একাধিক আলোচিত কবিতার বই প্রকাশ করে প্রথম বইমেলাতেই নজর কেড়ে নিয়েছে নবীন প্রকাশনা সংস্থা বৈতরণী। বৈতরণীর প্রকাশক কবি তানিম কবিরের কাছে প্রশ্ন ছিল, ‘প্রকাশনা ব্যবসায় কীভাবে এলেন? কী চিন্তা করে এলেন?’ তিনি বললেন, হঠাৎই এসে পড়া বলা যেত, যদি প্রায় দুই দশক লিটল ম্যাগাজিন, সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা ও একসময় পেশাগতভাবেও কখনো অনলাইন পোর্টালের সাহিত্যপাতা, কখনো জাতীয় দৈনিকের সাপ্তাহিক সাময়িকীসহ ঈদসংখ্যা সম্পাদনার মতো প্রকাশনা-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর সঙ্গে জড়িত না থাকতাম। তবু সাহিত্য জগতের সভ্য মাত্রেরই প্রকাশনা শিল্পে চলে আসাটা খুব ঠিকঠাক, তা বলব না। যদি না নিজস্ব রকমের কোনো সম্পাদনা নীতি গড়ে ওঠে, কিংবা বিশিষ্ট কোনো স্বাদ ও রুচির লেখালেখিকে একত্রকরণের তাগিদ তৈরি হয়।
প্রকাশনা হিসেবে অর্জন জানতে চাইলে কবি তানিম কবির বলেন, ‘বৈতরণী একটি সাহিত্যাশ্রয়ী প্রকাশনা হিসেবে আবির্ভূত হতে পেরেছে, এটাকেই বলব প্রাথমিক অর্জন। একটি টেলিভিশন-ম্যানুয়াল যে ছাপা হয় সেটাও তো মুদ্রণশিল্পেরই অংশ। এছাড়াও কেউ লাইফস্টাইল, রান্নাবান্না কি খেলাধুলা বিষয়ে স্পেশালাইজড কোনো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেন। তবে সাহিত্যনির্ভর প্রকাশনাগুলোও ভালো সাহিত্য চিনতে না পারার রোগে ভোগে বা আপস করে। আমরা এক্ষেত্রে সাধারণত ভালো সাহিত্য চিনতে পারা এবং আপস না করা এ দুই বিবেচনাকে প্রাধান্য দিয়ে বই করি।’
এবার প্রথম বইমেলায় স্টল পেয়েছে বৈতরণী। প্রস্তুতি কেমন ছিল জানতে চাইলে তানিম কবির বলেন, ‘এবারই বইমেলায় প্রথমবার স্টল পেল বৈতরণী। ফলে এ যাবৎ প্রকাশিত ২৯টি বইকেই সমান গুরুত্বে তুলে ধরেছি। তবে গত তিন বছরও চৈতন্য প্রকাশনার স্টলে আমাদের বইগুলো পরিবেশন করা হয়েছিল। নিজস্ব স্টলে এবারে একেবারেই নতুন চারটি বইয়ের সবগুলোই কবিতার কামরুজ্জামান কামুর ‘এখানে শিয়ালমুখী ফুল হয়ে ফুটে আছো’, প্রহরীর ‘দৃশ্যের ভিতর ভূত’, তালাশ তালুকদারের ‘টোপার বাইরে পৃথিবী কেমন’, মিছিল খন্দকারের ‘আমার বিনাশ’। এছাড়া আমাদের উল্লেখযোগ্য একটি রিপ্রিন্ট সিরিজ ওয়ার্ক রয়েছে, আমরা অনতি অতীতের, মানে প্রচলিত অর্থে চিরায়ত গ্রন্থ নয়, গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বাজারে না থাকা বেশ কিছু কবিতার বইকে আবার ফিরিয়ে এনেছি। তেমন কয়েকটি বই হলো ৪১ বছর আগে প্রকাশিত এনামুল করিম নির্ঝরের ‘চৌদ্দ গোষ্ঠীর উদ্ধারপর্ব’, ৩৫ বছর আগে প্রকাশিত কাজল শাহনেওয়াজের ‘জলমগ্ন পাঠশালা’, ২৭ বছর আগে প্রকাশিত মাহবুব কবিরের ‘কৈ ও মেঘের কবিতা’, ২১ বছর আগে প্রকাশিত জুয়েল মাজহারের ‘দর্জিঘরে একরাত’ ও শেলী নাজের ‘নক্ষত্রখচিত ডানায় উড্ডীন হারেমের বাঁদী’, ১৬ বছর আগে প্রকাশিত ফয়সল নোইয়ের ‘ঈশানকোণের মেঘ চোখ মুছে দ্রুত উড়ে যায়’। যে ধরনের সাড়া পাচ্ছি লেখক-পাঠকদের থেকে, মনে হচ্ছে খারাপ হলো না আমাদের শুরুটা।’
বইয়ের প্রচারণা নিয়ে কী কী পদক্ষেপ এবার বৈতরণী নিচ্ছে জানতে চাইলে এই কবি ও প্রকাশক বলেন, ‘বইয়ের প্রচারণায় আমরা প্রধানত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কেন্দ্রিক ডিজিটাল মার্কেটিংকেই গুরুত্ব দিয়েছি। এছাড়া আমাদের বইগুলো যেহেতু সাহিত্যমানসম্পন্ন, সাহিত্যের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বইগুলোর নানা রকম খবর ও রিভিউ ভূমিকা রেখেছে প্রচারণায়।’
শুধু মানসম্পন্ন ও ভালো বই নিয়ে ব্যবসায় টিকে থাকতে পারার তো কোনো নিশ্চয়তা নেই। প্রশ্ন ছিল, সৃজনশীল বইয়ের প্রকাশক হিসেবে আপনি কী কী সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন? কোনো আশার বাতিঘর কি দেখতে পাচ্ছেন? উত্তরে তানিম কবির বললেন, ‘ভাইরাল কালচারের এই যুগে গুণগতভাবে মানসম্মত কোনো কিছুর দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্ব তুলে ধরার ক্ষেত্রে সবাইকে যে সমস্যা পোহাতে হচ্ছে, আমাকেও তাই। আশার বাতিঘর অবশ্যই আছে! না থাকলেও তার একটি কল্পনা যে আমরা সবাই করতে পারি এভাবেও বলা যায়, আছে।’
বই প্রকাশে আগ্রহী লেখকদের কাছে বৈতরণীর প্রত্যাশা কী থাকে? কেমন লেখা হলে বৈতরণী নিঃসংকোচে বই প্রকাশ করে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা থাকেদৈববাণীপ্রাপ্ত হয়ে হঠাৎ লিখে ফেলেননি, বরং লেখার সঙ্গে লেখকের আছে দীর্ঘ ধারাবাহিক বসবাস ও বোঝাপড়া, এমন লেখকদের পা-ুলিপি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস ও ক্রমবিবর্তনের ধারাটি সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল এবং পরের বাক্যটি লিখতে প্রস্তুত লেখকই আমাদের প্রত্যাশিত। এ ধরনের লেখা হলেই আমরা নিঃসঙ্কোচে লেখকের কাছে যেচে বই নিয়ে প্রকাশ করে থাকি।’