গত এক মাসের মধ্যে পশ্চিম মালিবাগের চার সদস্যের একটি পরিবারে সবাই সর্দি-জ্বর ও কাশিতে ভুগেছেন। এর মধ্যে ১২ বছরের এক শিশু ও ষাটোর্ধ্ব এক নারীও রয়েছেন। পরিবারের তিন সদস্য গড়ে পাঁচ-সাত দিন ভোগার পর সুস্থ হয়েছেন। কিন্তু পরিবারের বয়স্ক নারীর অবস্থা খুবই নাজুক। তার সর্দি ও জ্বর সারলেও কিছুতেই কাশি যাচ্ছে না। প্রচণ্ড কাশির কারণে তিনি রাতে ঘুমাতে পারেন না। রুচি নষ্ট হয়ে গেছে। খেতেও পারছেন না।
শাহাদত আরাকে নিয়ে গত শনিবার পান্থপথ একটি বেসরকারি হাসপাতালে এসেছিলেন তার মেয়ে রোজি। তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, বেশ কয়েক দিন ভোগার পর তারা সবাই সুস্থ হয়েছেন। কিন্তু তার মায়ের কাশি যাচ্ছে না। দুই দফা চিকিৎসক দেখিয়ে ও ওষুধ পরিবর্তন করেও কোনো সমাধান মিলছে না। চিকিৎসকরাও সঠিক কিছু বলতে পারছেন না।
শুধু পশ্চিম মালিবাগের এই পরিবারই নয়; রাজধানীর ঘরে ঘরে এখন সর্দি, জ্বর ও কাশির রোগী। সর্দি-জ্বরের সঙ্গে শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছে। বিশেষ করে কাশি ভোগাচ্ছে সবচেয়ে বেশি। সর্দি ও জ্বর সেরে যাওয়ার পর শরীর ভীষণ দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। ঠিকমতো খেতে পারছে না।
সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে এ ধরনের রোগীর চাপ বেড়েছে। শীতের শুরুর তুলনায় এখন কমপক্ষে ৩০ শতাংশ রোগী বেড়েছে। এর সঙ্গে দেখা দিচ্ছে নিউমোনিয়াও। চিকিৎসকরা এ বছরের সর্দি-জ্বর ও কাশির তীব্রতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, সাধারণত ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের কারণে সর্দি-জ্বর দেখা দেয়। এ ধরনের সর্দি-জ্বর তিন-চার দিন পর এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। কিন্তু এবার এর সঙ্গে কাশির তীব্রতা বেড়েছে। কোনোভাবেই কাশি কমাতে পারছেন না তারা।
চিকিৎসকরা এ বছরের সর্দি-জ্বর-কাশির জন্য ইনফ্লুয়েঞ্জার ধরন বদলে যেতে পারে বলে মনে করছেন। এমনকি এই সর্দি-জ্বর-কাশির উপসর্গের সঙ্গে করোনার উপসর্গেরও মিল পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। তারা এই ইনফ্লুয়েঞ্জার ধরন জানতে এ ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সের পরামর্শ দিয়েছেন।
বেশি ভোগাচ্ছে কাশি : এ ব্যাপারে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের পরিচালক ও শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবারের সর্দি-জ্বরের অন্য উপসর্গগুলো খুব বেশি তীব্র নয়। কিন্তু কাশিটা কমানো যাচ্ছে না। এটাই উদ্বেগের। প্রচণ্ড কাশি হচ্ছে। বাচ্চারা কাশতে কাশতে বমি করছে। এটার কারণ হতে পারে দেশে ধুলার পরিমাণ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে ঢাকা শহরের ধুলা বেশি।
এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আরও বলেন, গত এক মাসের তুলনায় এখন রোগী ৩০ শতাংশের মতো বেড়েছে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের বহির্বিভাগে দৈনিক ১২০০-১৩০০ রোগী আসছে। আগে শীতের সময় কম ছিল। দৈনিক ৮০০-৯০০ হতো। নিউমোনিয়া রোগীর সংখ্যাও একটু বেড়েছে।
এ ব্যাপারে রাজধানীর হেলথ অ্যাণ্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ও প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবার যে সর্দি-জ্বর হচ্ছে, সেটার ধরন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্নতর। প্রতি বছরই ঋতু পরিবর্তনের সময় মানুষ সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত হয়ে থাকে। নাক দিয়ে পানি পড়া, কাশি হওয়া, শরীর ব্যথা হয়ে থাকে এবং সেটা দুই-তিন দিন পর ভালো হয়ে যায়। কিন্তু এবার আমরা দেখছি এসব সর্দি-জ্বরের লক্ষণগুলো আরেকটু বেশি, অর্থাৎ তীব্রতর। প্রচণ্ড কাশি হচ্ছে। শরীরব্যথা অনেক। দুই-তিন দিনে ভালো না হয়ে কারও কারও চার-পাঁচ দিন লেগে যাচ্ছে। ভালো হওয়ার পরও তারা শরীরে ভীষণ দুর্বলতা ও ক্লান্তি বোধ করছেন। রুচি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সব মিলে মনে হচ্ছে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের যে ধরন দিয়ে এটি হচ্ছে, সেটি অন্য বছরের তুলনায় একটু বেশি শক্তিশালী ও মারাত্মক। মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদি ছাপ তৈরি করছে।
এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আরও বলেন, এ বছর বয়স ও লিঙ্গভেদে সবার মধ্যেই সর্দি-জ্বর দেখা দিচ্ছে। তবে শিশুদের মধ্যে তীব্র ঠাণ্ডা এবং এক ধরনের কাশি দেখা দিচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি কাশি হচ্ছে। যেটা এক সপ্তাহ বা তারও বেশি ১৫ দিনের মতো থাকছে। এই ধরনের কাশি বেশ উদ্বেগ তৈরি করছে।
করোনার যোগসূত্র থাকতে পারে: এবারের সর্দি-জ্বর-কাশির সঙ্গে করোনার নতুন ধরন জেএন১-এর যোগসূত্র থাকতে পারে বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা। এ ব্যাপারে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এমনি ঠাণ্ডা লাগতে পারে, কাশি হতে পারে, সেটা হলে কমন কোল্ড। ভাইরাসের জন্য নয়। শীতের জন্য, ধুলোবালির জন্য হতে পারে। সেটা হয় ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ব্যাকটেরিয়ার কারণে। কিন্তু জ্বর হলে সেটা করোনা বা ডেঙ্গু হতে পারে। এটা জানতে আরটিপিসিআর টেস্ট করলেই হয়। তাই এখন যাদের জ্বর হচ্ছে তাদের কভিড ও ডেঙ্গু টেস্ট করা দরকার।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, সাধারণত এ ঋতুতে জ্বর হয় না, সর্দি ও কাশি হয়। সর্দি হলেই নাক বন্ধ হয়ে যায়। ছুটি না নিয়ে অফিসে কাজ করতে পারে। কিন্তু জ্বর হলে শরীর দুর্বল হয়ে গেলে, তাকে কভিড টেস্ট করতে হবে। এটা কভিড বা শ্বাসতন্ত্রজনিত সংক্রমণ হতে পারে। আমরা নজর রাখছি। ইনফ্লুয়েঞ্জা ও কভিড সার্ভিলেন্স হচ্ছে। সেগুলো দেখছি।
অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এই যে কাশি হচ্ছে, এর মধ্যে করোনাও থাকতে পারে। এখন তো কেউ আর করোনাকে আমলে নেয় না। পরীক্ষাও করায় না। আমরা এখন টেস্টও করি না। জরুরি প্রয়োজন হলে বেসরকারিভাবে করোনা পরীক্ষা করা হয়। সরকারিভাবে করোনা পরীক্ষার সংখ্যাও কমেছে।
ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, আইইডিসিআরের উচিত এ ধরনের সর্দি-জ্বরেরও জাতীয়ভাবে জিন বিন্যাস বা জিনোম সিকোয়েন্স করে দেখা যে, এটি সর্দি-জ্বর কি না, সেটি হলেও এটি আগের ধরনের থেকে ভিন্ন কি না বা নতুন কোনো ধরন বা উপধরন কি না।
তিনি বলেন, এখন অনেকের করোনা হচ্ছে। চলমান সর্দি-জ্বর-কাশির উপসর্গের সঙ্গে করোনার নতুন ধরন জেএন১-এর উপসর্গের মিল দেখা যাচ্ছে। আমরা দেখেছি যে, এ ধরনের উপসর্গ নিয়ে করোনা পরীক্ষা করে পজিটিভ আসছে।
পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার খাওয়ার পরামর্শ: চিকিৎসকরা ঘরে ঘরে দেখা দেওয়া সর্দি-জ্বর-কাশি থেকে রক্ষা পেতে মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। এ ব্যাপারে অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পরামর্শ হলো সবাইকে মাস্ক পরতে হবে। বের হলে বাচ্চাকে মাস্ক পরাতে হবে। অভিভাবকদেরও মাস্ক পরতে হবে। বাচ্চাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হবে। রোদের মধ্যে খেলতে হবে। প্রচুর ফলমূল খেতে হবে। ঘরে বসিয়ে রাখা যাবে না। বাচ্চাদের বাহিরমুখী করাতে হবে। আর বাইরে বের হতে হলে মাস্ক পরাতে হবে।
ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, এই জাতীয় সর্দি-জ্বরে যারা আক্রান্ত হবে, তাদের পযাপ্ত পরিমাণ বিশ্রাম নিতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি ও তরল জাতীয় খাবার খেতে হবে। তাজা ফলমূল শাকসবজি অত্যন্ত উপকারী। যদি তীব্র শরীর ও মাথাব্যথা হয়, তাহলে শুধু প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খাবে। চিকিৎসককের পরামর্শ ছাড়া কোনোভাবেই অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া যাবে না।