দুই যুগ আগেও ঢাকার নবাবগঞ্জের মানুষের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম ছিল নদীপথ। তখন ইছামতি নদী পানিতে ছিলো টইটম্বুর। বর্ষা মৌসুমে দু’কূল উপচে পানি খালবিল, মাঠঘাট, হাওড় বিলে গিয়ে পড়ত। বারো মাসই এলাকার মানুষের যোগাযোগের একমাত্র ভরসা ছিল নৌযান। কিন্তু এখন ভরা বর্ষা মৌসুমেও সেই নদীতে পানি থাকে না বললেই চলে। পলি জমে কোথাও কোথাও ভরাট হয়ে গেছে। কোথাও আবার ধান চাষ হচ্ছে। হাট-বাজার ও বাসা-বাড়ির ময়লা-আবর্জনা নদীতে ফেলা হচ্ছে। ফলে এক সময়ের প্রমত্তা ইছামতি এখন মরা খাল আর ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। একসময় দিনরাত ইছামতি নদীতে উত্তাল ঢেউ আর জাহাজের সাইরেন শোনা গেলেও এখন এর অস্তিত্বই হারিয়ে যেতে বসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নবাবগঞ্জ উপজেলার কাশিয়াখালী বেড়িবাঁধের মূল পয়েন্টে স্লুইসগেট (জলকপাট) না থাকায় ইছামতি নদী এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।
ইছামতি নদীর এই দুর্দশা থেকে রক্ষা করতে কয়েকটি সামাজিক সংগঠন সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে ধরনা দিয়েছে। কাজের কাজ কিছু না হওয়ায় হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছেন অনেকেই। তবে এখনো কাজ করে যাচ্ছেন নৌকা বাইচ ঐতিহ্য রক্ষা জাতীয় কমিটির প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক রাশিম মোল্লা। বছরব্যাপী সামাজিক নানা ইস্যুতে কাজ করছেন তিনি। ইছামতি নদীকে আগের রূপে ফিরিয়ে আনা, গ্রাম বাংলার শত বছরের ঐতিহ্য নৌকা বাইচ টিকিয়ে রাখাই যেন তারই মূল কাজ। কখনো এলাকার স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে, আবার কখনো একাই ইছামতি নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে দাঁড়িয়ে যান। ঘুরে ঘুরে বেহাল দশার চিত্র তুলে ধরেন জাতীয় গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে।
সম্প্রতি এই সংগঠককে দেখা যায়, নবাবগঞ্জ উপজেলার ইছামতি নদীর নয়নশ্রী পয়েন্টে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও নদী কমিশনসহ প্রশাসনের কাছে ইছামতির দুর্দশা তুলে ধরতে ডকুমেন্টারি বানাচ্ছিলেন তিনি। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা হয় তার। তিনি বলেন, আমাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি প্রতিনিধি দল বেশ কয়েকবার কাশিয়াখালী বেড়িবাঁধ পরিদর্শন করেছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। সাক্ষাৎ করলে বলেন স্লুইসগেট স্থাপন প্রক্রিয়ার কার্যক্রম অনেক দূর এগিয়েছে। নদীতে পুনরায় নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে ইছামতি নদীর কশিয়াখালী বেড়িবাঁধ ও কার্তিকপুর অংশে স্লুইসগেট স্থাপনের জোর দাবি জানান তিনি।
নবাবগঞ্জের ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব দুলাল দেওয়ান বলেন, ইছামতি নদীর নাব্যতা সংকটে যখন হারিয়ে যেতে বসেছিল নৌকা বাইচ তখন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রাশিম মোল্লার উদ্যোগেই গড়ে উঠে নৌকা বাইচ ঐতিহ্য রক্ষা জাতীয় কমিটি। সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়ে নদী রক্ষায় প্রায় দেড় যুগ ধরে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। বিভিন্ন মৌসুমে আমরা তার ডাকে সাড়া দিয়ে নদীর বিভিন্ন গণসচেতনতা সহ নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করি।
দোহার-নবাবগঞ্জের বিশিষ্ট ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব ও নৌকা বাইচ ঐতিহ্য রক্ষা জাতীয় কমিটির সভাপতি মাসুদ মোল্লা বলেন, দোহার-নবাবগঞ্জ ও হরিরামপুর উপজেলাকে পদ্মা নদীর ভাঙন থেকে রক্ষা করতে ১৯৯৬ সালে দোহারের অরঙ্গাবাদ থেকে মানিকগঞ্জের হাটিপাড়া বংখুরী পর্যন্ত সাড়ে ১১ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়। তবে নদীর মূল পয়েন্টে স্লুইসগেট নির্মাণ না করায় ইছামতি এখন চরম নাব্য সংকটে। প্রতিবছরই শুষ্ক মৌসুমে কাশিয়াখালী থেকে শিকারীপাড়া, বারুয়াখালী, বান্দুরা পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটার নদীপথ শুকিয়ে যায়। ইছামতিকে আগের রূপে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন দ্রুত কাশিয়াখালি বেড়িবাঁধের মুখে স্লুইসগেট নির্মাণ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদী বাঁচাতে বর্তমান সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও কতিপয় সংশ্লিষ্ট দফতরের নীরব ভূমিকা স্থানীয় জনসাধারণের মনে বিভিন্ন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। ইছামতি নদী রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড, নদী কমিশনসহ স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তাদের।
এবিষয়ে নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কামরুল হাসান সোহেল বলেন, ইছামাতি নদী সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চলছে। আশা করি, খুব শিগগিরই আমরা ভালো কিছু করতে পারব।
ইছামতি নদীর এ বেহাল দশা সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা পওর বিভাগ-২ বাপাউবো (পানি উন্নয়ন বোর্ড ঢাকা) এর নির্বাহী প্রকৌশলী এমএল সৈকত বলেন, দেশের বিভিন্ন নদী রক্ষা নিয়ে সরকার কাজ করছেন আশা করছি খুব শিগগিরই ইছামতি নদীর সমস্যা সমাধান করা হবে।