দালালের খপ্পরে তরুণরা, ভূমধ্যসাগরে অন্তিম যাত্রা

‘স্বামী আর দুই মেয়ে নিয়ে আমাদের সুখের সংসার ছিলো। অভাব থাকলেও একসঙ্গে বসে খেতে পারতাম। দিনশেষে নানা সংকটেও ভালো দিন কাটতো। কিন্ত দালাল অবুঝ মাতুব্বরের খপ্পরে পড়ে আমি স্বামী হারালাম। বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে অবুঝ মাতুব্বর আমার স্বামীকে ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন দেখায়।’ 

কান্নাজড়িত কন্ঠে দেশ রূপান্তরকে এমনটি জানিয়েছেন সম্প্রতি ভূমধ্যসাগরে নৌকা ডুবিতে নিহত কায়সারের স্ত্রী নাজমা বেগম। তাদের বাড়ি মাদারীপুরের রাজৈরের পাইকপাড়া ইউনিয়নের দামেড়চর গ্রামে।

তিনি আরও বলেন, অবুঝ মাতুব্বর আমার স্বামীর কাছ থেকে প্রথমে সাড়ে ৮ লাখ টাকা নিয়েছে। এ টাকা দিয়ে প্রথমে লিবিয়া নেয়। তারপর বড় ইঞ্জিত চালিত নৌকায় নেওয়ার কথা বলে আরও সাড়ে ৪ লাখ হাতিয়ে নেয়। অন্যের কাছ থেকে ঋণ করে আমি তাকে টাকা দিয়েছি। তবুও বড় নৌকায় নেওয়ার কথা থাকলেও ছোট নৌকায় তাকে পাঠানো হয়। এতে নৌকাডুবিতে আমার স্বামী মারা গেছে। আমার দুই মেয়ে নিয়ে এখন কীভাবে বাঁচবো? ওই দালালের বিচার চাই আমি।’

নাজমা আক্তারের মতো মাদারীপুরের কয়েকটি পরিবার এখন প্রিয়জনকে হারিয়ে পাগলপ্রায়। তাদের অভিযোগ, দালালদের উচ্চবিলাসী প্রলোভনের কারণে আমরা প্রিয়জনকে হারাচ্ছি। কাছের মানুষদের সাগরে ডুবে মৃত্যু আমরা মেনে নিতে পারছি না। তাই সরকারের কাছে দাবি, এ ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’  গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ইতালির পথে ভূমধ্যসাগরে প্রাণ গেছে আট বাংলাদেশির। যাদের পাঁচ জনের বাড়ি মাদারীপুর।

অভিবাসন খাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত জীবনের আশায় দালালদের খপ্পরে পড়ে ভূমধ্যসাগরে ডুবে মরছে বাংলাদেশি তরুণরা। দেশে বেকারত্ব, বৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার সুযোগ কম থাকায় তারা বিকল্প পথ খুঁজে নিচ্ছেন। আর সেই সুযোগ কাজে লাগায় দালালরা। ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে তারা লাপাত্তা হয়ে যায়। এদিকে সাগরে ডুবে মরতে হচ্ছে তরুণদের। সরকারের উচিক কঠোর হস্তে দালালদের প্রতিহত করা, নয়তো এ সংখ্যা বাড়তে থাকবে।’  

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১০ বছরে মাদারীপুরে ৩২৯টি মানবপাচার মামলা হয়েছে। তবে এসব মামলার একটিরও বিচার হয়নি। ফলে দালালরা দ্বিতীয়বার এমন কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে। এছাড়াও গত ১০ বছরে দালালের খপ্পরে পড়ে মাদারীপুরের প্রায় ১০০ যুবকের মৃত্যু হয়েছে। এদিকে ইতালি যাওয়ার আগে লিবিয়ায় নির্মম নির্যাতনের স্বীকার হয়ে বাড়ি ফেরা মানুষের সংখ্যাও কম নয়। 

এদিকে ২০১৩-২০২৩ এই ১০ বছরে মাদারীপুরের বিভিন্ন থানায় মামলার সংখ্যা ২৯২টি ও আদালতে ৩৭টি মামলা করেন ভুক্তভোগীর পরিবরার। মামলায় মোট আসামি ১ হাজার ৪৬৬ জন হলেও গ্রেপ্তার হয়েছে মাত্র ২৮৭ জন। আর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয় ৯৬টি মামলার। তার মধ্যে আদালতে চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা পড়ে ৮৭টি মামলার। এছাড়াও এখন পর্যন্ত ১১১টি মামলা মীমাংসা হওয়ায় বাদী মামলা প্রত্যাহার করেছেন। গত ১০ বছরে অবৈধপথে ইতালী পাড়ি জমিয়েছে ৫ হাজার ৫০০ জন।

মামলার এজাহার, ভুক্তভোগীদের স্বজন ও জেলা পুলিশের তথ্যমতে মাদারীপুরসহ বিভিন্ন জেলায় সক্রিয় দালালদের নাম পাওয়া গেছে। তারা হলেন- গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের সুন্দরদী গ্রামের মোশারফ কাজী, একই উপজেলার গজারিয়া গ্রামের রহিম শেখ, মাদারীপুর সদর উপজেলার কুমড়াখালী গ্রামের এমদাদ বেপারী, একই উপজেলার বড়াইলবাড়ীর জামাল খান, দক্ষিণপাড়ার সামাদ বেপারী, চর-নাচনার আতিবর মোড়ল ও কাশেম মোড়ল, বড়াইলবাড়ী গ্রামের সবুজ মীরা, জামাল খান, রুবেল খাঁ, সুমন মীরা, শ্রীনাথদি বাজিতপুরের জাহাঙ্গীর হাওলাদার, চাছার গ্রামের ইউসুফ খান জাহিদ, নয়াচর গ্রামের মহসিন মাতুব্বর ও মিজান মাতুব্বর, পেয়ারপুরের আম্বিয়া বেগম ও সবুর খান, গাছবাড়িয়া গ্রামের নাসির শিকদার, রাজৈর উপজেলার বদরপাশা গ্রামের জুলহাঁস তালুকদার, একই উপজেলার তেলিকান্দি গ্রামের মনিকা বেগম, শাখারপাড়ের কামরুল মোল্লা ও এমরান মোল্লা, আমগ্রাম কৃষ্ণারমোড় এলাকার শামীম ফকির ও সম্রাট ফকির, শিবচর উপজেলার দত্তপাড়া এলাকার শহিদুল মাতুব্বর ও সিরাজ মাতুব্বর।

মাদারীপুরের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম জানান, 'শুধু আইনের প্রয়োগ করেই দালালদের নির্মূল করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন, পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিদের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। তাহলে সমাজ থেকে দালাল নির্মূল হবে। এছাড়া মানবপাচার মামলায় অনেক দালাল গ্রেপ্তারের পর জামিনে বেরিয়ে এসে আবারো একই কাজে লিপ্ত হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুললেই এ ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি হবে না। '

মাদারীপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মারুফুর রশিদ খান বলেন, মাদারীপুরের বেশীর ভাগ মানুষের অবৈধভাবে দালালের মাধ্যমে ইতালি যাওয়ার প্রবণতা বেশি। আমরা বিভিন্ন সময় ক্যাম্পেইন করছি, যাতে দালালদের প্রলোভনে তারা উৎসাহিত না হয়। এছাড়াও অভিয্ক্তুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। তবুও তরুণরা এ পথে পা বাড়াচ্ছে। পরিববারের সদস্যরের সবথেবে বেশি সচেতন হতে হবে। নয়তো এ প্রবণতা কমবে না।’ 

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের জুলাই পর্যন্ত শুধু ইতালিতে অবৈধভাবে পাড়ি দিয়েছেন ২২ হাজার ৭৭৮ বাংলাদেশি, যা দেশটিতে মোট অবৈধ অভিবাসীর ১৪ শতাংশ। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মিসিং মাইগ্রেন্টের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগের বছরগুলোর তুলনায় ভূমধ্যসাগরে ডুবে মৃত্যু এবং নিখোঁজের সংখ্যা বাড়ছে। ২০২১ সালে ২ হাজার ৪৮ জন, পরের বছর ২ হাজার ১১ এবং ২০২৩ সালে ৩ হাজার ৪১ জন নিখোঁজ অথবা ডুবে মারা গেছেন ভূমধ্যসাগরে। তাদের মধ্যে কয়েকশ বাংলাদেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান দপ্তর ইউরোস্ট্যাটের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সাল পর্যন্ত সোয়া ১ লাখ বাংলাদেশি অবৈধভাবে জোটভুক্ত দেশগুলোতে ছিলেন। ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ইতালিতে অবৈধভাবে ১৫ হাজার ২২৮ জন এবং ২০২১ সালে ৭ হাজার ৮৩৮ জন যান, তাদের ৯৮ শতাংশই লিবিয়া হয়ে।

ব্রাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, ২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৩ লাখেরও বেশি মানুষ সাগরপথ পাড়ি দিয়ে ইউরোপে ঢুকেছে। একই সময়ে ইউরোপে ঢুকতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে ২৭ হাজার ৬৮২ জন। যাদের মধ্যে অনেক বাংলাদেশি আছে। প্রতি বছর গড়ে কমপক্ষে ৫০০ বাংলাদেশি এভাবে প্রাণ হারায়। আমরা এক গবেষণায় দেখেছি, ৩১ থেকে ৩৫ বছরের যুবকরা বেশি অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করে। গত সাতবছরে ইউরোপ ও লিবিয়া ফেরত তিন হাজারের বেশি মানুষের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। 
তারা জানিয়েছে, অবৈধভাবে দালালের খপ্পরে পড়ে একেক জনের খরচ হয় ১৫ লাখ টাকা। সরকারের উচিত এসব বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া। যাতে তরুণরা বৈধভাবে বিদেশে যেতে উৎসাহী হয়। আর দালালদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা।

রিপোর্ট তৈরীতে সহযোগিতা করেছেন দেশ রূপান্তরের মাদারীপুর প্রতিনিধি