দেশে ডিজিটাইজেশনের ছাপ পড়ছে সব ক্ষেত্রে। অমর একুশে বইমেলাও তার ব্যতিক্রম নয়। পাঠকরা যেমন এখন শুধু কাগুজে বইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, তেমনি প্রকাশনা জগতেও আসছে নতুনত্ব। মেলায় রয়েছে অডিও বুক ও ই-বুকের স্টলও। সেগুলো নিয়ে মানুষের আগ্রহও চোখে পড়ার মতো। বহনের ঝক্কি না থাকায় ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে বইমেলার নতুন এই সংস্করণ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাগজের বইয়ের পাশাপাশি অডিও বুকও সাড়া ফেলছে বইপ্রেমীদের মধ্যে।
বইমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এবং বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে দেখা গেছে বেশ কয়েকটি অডিও বুক এবং ই-বুকের স্টল। এর মধ্যে রয়েছে কাব্যিক, কাহিনীক, শুনবই, বইঘর, বইচিত্র নামে পাঁচটি অডিও বুকস্টল। এ ছাড়া রয়েছে রকমারি ই-বুকের স্টল। মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করে সহজেই শোনা যায় বিভিন্ন বইয়ের পাঠ। দেড়শ থেকে আড়াই হাজার পর্যন্ত বইয়ের সংগ্রহ আছে এসব অ্যাপে। স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের দুনিয়ায় পরিবর্তিত উপায়ে মানুষের কাছে ভিন্নভাবে বই পৌঁছে দিচ্ছে এসব ডিজিটাল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। তারা মূলত দ্বিতীয় প্রকাশকের ভূমিকা পালন করেন।
অডিও বুক প্ল্যাটফর্ম ‘কাব্যিক অডিও বুক’ এ এখন পর্যন্ত এক হাজারের বেশি বই যুক্ত হয়েছে। হরর, থ্রিলার, রোমান্স, অ্যাডভেঞ্চার, মোটিভেশন, ক্লাসিক, রিলিজিয়াস, বায়োগ্রাফি, গল্প, কবিতা, বিশেষ, শিশুতোষ কনটেন্টসহ রয়েছে কাব্যিকের নিজস্ব অনেক কনটেন্ট। কাব্যিক অডিও বুক অ্যাপস ম্যানেজার লরেন্স উজ্জল বলেন, বই শুনতে হলে প্লে-স্টোর থেকে কাহিনীক অ্যাপসটা ডাউনলোড করতে হবে। পরে সেই অ্যাপস রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। এরপর নামমাত্র মূল্যে সাবস্ক্রিপশন করে উপভোগ করা যাবে অডিও বুক। কাহিনীকের পরিচালক ইমরাদ জুলকারনাইন বলেন, ‘লেখক এবং প্রকাশক যিনি মূল বইটা প্রকাশ করছেন, আমরা হচ্ছি দ্বিতীয় ধাপের প্রকাশক অডিও প্রকাশক। সবাইকে সমন্বিত করে আমরা নতুন একটি ধারা তৈরি করেছি। বইমেলাকে নতুন ডাইমেনশন দিয়েছে এটি।’
বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের তথ্যকেন্দ্রের সামনে গিয়ে দেখা মেলে ‘শুনবই’ স্টলের, বই নেই কিন্তু স্টল আছে তবুও দেখা যায় দর্শনার্থীরা আসছেন। আর প্রতিনিধি ও মার্কেটিংয়ের দায়িত্বে থাকা লোকরা শুনবই সম্পর্কে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন। অনেকই সাবস্ক্রিপশন করছেন, আগ্রহী হচ্ছেন। শুনবই স্টলের মার্কেটিং অ্যান্ড প্রমোটিংয়ের দায়িত্বে আছেন জান্নাতুল ফেরদৌস ও তানজিনা আক্তার শিমু। তারা বলেন, ‘শুনবই’ অ্যাপস ডাউনলোড করলেই সেখানে ১ হাজার বই রয়েছে, ১০ টাকায় যে কেউ সাবস্ক্রিপশন কিনে এক মাসের জন্য শুনতে পারবে, যা অন্য সময়ে ১০০ টাকা।
১১৯ টাকায় ১ মাসের জন্য সাবস্ক্রিপশন নিয়ে বই শুনতে পারবে বইঘর অ্যাপসেও। বইঘরে ২৫০০ ই-বুক, ২৫০ অডিও বুক রয়েছে। ই-বুক সেখানে কেনার অপশন রয়েছে বলে জানান বইঘরের প্রতিনিধি জান্নাত। তিনি বলেন, ‘আমাদের এই অ্যাপসে ৫০ প্লাস বই ফ্রিতে শোনা যাবে। এ ছাড়া এই অ্যাপসে যে বই এখনো ছাপানো হয়নি, সেটাও পাওয়া যায়।’
ডিজিটাল বুক আর্কাইভ বইচিত্রের প্রতিনিধি মিসরাত জানান, তাদের অ্যাপসে ইতিহাস, রাজনীতি, সায়েন্স ফিকশন, ম্যাগাজিন, শিশু-কিশোর গল্প, মুক্তিযুদ্ধ, উপন্যাস, ভ্রমণসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ১০০টির বেশি ই-বুক এবং অডিও বুক রয়েছে। বইঘরের পাশে রয়েছে রকমারি ই-বুক, যেখানে প্রায় সব ধরনের বইয়ের পিডিএফ পাওয়া যায়। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে এ রকম বই শুনতে পারার স্টল রয়েছে ‘কাব্যিক’।
নতুন এই সংযোজন পাঠকের কাছে ভালোই সাড়া ফেলছে। অনেকে নতুন এই অভিজ্ঞতা নিয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত। শুনবই থেকে অ্যাপস ডাউনলোড করে রেজিস্ট্রেশন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইমদাদুল আজাদ। তিনি অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে মেলা এসে শুনলাম, দেখলাম কেমন লাগে প্রাথমিকভাবে ট্রায়াল দিয়ে দেখলাম বিষয়টি ভালো। তাই রেজিস্ট্রেশন এবং সাবস্ক্রিপশন করে নিয়েছি। লম্বা জার্নিতে আপনার প্রিয় বইটা শুনতে শুনতে যাচ্ছেন। এটি একটি অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা বলে আমার মনে হয়।’
গতকাল শনিবার ছিল অমর একুশে বইমেলার ২৪তম দিন। মেলা শুরু হয় বেলা ১১টায় এবং চলে রাত ৯টা পর্যন্ত। বইমেলার শেষ ছুটির দিন হওয়ায় এদিন উপচে পড়া ভিড় ছিল পাঠক-দর্শনার্থীদের। বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত ছিল শিশুপ্রহর। শিশুদের কলকাকলীতে মুখরিত ছিল মেলা প্রাঙ্গণ। গতকাল নতুন বই এসেছে ১৩৮টি। বিকেল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণ : মোহাম্মদ রফিক এবং স্মরণ : খালেক বিন জয়েনউদদীন শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যথাক্রমে আলতাফ শাহনেওয়াজ এবং সুজন বড়ুয়া। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন শামীম রেজা, শোয়াইব জিবরান এবং আসলাম সানী। সভাপতিত্ব করেন আবুল মোমেন।
আজকের কর্মসূচি : আজ রবিবার অমর একুশে বইমেলার ২৫তম দিন। মেলা শুরু হবে বিকেল ৩টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে স্মরণ স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন কাজী নূরুল করিম দিলু। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন তানভীর নেওয়াজ এবং মাহমুদুল আনোয়ার রিয়াদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন জেবুন নাসরীন আহমেদ