বিএনপিতেই ভর সাক্কু-কায়সারের

২০১১ সালে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এবারের উপনির্বাচন নিয়ে কুসিকের চারটি নির্বাচন হতে হচ্ছে। এ উপনির্বাচনে ভোটার ও নগরবাসীর আগ্রহ তেমন না থাকলেও আলোচ্য করে রেখেছেন দুই প্রার্থী সাবেক মেয়র মনিরুল হক সাক্কু ও নিজাম উদ্দিন কায়সার। তারা বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত।

দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে ২০২২ সালে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচনে অংশ নিয়ে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক মনিরুল হক সাক্কু আজীবন বহিষ্কৃত হন এবং জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও কুমিল্লা মহানগর শাখার আহ্বায়ক নিজাম উদ্দিন কায়সার বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হন।

নির্বাচনের পর অনেক চেষ্টা করেও বহিষ্কারাদের প্রত্যাহার করাতে পারেননি বিএনপির এ দুই নেতা। বহিষ্কারাদেশ নিয়েই নির্বাচন বৈতরণী পার হতে বিএনপির তৃণমূলের ভোটে ভরসা করেছেন সাবেক মেয়র সাক্কু ও দ্বিতীয়বার কুসিক নির্বাচনে অংশ নেওয়া কায়সার।

কুমিল্লা জেলা ও মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা ভালো নেই। প্রায় বিধ্বস্ত অবস্থা। কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় বিএনপির ত্রাণ ও পুনর্বাসন সম্পাদক আমিন উর রশিদ ইয়াছিন ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক মেয়র প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু গ্রুপে দলটি বিভক্ত। এই দুই গ্রুপের আবার অনেক উপগ্রুপ, যার ফলে কুমিল্লা বিএনপির লেজেগোবরে দশা। এ কারণে বিএনপির তৃণমূলের কর্মীরা হতাশ।

বিএনপির এ বিশৃঙ্খল অবস্থাতেই কুসিক উপনির্বাচন। বিএনপির তৃণমূলের ভোটারদের নিজেদের পক্ষে রাখতে মরিয়া সাক্কু ও কায়সার। তবে সাক্কু ও কায়সারকে নিয়ে বিএনপির তৃণমূলের ভোটারদের রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। বিএনপির অল্পসংখ্যক নেতাকর্মী সাক্কু ও কায়সারের প্রচারণায় অংশ নিলেও মূলধারার নেতাকর্মীরা নিশ্চুপ।

কর্মীরা বলছেন, কুমিল্লায় বিএনপির দ্বন্দ্ব ও গ্রুপিংয়ের কারণেই সাক্কুকে ঠেকাতে নির্বাচন করছেন নিজাম উদ্দিন কায়সার; তিনি দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় বিএনপির ত্রাণ ও পুনর্বাসন সম্পাদক আমিন উর রশিদ ইয়াছিনের শ্যালক। দুলাভাইয়ের কাঁধে ভর করে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় থাকলেও রাজনীতির বয়সে তাকে আনকোরাই ভাবছেন বিএনপির সাধারণ ভোটাররা ও সিনিয়র নেতারা।

আমিন উর রশিদ ইয়াছিনের শ্যালক হওয়ায় বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের একটি বিশাল অংশ কায়সারকে মেনে নিতে পারেনি। তবে বিএনপির গ্রুপিংয়ের কারণে এবং সাক্কুবিরোধিতার ফলে বিএনপির তৃণমূলের ভোটারদের সাড়া পাচ্ছেন তিনি। কায়সার প্রথম নির্বাচনে সাক্কুবিরোধীদের একটি অংশের ভোট পেলেও এবার এতেও ভাটার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ বিএনপির ভোটারদের বিশাল একটি অংশ ভোটকেন্দ্রে যাবেন না বলে জানা গেছে।

দুবার কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়র হয়ে নব্য বিএনপি ও পছন্দের লোকদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে সাবেক মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর বিরুদ্ধে। বিপুল বিত্তের মালিকও হয়েছেন তিনি। ২০২৩ সালে কুমিল্লায় বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশে সাক্কু বলেছিলেন, ‘কুমিল্লায় আমার ৭৮টি ফ্ল্যাট রয়েছে।’ ওইসব ফ্ল্যাটে থাকার জন্য লুঙ্গি-গামছা নিয়ে চলে আসতে বিএনপির কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। এরপর থেকেই সাক্কুর অবৈধ সম্পদ আহরণের বিষয়টি নিয়ে বিএনপির কর্মীরা তার প্রতি বিরূপ মনোভাবাপন্ন।

কুমিল্লা বিএনপির সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাক্কু মেয়র নির্বাচিত হয়ে নিজস্ব সিন্ডিকেট তৈরি করেন, যাদের দিয়ে সিটি করপোরেশনের ঠিকাদারি ও নানান প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করান এবং বড় সুবিধা নেন। নেতাকর্মীরা মামলা-মোকাদ্দমায় অসহায় জীবনযাপন করলেও মেয়র থাকা অবস্থায় তাদের খোঁজ-খবর রাখেননি তিনি।

সাক্কুর বিরুদ্ধে মেয়র থাকা অবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন মেয়র প্রার্থী নিজাম উদ্দিন কায়সার। এখন দেখার বিষয়, কুসিক নির্বাচনে বিএনপির বহিষ্কৃত দুই প্রার্থী সাক্কু ও কায়সার বিএনপির সাধারণ ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে পারেন কি না।

কুমিল্লা বিএনপির গ্রুপিং, বহিষ্কারাদেশ এবং নিজেদের ও বিএনপির সাধারণ ভোটারদের বিষয়ে কথা হয়েছে কুসিক নির্বাচনের দুই প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু ও নিজাম উদ্দিন কায়সারের সঙ্গে। কায়সার তার ঘোড়া প্রতীক নিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন। বললেন, ‘কুমিল্লা মহানগর বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা আমার সঙ্গে আছে। আন্দোলন করতে গিয়ে আমি বহুবার কারাবরণ করেছি, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের খবর রেখেছি। আমি যেখানেই যাচ্ছি সেখানে মানুষের ঢল নামছে। চারদিকে ঘোড়া মার্কার গণজোয়ার। কুমিল্লার মানুষের পরিবর্তন চায়। যেহেতু পরিবর্তনের সেøাগান আমিই তুলেছি সেজন্য তারা আমার সঙ্গেই থাকবে।’

কুমিল্লা সিটির সাবেক মেয়র মনিরুল হক সাক্কু তার টেবিল ঘড়ি প্রতীকে ভোট চেয়ে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘কুমিল্লা সিটি করপোরেশন হওয়ার পর আমি দুবার মেয়র হয়েছি। নগরবাসীর প্রত্যাশা পূরণে কাজ করেছি, সরকার থেকে যা পেয়েছি, তা দিয়েই উন্নয়ন করার চেষ্টা করেছি। বিএনপির নেতাকর্মীরা ও নগরবাসী আমার সঙ্গে আছে।’

ইভিএমে বিশ্বাস করতে পারছি না জানিয়ে সাক্কু বলেন, ‘২০২২ সালের ১৫ জুন সিটি নির্বাচন হয়েছে। ইভিএম মেশিন কী করেছে আপনারা জানেন। কুমিল্লার জনগণ জানে। বিষয়টি আমি রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জানিয়েছি। তিনি আমাকে বলেছেন, নির্বাচন কমিশনার কুমিল্লায় আসবেন। ডিসি সাহেবও থাকবেন। প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলবেন। সেখানে আমি গত নির্বাচনের অভিজ্ঞতার কথা বলব।’

২০২২ সালের ১৫ জুন অনুষ্ঠিত কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আরফানুল হক রিফাত। তিনি ভোট পেয়েছিলেন ৫০ হাজার ৩১০টি। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মনিরুল হক সাক্কু ঘড়ি প্রতীকে পেয়েছিলেন ৪৯ হাজার ৯৬৭ ভোট। আর নিজাম উদ্দিন কায়সার ঘোড়া প্রতীকে পেয়েছেন ২৯ হাজার ৯৯ ভোট।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ২০১২ ও ’১৭ সালে জয় পেয়েছিলেন সাক্কু। ২০২২ সালে জয়ী হন নৌকার প্রার্থী রিফাত। একই সময়ে বিএনপিতে উত্থান হয় কায়সারের।

এবার ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৪২ হাজার ৪৫৮। নারী ভোটার ১ লাখ ২৪ হাজার ২৭৪ ও পুরুষ ভোটার ১ লাখ ১৮ হাজার ১৮২ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ২ জন। কুমিল্লা সদরের ১৮টি ও সদর দক্ষিণের ৯টিসহ ২৭টি ওয়ার্ডের ১০৫টি কেন্দ্রে ভোটাররা ইভিএমে ভোট দিয়ে কুসিক উপনির্বাচনে তাদের মেয়র নির্বাচিত করবেন।

আরফানুল হক রিফাতের মৃত্যুতে কুসিকের মেয়র পদটি শূন্য হয়। নির্বাচন কমিশনের তফশিল অনুযায়ী ১৩ ফেব্রুয়ারি মনোনয়নপত্র জমা দেন চার প্রার্থী। ৯ মার্চ কুসিক উপনির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণ করা হবে।