করণকৌশল

ভাষ্যের কারিগরি

বক্তৃতার নানা ‘রকম’ ও ‘ধরন’ আছে। যেমন ক্লাসরুমের বক্তৃতা, সুধী সমাবেশের বক্তৃতা, জনসভার বক্তৃতা। এ ছাড়াও আছে টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে এক ধরনের বক্তৃতা, সেটা আগে ধারণ করাও হতে পারে, আবার লাইভ কিংবা সরাসরিও হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আসার পর ‘লাইভ’ বক্তৃতা আলাদা মাত্রা পেয়েছে। প্রথাগত বক্তৃতা হয় সরাসরি, দর্শক-শ্রোতার মুখোমুখি, এর আবেদন শেষ হবে না। তবে সরাসরি হোক, রেকর্ডেড হোক কিংবা লাইভ সব ক্ষেত্রেই দর্শক-শ্রোতার যোগাযোগ স্থাপিত হওয়ার ব্যাপার থাকে। বক্তৃতা আদতেই একটা পরিবেশন শিল্প। অনেকে উপেক্ষা করে গেলও বিষয়টি আসলে শিল্পের পর্যায়েই পড়ে। ভালো বক্তৃতা, অনেক মানুষের উদ্দেশ্যে ভালোভাবে বলা কথা মানুষের কাছে খুবই সাদরে গৃহীত হয়। যার স্বরের ওঠানামা ভালো, যার কণ্ঠের আওয়াজটা ভালো, যার উচ্চারণটা ভালো, তিনি বিষয়বস্তু সম্পর্কে খুব ভালো করে পড়াশোনা করেছেন, তারপর তিনি যখন বক্তৃতা দেন তার গ্রহণযোগ্যতাও ভালো হয়। বিষয়বস্তু ভালো করে না বুঝলে ভাষণ কেউ দেবেন কীভাবে!

সব মিলিয়ে বিভিন্ন রকম ধরন ও মিডিয়ার বক্তৃতায় আলাদা আলাদা প্যাটার্ন বা আদল এবং শৈলী থাকে। শৈলীর প্রশ্ন মোকাবিলা করে বক্তৃতাও শিল্পের কাতারে চলে আসে। বলা যায়, ইটস অ্যা কাইন্ড অব পারফরমেন্স। আমি মনে করি, যার পারফরম্যান্স যত ভালো হবে, তিনি লোকজনের কাছে বক্তা হিসেবে তত বেশি আকর্ষণীয় হবেন। আগেই বলেছি যে কণ্ঠস্বরের মাধুর্য থেকে শুরু করে, কণ্ঠস্বরের ওঠানামা, উচ্চারণ বক্তৃতায় একটা বড় ভূমিকা রাখে। শুদ্ধ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে, প্রমিত উচ্চারণের মধ্য দিয়ে বক্তার একটা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়, যাকে আমরা ক্রেডিবিলিটি বলি। এই গ্রহণযোগ্যতার মধ্যে দিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কোনো শিক্ষক ক্লাসে খুব জনপ্রিয় হয়ে যান। সব শিক্ষক কিন্তু জনপ্রিয় হন না, কেউ কেউ হন। অর্থাৎ তিনি বড় চমৎকার করে ক্লাস সেশনটা পরিচালনা করেন, বিষয়ের ওপরে তার ভীষণ অধিকার থাকে, তিনি বিভিন্ন রেফারেন্স দিতে পারেন। এসবের জন্য তাকে অবশ্যই উচ্চারণ ছাড়াও বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান রাখতে হয়, পড়তে হয়, নোট নিতে হয়, পেপার ওয়ার্ক করতে হয়। তিনি জিনিসটাকে সিরিয়াসলি নিয়ে হোমওয়ার্ক করেন। অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতাদের বক্তৃতার ধরন একটু আলাদা হলেও সেখানেও শৈলীর, টেকনিকের ব্যাপারগুলো থাকে।

মঞ্চে উঠে শুধু কিছু বলে দিলেই বক্তৃতা হয়ে গেল তা না, এর কায়দা-কানুনটাও রপ্ত করতে হয়। বক্তৃতায় অভিনয়, আবৃত্তি, ধারাভাষ্য, পাঠের যে আর্ট বা শৈলী তা যুক্ত থাকে।

উচ্চারণ নিয়ে বক্তৃতায় বিভিন্ন মত দেখতে পাই। যেমন আমাদের ৭ মার্চের ভাষণ বঙ্গবন্ধু প্রমিত ভাষায় দেননি। কিন্তু তার প্রভাব অনেক দূর। বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি আলাদা একটা আর্ট ফর্ম হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে এবং এটার গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে জাতিসংঘ এই ভাষণটিকে স্বীকৃতিও দিয়েছে। তিনি সারাজীবন যে রাজনীতি করে এসেছেন তার একটা রিফ্লেকশন তার ভাষণের মধ্যে চলে এসেছে। কিন্তু তার ভাষণে আঞ্চলিক শব্দ ও টোনের ব্যবহার তিনি করেছেন অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে। এটি তার বক্তব্যে ক্ল্যারিটি নিয়ে এসেছে। এসব আঞ্চলিক দু-তিনটি যে শব্দ তিনি ব্যবহার করেছেন তার শুদ্ধ রূপ থাকলেও তিনি যা করেছেন, তার প্রায়োগিক রূপটা আনক্লিয়ার না। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ একদম ক্ল্যাসিকাল। ধ্রুপদি ভাষণ যাকে বলে। তিনি শিল্পী হিসেবে উৎরে গেছেন বলাটাও ধৃষ্টতা হয়ে যায়। 

কিন্তু সবার ক্ষেত্রে, মানে আমাদের সব রাজনীতিকদের বেলায় এমনটা নয়। সংসদে বসে আমাদের সংসদ সদস্যরা যে বক্তৃতা দেন, যে ভাষায় দেন তার গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু সেটা আমরা বাছবিচার করতে পারছি না। সংসদ সদস্য অধিকাংশ হয়তো ভালো কিন্তু কেউ কেউ আবার একদম পুরো আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেন। এমনকি বাংলা একাডেমির মঞ্চেও অনেকে পেপার পড়েন অপ্রমিত ভাষায়। আমি দেখেছি বাংলা বিভাগের অধ্যাপক যেভাবে উচ্চারণ করেন সেখানেও ভুল উচ্চারণ থাকে। বিষয়টা কিন্তু আমাদের কমিউনিকেশনের। পাবলিক কমিউনিকেশন বলে একটা সাবজেক্ট আছে। এর মধ্যে ক্লাসরুম থেকে শুরু করে জনসভাও পড়ে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, যে জায়গা থেকে যিনি উঠে এসেছেন তার সেখানকার ডায়ালেক্টে তিনি কথা বলেন, বক্তৃতা করেন। পাবলিক কমিউনিকেশনের বেলাতেও তিনি শুদ্ধ উচ্চারণ, প্রমিত বাংলায় যেতে পারছেন না বা এ নিয়ে সচেতন না। আবার এটাও সত্য যে, প্রমিত ভাষা কিন্তু আমাদের মাতৃভাষা না। প্রমিত হচ্ছে একটা তৈরি ভাষা, ইট ইজ মেইড অর্থাৎ এটা সবার জন্য তৈরি একটি সাধারণ ভাষা। এটা সবার বোধগম্য। জনপরিসরে, গণমাধ্যমে সবার উদ্দেশ্যে যখন আমরা কথা বলি তখনকার জন্য এই ভাষাটা তৈরি। ভাষণ দিতে হলে প্রমিত ভাষাটা ব্যবহার করলে সব অঞ্চলের মানুষের কাছে সেটা গ্রহণযোগ্যতা পাবে, ভালো লাগবে শুনতে। মূল ভাষাটা তো বাংলা ভাষা সেই বাংলাটা একেকটা জেলায় গিয়ে একেকটা রূপ, একেক রকম একসেন্ট, একেক রকম ডায়ালেক্ট নেয়। কিন্তু সেই বিভিন্নতাকে একটি সাধারণ বোধগম্যতায় নিয়ে আসার জন্যই প্রমিত ভাষা। আমি মনে করি, সাধারণভাবে যারা বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, দাপ্তরিক কাজে সাধারণের উদ্দেশ্যে কথা বলেন, বক্তৃতা দেন তারা যদি প্রমিত ভাষাটাকে শানিত করেন তাহলে সেসব কথার গুরুত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।

পলিটিক্যাল বক্তব্যে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার অথেনটিসিটি বাড়ায় কি না, এটা নিয়ে বিতর্ক আছে। দেখা যায় আঞ্চলিক ভাষায় এমন শব্দ রয়েছে, যার অর্থ অন্য এলাকার মানুষের কাছে বোধগম্য নয় বা অস্পষ্ট। এখানে প্রশ্নটা কমিউনিকেশনের, যোগাযোগের। কেউ চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে গেলে আমি হয়তো বেশিরভাগ শব্দের মানেই বুঝতে পারব না। সিলেটি ভাষায় বললেও বুঝব না, নোয়াখালীর হলেও বুঝব না। রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে কর্মকর্তাদের অনেকে শুদ্ধ ভাষায় বলতে গেলেও দেখা যায়, তাদের অ্যাকসেন্টে আঞ্চলিকতাগুলো মিশে যায়। সংসদে এমন আমরা দেখেছি, যা পরে হাস্যরসের খোরাক হয়। কিন্তু সেই নেতা বা কর্মকর্তা যখন ইংরেজি বলছেন, তখন ঠিকভাবে বলছেন। বাংলা বলতে গেলেই আঞ্চলিকতা এড়াতে পারছেন না, অর্থ স্পষ্ট হচ্ছে না, উল্টো হাস্যরস হচ্ছে। দেখা গেল তিনি সিরিয়াস বিষয়ে সিরিয়াস কথাই বলেছেন, কিন্তু আঞ্চলিকতা মিশে গিয়ে তার বক্তব্য কেবলই কৌতুকপূর্ণ শোনাচ্ছে। কাজেই মাতৃভাষা হলেও বাংলাও আমাদের শেখার আছে।

উচ্চারণ ছাড়াও আগের দিনে রাজনৈতিক নেতাদের ভাষণের যে মান ছিল সেখানেও বর্তমানে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।  আমি আমার বয়সকাল থেকে অনেক রাজনৈতিক নেতার ভাষণ শুনে এসেছি। রাজনৈতিক নেতাদের দূরদৃষ্টি, প্রজ্ঞা তাদের ভাষণের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করত। তারা বিশ্বাস থেকে শব্দ উচ্চারণ করতেন, তাই জনগণ সে কথায় আস্থা পেত। মওলানা ভাসানীর বক্তব্য আমি শুনেছি। তার কথা বলার আলাদা ভাষা ছিল। কিন্তু তিনি যেভাবে মানুষের কাছে তার কথাগুলো বলতেন তাতে মানুষ ভীষণ ইমপ্রেসড হতো, ইনফ্লুয়েন্সড হতো, মোটিভেটেড হতো। এ রকম বেশকিছু নেতা ছিলেন যাদের কেউ বামপন্থি, কেউ জাতীয়তাবাদী যাদের বক্তৃতা আমাদের অনুপ্রাণিত করত।

এমনকি মুসলিম লীগের এক নেতা যাকে আমাদের ইতিহাসে অন্যভাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তিনি খুলনা অঞ্চলের লোক আব্দুস সবুর খান। তার ভাষণ ছিল ধ্রুপদি। তার বক্তৃতা যারা শোনেননি, তারা ঠিক বুঝবেন না। মঞ্চে তার বলে যাওয়ার ভেতর তার জ্ঞান, পড়াশোনা, রুচি প্রকাশ পেত। তার পড়াশোনার পরিধি ছিল অসম্ভব বড়, তার বিশাল লাইব্রেরি ছিল বাড়িতে। যদিও ভূমিকা বিতর্কিত। কিন্তু তিনি আবার ক্ল্যাসিকাল মিউজিক পছন্দ করতেন। মুসলিম লীগের পাবলিক মিটিংয়ে তার যে ভাষণ শুনেছি! কিন্তু আবার এ কথাও ভুলে গেলে হবে না যে, বঙ্গবন্ধু হচ্ছেন অন্য জিনিস। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, বিশ্বাস এবং আন্দোলনের একটা রূপরেখাকে তার বক্তৃতার মধ্য দিয়েই তিনি যেভাবে বিশ্বাসের সঙ্গে বলতেন ওই বলাটার একটা গ্রহণযোগ্যতা বা ক্রেডিবিলিটি অন্যরকম। সেখানে ভাষাটা খুব ম্যাটার করত, তা না। আগের নেতাদের ভাষণের তুলনায় এখনকার নেতাদের ভাষণে আসলেই অবনমন হয়েছে। আগের নেতারা যে বিশ্বাসের সঙ্গে  শব্দ উচ্চারণ করতেন, বলতেন তাদের প্রজ্ঞা, রেফারেন্স, তাদের পড়াশোনা ছিল সেটা আমরা এখন খুঁজে পাই না।

লেখক : একুশে পদকজয়ী বাচিকশিল্পী