিচার চলছিল। ‘দ্য রিভোনিয়া ট্রায়াল’-খ্যাত এই বিচার চলাকালে ১৯৬৪ সালের ২০ এপ্রিল বিচারকের সামনে দাঁড়িয়ে তিন ঘণ্টাব্যাপী ভাষণের শেষাংশে ম্যান্ডেলা বলেন, ‘আমার জীবদ্দশায় আমি আফ্রিকার মানুষের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছি। আমি শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছি, আমি কালোদের আধিপত্যেরও বিরুদ্ধে। আমি গণতান্ত্রিক ও মুক্ত সমাজের অনুরাগী যেখানে সবাই একসঙ্গে সম্প্রীতিতে সমান অধিকার নিয়ে বাস করবে। এটি এমন এক আদর্শ, যা আমি অর্জন করার স্বপ্ন দেখি। তবে যদি প্রয়োজন হয়, এই আদর্শের কারণে আমি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত।’