ক্ষুধার্তকে খাওয়ানো সওয়াবের কাজ

মানুষ সামাজিক জীব। মানুষ কখনো একা বাস করতে পারে না। তাই একে অন্যের সহযোগিতা প্রয়োজন। এই সহযোগিতার মাধ্যমে বেঁচে থাকে ধনী-দরিদ্র সবাই। দরিদ্র মানুষ কাজ ও শ্রম দিয়ে ধনীদের স্বপ্নপূরণ করেন। অন্যদিকে ধনীদের দেওয়া পারিশ্রমিক, দান-খয়রাত ও সহযোগিতায় বেঁচে থাকে দরিদ্ররা। পৃথিবীতে একে অন্যের মাধ্যমে কাজ নেওয়ার এই পদ্ধতি সর্বশক্তিমান আল্লাহই তৈরি করে দিয়েছেন। এতে সম্মানের লাঘব হবে, এমন মনে করতে নেই। পৃথিবীর মানুষের জন্য এটি একটি পরীক্ষা। দরিদ্র মানুষ এই পরীক্ষা দেবে খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থান ইত্যাদি অভাবে ধৈর্যের মাধ্যমে। আর ধনীরা পরীক্ষা দেবে দরিদ্রদের এই দুরবস্থায় সাহায্যের হাত বাড়ানোর মাধ্যমে। ধনীদের এই সহযোগিতা দরিদ্রদের প্রতি দয়া প্রদর্শনে নয়, বরং ধনীদের ওপর দরিদ্রদের পাওনা হিসাবে, যা আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এবং বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.) হাদিসে বর্ণনা করেছেন।

ক্ষুধার জ¦ালা মেটাতে দুমুঠো ডাল-ভাতের জন্য সারা দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে হয় দরিদ্রদের। পারিবারিক ব্যয় অনুযায়ী এই পারিশ্রমিক খুবই সামান্য। যার কারণে অনেকে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটায়। কেউ তাদের দিকে না তাকালেও ধনিক শ্রেণির মুসলমানদের উচিত তাদের পাশে থাকা। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘আমি তাকে দুটি পথ প্রদর্শন করেছি। অতঃপর সে ধর্মের ঘাঁটিতে প্রবেশ করেনি। আপনি জানেন, সে ঘাঁটি কি? তা হচ্ছে দাসমুক্তি অথবা দুর্ভিক্ষের দিনে এতিম আত্মীয় অথবা ধূলি-ধূসরিত মিসকিনকে অন্নদান করা।’ সুরা বালাদ, আয়াত : ১০-১৬

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা আল্লাহর প্রতি তাদের ভালোবাসার খাতিরে ক্ষুধার্ত এতিম, মিসকিন ও কয়েদিদের খাবার দান করে।’ সুরা দাহর, আয়াত : ৮

ইবাদত দুই ভাগে বিভক্ত। এক. মহান আল্লাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত ইবাদত। যেমন : নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত। দুই. বান্দার সঙ্গে সম্পৃক্ত ইবাদত। যেমন : মানুষের সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার করা, বিপদে এগিয়ে আসা ইত্যাদি। দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছে ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে খাবার খাওয়ানো। ক্ষুধার্তকে আহার করিয়ে পরিতৃপ্ত করা মহান আল্লাহর কাছে অত্যন্ত পছন্দনীয় কাজ। হাদিসে এসেছে, ‘হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত। এক ব্যক্তি হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে প্রশ্ন করলেন, ইসলামে কোন কাজটি শ্রেষ্ঠ? রাসুল (সা.) বললেন, ইসলামে সবচেয়ে ভালো কাজ হচ্ছে ক্ষুধার্তকে খাবার খাওয়ানো।’ সহিহ বোখারি

গরিব, অসহায় ও ক্ষুধার্ত ব্যক্তি কষ্টে জর্জরিত হয়ে আমাদের কাছে জীবন বাঁচাতে সামান্য সাহায্যের জন্য আসে। তাদের ফিরিয়ে দেওয়া মোটেই সমীচীন নয়। তারাও মানুষ। তাদেরও বেঁচে থাকার অধিকার আছে। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়ানোর কঠোর নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা ভিক্ষুককে (ক্ষুধার্তকে) কিছু না কিছু দাও, আগুনে পোড়া একটা খুর হলেও।’ সুনানে নাসাঈ

ক্ষুধার্তকে খাবার দান করার মাধ্যমে মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করা হয়। এতে আমরা মহান আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ করতে পারি। আর তাদের কষ্ট লাঘবের কারণে আল্লাহতায়ালা কিয়ামতের দিন বিভিন্ন কষ্ট লাঘব করে দেবেন। হাদিসের ভাষায়, ‘যে ব্যক্তি কোনো গরিবের চলার পথ সহজ করে দেয়, দুনিয়া ও আখিরাতে মহান আল্লাহ তার চলার পথ সহজ করে দেবেন।’ আবু দাউদ

ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া সওয়াবের কাজ। এটা মানবিকতার পরিচয়ও বটে। এটি এমন সওয়াবের কাজ, যার মাধ্যমে আল্লাহর দয়া ও করুণা অর্জিত হয়। আল্লাহতায়ালা বান্দার জন্য রিজিকের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন। হাদিসের ভাষায়, ‘মুসআব বিন সাদ (রা.) যুদ্ধজয়ের পর মনে মনে কল্পনা করলেন, নিজের বীরত্ব ও শৌর্যবীর্যের কারণে বোধহয় তিনি অন্যের চেয়ে বেশি মর্যাদাবান। এমন অবস্থায় মহানবী (সা.) তাকে বললেন, তোমাদের মধ্যে থাকা দুর্বলদের কারণে তোমাদের সাহায্য করা হয় এবং রিজিক দেওয়া হয়।’ সহিহ বোখারি

সমাজে গৃহহীন, বস্ত্রহীন, খাদ্যহীন ও আশ্রয়হীন মানুষ থাকবে, আর বিত্তশালীরা সব ধরনের আরাম-আয়েশে দিন যাপন করবে, প্রয়োজন অতিরিক্ত দামি কাপড় পরবে এবং বিভিন্ন ধরনের খাবার দিয়ে পেটপুরে খাবে, ইসলাম তা সমর্থন করে না। প্রতিবেশীকে কষ্টে রেখে ইবাদত-বন্দেগি করলেও প্রকৃত মুমিন হওয়া যায় না। দুনিয়াতে প্রকৃত মুমিন হয়ে পরকালে শান্তিময় জান্নাত পেতে সমাজের অসহায়দের সাহায্য এবং ক্ষুধার্তদের খাবার দিয়ে পাশে থাকতে হবে। হাদিসের ভাষায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘ক্ষুধার্তকে খাবার দান করো। তাহলে শান্তির সঙ্গে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।’ সুনানে তিরমিজি

গরিব, অসহায় ও ক্ষুধামুক্ত দেশ গড়তে সরকারের পাশাপাশি বিত্তবানদেরও এগিয়ে আসতে হবে। এমন অনেক বিত্তবান মানুষ আছেন যারা অঢেল ধন-সম্পদের মালিক হয়েও গরিব-দুঃখীদের এড়িয়ে যান, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।