আমাদের গত পাঁচ দশকে আর্থসামাজিক পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো। পরিবর্তনটা চোখে পড়বে ১৯৯১ থেকে বা ৯০ দশক বা পরবর্তী আরও আড়াই/তিন দশকের কালপর্বে। কিন্তু এটার প্রেক্ষাপট বুঝতে আমাদের স্বাধীনতা লাভের পরের দুই দশকেরও পর্যালোচনা দরকার। প্রথম দুই দশকে মূল পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি হয়েছে। সেটা এক অর্থে আমাদের ইকোনমিক মডেল বদলাবার প্রাথমিক ধাপ। পাকিস্তানি আমল থেকে পরম্পরাগত যে মডেল আমরা পেলাম সেটা হচ্ছে একটা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় রপ্তানিনির্ভর অর্থনৈতিক মডেল। মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতার পরপরই একটা দুর্ভিক্ষের বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল। প্রথম দুই দশকের অর্থনৈতিক মডেলটা এক অর্থে সুচিন্তিতভাবে নয়, বরং বাস্তবতার নিরিখে। অর্থাৎ পুরো সমাজের কথা চিন্তা করে যা কিছু চেষ্টা সবই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে হয়েছে। ফলে আমাদের অর্থনৈতিক মডেলটা অনেকটাই বদলে গেল। প্রথমত, রপ্তানিনির্ভর চিন্তা না করে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি বা ডোমেস্টিক ইকোনমিভিত্তিক একটা পরিবর্তনের চেষ্টা করা হলো। দ্বিতীয়ত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় অর্থাৎ এই আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় অর্থনীতি চালাবার একটা প্রবণতা তৈরি হলো। কলকারখানাগুলোও রাষ্ট্রীয়করণ হয়ে গেল, যদিও সেটা বড় ইস্যু ছিল না। কারণ মালিকানাগুলো ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের সুতরাং স্বাধীনতার পরে সেটার রাষ্ট্রীয়করণ হয়েছিল। কিন্তু এখানে অন্য এক ঘটনা ঘটল সেটা হলো নানাভাবে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক কর্মকা-ে সক্রিয়তার তাগিদ অনুভব করল। দুর্ভিক্ষের ধাক্কায় একটা বড় উপলব্ধি আসল যে শুধু রাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে চলবে না, নিজেদের ভাগ্য নিজেদের গড়তে হবে। মনোভাবের এই পরিবর্তন প্রথম দুই দশকের অন্যতম একটা দিক। জনগণের এই মাইন্ডসেট পরিবর্তনের ফলে রাষ্ট্র নিজের ভূমিকাগুলো নিয়ে পুনঃচিন্তা শুরু করে দিল। এর ফলশ্রুতিতে অনেক কিছু হলো। যেমন, সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে কৃষির আধুনিকায়নের একটা ধারা শুরু হয়ে গেল, এনজিওরা জন্ম নিল, ক্ষুদ্রঋণ ধারণার জন্ম নিল, নানা সামাজিক উন্নয়নের বিষয়গুলো সামনে চলে এলো। রাষ্ট্রও আবার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে ৭০ ও ৮০-এর দশকে গুরুত্ব দিতে শুরু করল। বিশেষ করে ফুড ফর ওয়ার্কস বা কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির কথা উল্লেখ করা যায়। ব্যক্তি মালিকানার সূত্রপাত হলো। ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির ভিত্তি স্থাপন হলো। এসবই হলো সত্তর-আশি দশকের মূল গল্প।
এর সামাজিক অভিঘাতে গ্রামাঞ্চলে মহাজন, ভূমি মালিক বা জোতদারের ঘেরাটোপ থেকে মানুষ বেরিয়ে আসতে শুরু করল। রেমিট্যান্সের জন্য বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হলো, যা পরে আরও প্রবল হয়েছে। আমাদের মূল সামাজিক অভিঘাত যেটা হলো আগে একটা ধারণা ছিল যে, অর্থনৈতিক অবস্থা হচ্ছে ‘ভাগ্যের লিখন’ অর্থাৎ তকদিরের ওপর নির্ভর করা, কপালের ওপর নির্ভর করা। এখন হলো যে নিজের ভাগ্য নিজের তৈরি করতে হবে। এটাকে বলা যায় সাংঘাতিক একটা ইন্সপেরিশনাল রেভল্যুশন। এখানে আকাক্সক্ষার বিপ্লব ঘটল। শুধু তাই নয়, ব্যক্তিত্বের বিপ্লবও ঘটল। এখানকার মানুষের ব্যক্তিত্ব এবং আকাক্সক্ষা নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীদের কোনো গবেষণা নেই। এখানে ব্যক্তিত্ব মানে হচ্ছে অর্থনৈতিকভাবে আরও ক্রিয়াশীল হওয়া; সম্মুখমুখী একটা মানসিকতার বিকাশ ঘটল। যেমন- স্বাধীনতার আগে ভোলায় ঘূর্ণিঝড়ে লাখ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। সত্তর-আশি দশকে এই দুর্যোগকে মোকাবিলার বিষয়টি বাস্তবতার নিরিখে দেখা শুরু হলো। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিসহ ইত্যাদি শুরু হয়ে গেল। প্রথম দুই দশকে এভাবে আমাদের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের ভিত্তিটা তৈরি হয়ে যায়।
নব্বই থেকে শুরু হলো পরিবর্তনের আরেক ধাপ। আর সেটা হচ্ছে কানেক্টিভিটি বিপ্লব দুই স্তরের কানেক্টিভিটি। এখানে কানেক্টিভিটি হলো যোগাযোগ। নব্বইয়ের দশক থেকে যোগাযোগের দুই স্তরের বিপ্লব শুরু হলো এবং এটা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেল। আশির দশকের শেষে দুটি বন্যা হয়েছিল। ওই বন্যা পরবর্তী একটা উপলব্ধি তৈরি হলো। এর আগে আমাদের গ্রামাঞ্চল এবং শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থাগুলো অনেকটা কাঁচা রাস্তাভিত্তিক ছিল, বন্যা এলে সেটা ধুয়ে যেত পরে আবার সেটা তৈরি করা হতো। ওই বড় বন্যা দুটি মোকাবিলা করে আমাদের একটা উপলব্ধি হলো যে, অল ওয়েদার ইনফ্রাস্টাকচার মানে সর্বসময়ের জন্য যোগাযোগের রাস্তা তৈরি করতে হবে। এটার রূপক যদি বলি সেটা হচ্ছে ফিডার রোড।
ফিডার রোডস বলতে গ্রামের সঙ্গে নিকটবর্তী উপজেলা বা শহরকে সংযোগ করা। ফিডার রোডসগুলো কাঁচা রাস্তা না। আশির দশকে একটা শব্দ ছিল কেয়ারের রাস্তা। কেয়ার নামে একটা এনজিও আছে। তারা কাঁচা মাটি কেটে রাস্তা করত, তবে সেটা আবার ধুয়ে যেত। এলজিইডির রাস্তা সেরকম না, এলজিইডির রাস্তা পাকা। মূলত ফিডার রোডস হচ্ছে প্রথম গ্রামের সঙ্গে শহরের সংযুক্তির পাকা রাস্তা। এর মাধ্যমে প্রথম কানেক্টিভিটি বিপ্লবের ভিত্তিটা তৈরি হলো নব্বইয়ের দশকে। ফলে মানুষের চলাচল বেড়ে গেল, সঙ্গে কর্মকান্ড বৃদ্ধি পেল। তারা ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে কিছু তৈরি করে সেটা বিক্রি করতে নিকটস্থ শহরে গেল, কৃষক তার উৎপাদিত শস্য শহরে পাঠানোর সুযোগ পেল। মানুষ রেমিট্যান্সের জন্য শহরে যেতে শুরু করল, শিক্ষা অর্জনের জন্য শহরে পাঠাল সন্তানকে। কানেক্টিভিটির যে বিপ্লব শুরু হলো সেখানে ফিডার রোডস হচ্ছে প্রথম রূপক। এরপর ৯৬-৯৭ থেকে দ্বিতীয় বিপ্লবটা শুরু হলো। দ্বিতীয় বিপ্লবটা হলো মোবাইল ফোনের মাধ্যমে। গ্রামীণের মাধ্যমে মোবাইল ফোন এলো। সেটাই মূলত দ্বিতীয় কানেক্টিভিটি বিপ্লবটা শুরু করল। এখানে একটা হচ্ছে ফিজিক্যাল আরেকটা হচ্ছে ডিজিটাল। এই দুইটা বিপ্লবের ফলে সমাজের মধ্যে কানেক্টিভিটি বিশালভাবে বেড়ে গেল। যাতায়াত, যোগাযোগসহ নানাভাবে নানামুখী পরিবর্তন সমাজে সবখানে সার্বিকভাবে হলো।
যোগাযোগের মাধ্যমে বহুকিছুর সম্ভাবনা তৈরি হয়। সেই সম্ভাবনাগুলোর প্রভাবে নব্বই দশক থেকে ব্যক্তি খাতের বিকাশে একটা উল্লম্ফন ঘটল। প্রাইভেট সেক্টর হলো, ব্যাংক হলো, গার্মেন্টসের ব্যাপক বুম শুরু হলো এবং অন্যান্য ব্যক্তি খাতের বিকাশটাও ব্যাপকভাবে শুরু হয়ে গেল। ফলে আমাদের অর্থনীতির মধ্যে একটা নতুন ধরনের ধারা শুরু হলো। এটা কেন হলো? কারণ যে অর্থনৈতিক মডেলে ব্যক্তিত্বের ও আকাক্সক্ষার বিপ্লব ঘটল, তার অভিঘাতে অর্থনীতিতে রাষ্ট্র তার আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে পুনঃচিন্তার অবকাশ পেল। নব্বই দশকের প্রথম দিকেই রাজনীতিতেও তার প্রভাব দেখা গেল। আওয়ামী লীগ, বিএনপি সবার মধ্যে একটা চেতনাবোধ তৈরি হলো যে, বাজার অর্থনীতিটাই হবে মূল। মোটা দাগে বাজার অর্থনীতি নিয়েই যে এগোতে হবে সেটা রাজনৈতিক বিবেচনাতে চলে আসে। এটার ফলে ব্যক্তি খাতগুলো সামনে চলে এলো। এটা হয়েছে যোগাযোগ সক্ষমতার কারণে।
একই সঙ্গে নব্বই দশকের প্রথম থেকে আবার আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা এবং মাধ্যমিক শিক্ষার একটা বিস্তার ঘটল। নব্বই দশকে বিশেষ করে একটা মডেল এলো এমপিও সিস্টেম। সেখানে রাষ্ট্র শিক্ষকদের বেতনের একটা অংশ দেবে আর বাকিটা কমিউনিটি লেভেল থেকে আসবে। এভাবে মাধ্যমিক শিক্ষার একটা বড় বিস্তার ঘটল। এর প্রতিক্রিয়ায় বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা তৈরির পথ হলো। এটা খুব বেশি স্কিলড কিছু না, তবু সামাজিকভাবে এগুলো কাজ করল।
আরেকটা বড় ধরনের পরিবর্তন এলো কৃষিতে। আগে আধুনিক কৃষি ছিল না। সত্তর-আশির দশকে আধুনিক কৃষি শুরু হলো। কিন্তু আশির দশকের শেষ থেকে সেই ব্যক্তি খাত ভিত্তির কৃষির বিকাশটা আরও বড় ধরনের উদ্যোগে গেল। সেখানে আমাদের কৃষিবিজ্ঞানীরা দারুণ ভূমিকা রেখেছেন। আগে আমলাতান্ত্রিক একটা নিয়ন্ত্রণ ছিল সেচের ওপর। এসব আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই উঠে গেল এবং কৃষিরও একটা ভালো বিকাশ শুরু হয়ে গেল। এটা এখনো অব্যাহত আছে। এক সময় ভাবা হচ্ছিল যে, ক্ষুদ্র কৃষকরা সময়ে হারিয়ে যাবে। কিন্তু দেখা গেল যে, গ্রামাঞ্চলের ক্ষুদ্র কৃষকরাও পরিবর্তনের অন্যতম কারিগর হিসেবে এলো। ছোট ছোট প্লটেও নানাভাবে নানা উপায়ে ফলন শুরু করল। আবার কৃষির ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু কৃষকের অবস্থা ততটা বদল হয়নি। কৃষির বাণিজ্যিককরণের সার্বিক সুবিধাগুলো কৃষকের হাতে বেশি আসেনি। এখানে কৃষিতে অনেক গ্রুপ দাঁড়িয়ে গেছে তারাই সেই সুবিধাগুলো পাচ্ছে। এসবের পাশাপাশি রাষ্ট্র সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো নানাভাবে বাড়াল। সুতরাং যোগাযোগ খাতে অবকাঠামোগত এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন একটা পরিবর্তন নিয়ে এলো।
আশির দশকের দিকে শুরু হওয়া মানুষের আকাক্সক্ষা এবং ব্যক্তিত্বের বিপ্লবটা নব্বইয়ের দশকেও চলতে থাকে। তবে গত এক দশকে এরও একটা দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন সূচিত হয়। এখানে আরেকটা বিষয় আমাদের দেখতে হবে যে রাষ্ট্র সমাজের বিকাশের ধারাগুলো কীভাবে দেখছে। সত্তর-আশির দশকের দিকে ব্যক্তি খাতের সুযোগগুলো রাষ্ট্রকেই করে দিতে হয়েছে। কারণ রাষ্ট্রের হাতে পর্যাপ্ত সম্পদ ছিল না আবার আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের ধারণাটাও আস্তে আস্তে দুর্বল হতে থাকে। নব্বই এবং পরের দশকে ব্যক্তি খাত এবং সামাজিক ও নানামুখী উদ্যোগে রাষ্ট্রের একটা সহায়ক ভূমিকা ছিল। রাষ্ট্র তখন নিয়ন্ত্রণের ধারণায় ছিল না বরং রাষ্ট্র এই বিষয়টা হচ্ছে হোক, হতে থাকুক এ ধরনের মনোভাব দেখিয়েছে। এই সময়টায় এক অর্থে প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতির একটা বাস্তবতা ছিল। ফলে রাষ্ট্র ব্যক্তিত্বের এবং আকাক্সক্ষার বিকাশে এক ধরনের সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে। অর্থনীতিও ছিল প্রতিযোগিতামূলক অর্থাৎ যে ভালো করে কাজ করে আগাতে পারে তাকে বাধা বা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টা সেভাবে ছিল না। তবে গত এক দশকে এই জায়গায় একটা পরিবর্তন এসেছে। রাষ্ট্রের মনোযোগ চলে গেছে অর্থনীতির দিকে। এই দশকে প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতি অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে আবার প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির বিষয়টাও পিছিয়ে পড়ে গেছে। এখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় সম্পৃক্ত কিছু গোষ্ঠী অনেক বেশি সুবিধার জায়গা তৈরি করেছে এবং এক ধরনের মনোপলির বাস্তবতাও দাঁড়িয়েছে। আশি-নব্বইয়ের দশকে প্রায়ই চাঁদাবাজির কথা শোনা যেত। কিন্তু তার জন্য আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন এবং প্রবৃদ্ধি আটকে থাকেনি। এখন চাঁদাবাজি বা দুর্নীতি অনেকটা কাঠামোগত হয়ে গেছে।
কিন্তু দেখতে হবে সাধারণ মানুষের এগিয়ে যাওয়ার যে অদম্য স্পৃহা এটা কিন্তু ধসে পড়েনি। সহায়ক পরিবেশে সে দ্রুত এগিয়েছে, প্রতিকূল পরিবেশে তাকে আগানোর জন্য কষ্ট করতে হচ্ছে। যেমন নতুন কোম্পানি তৈরির প্রবণতা কমেছে, কেননা উচ্চমহলের সঙ্গে যোগসাজোশ ছাড়া এটা হচ্ছে না। তবে মানুষের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে অর্থাৎ স্পৃহা এখনো চলছে।
আরেকটা বিষয় এখানে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও তার বিভিন্ন পর্ব। মূলত আমরা সস্তা শ্রমভিত্তিক এক ধরনের অর্থনৈতিক পরিবর্তন করেছি। এখন সস্তা শ্রম থেকে উৎপাদনশীল শ্রমে যদি যেতে হয় তাহলে দুটো জায়গায় বড় ধরনের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ এবং চিন্তার ও নীতির পরিবর্তন প্রয়োজন। একটা হচ্ছে মানবসম্পদ উন্নয়নে আমাদের চাওয়া কী সেটা। কারণ সস্তা শ্রম থেকে আমরা যদি দক্ষতা নির্ভর শ্রমে যেতে চাই তাহলে ওগুলো ঠিক করতে হবে। কেননা মানবসম্পদকে উন্নত করতে হবে। আরেকটা হচ্ছে যে, শ্রমিকদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্বটা দেখা। এখানে দেখা যায়, অত্যন্ত নিপীড়নমূলক একটা মনোভাব রয়েছে যেখানে শ্রমিক অসন্তোষ ঘটছে, সেখানেই অনেকটা নিয়ন্ত্রণ বা দমনমূলক একটা নীতি দিয়ে তার মোকাবিলা করা হচ্ছে। এখানে রাষ্ট্র অনেকটাই মালিকদের পক্ষে। যদিও মালিকপক্ষে থাকা খুব বেশি ভুল নয়, তবে যৌক্তিকভাবে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিগুলো পূরণ করলে সস্তা শ্রম থেকে উৎপাদনশীল জায়গায় যাওয়ার পথ তৈরি হয়। কিন্তু সেখানে রাষ্ট্র একটা নিপীড়নমূলক অবস্থান নিয়েছে।
মানবসম্পদ উন্নয়নের অন্যতম বিষয় হচ্ছে, শিক্ষা খাতের গভার্নেন্স বা সুনীতিচর্চা। শিক্ষা খাতের গভার্নেন্স আবার কী? শিক্ষা খাতের অতি আমলাতান্ত্রিককরণ হয়েছে। মূলত শিক্ষা প্রশাসক রয়েছে ড্রাইভিং সিটে, শিক্ষকরা ড্রাইভিং সিটে নেই। তারা নানাভাবে নানা ধরনের এক্সপেরিমেন্ট করে, এটা করে, সেটা করে। আরেকটা হচ্ছে এক ধরনের মানভিত্তিক বিস্তারের বদলে এখানেও স্বজন তোষণের একটা বিষয় ঘটছে। যেমন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি বাড়ছেই। কিন্তু ওখানে দেখা যাবে যে বহু প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি আছে যেগুলো জাস্ট সার্টিফিকেট বিক্রির একটা কারখানা। সুতরাং মানবসম্পদ উন্নয়নের জায়গায় কিন্তু আমরা এক রকমের আটকে রয়েছি। এবং এর কিছু বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাচ্ছি। একটা হচ্ছে শিক্ষিত তরুণদের বিদেশ চলে যাওয়ার প্রবণতাটা অসম্ভব বেড়ে গেছে, কেউ এখানে থাকতে চাচ্ছে না। এটা এক ধরনের ইনডাইরেক্ট ইন্ডিকেটর। দ্বিতীয়ত হচ্ছে যে, আমাদের এত বেকারত্ব থাকা সত্ত্বেও এবং উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার পরও এখানেও অনেকে বিদেশ থেকে এসে মাঝারি এবং ওপরের দিকের চাকরিগুলো তাদের আয়ত্তে নিচ্ছে। আরও একটা বিষয়, আমাদের একটা রাজনৈতিক এপ্রোচ হয়েছে যে, নিম্নমানের শিক্ষার সার্বিক বিস্তার। দেখা যাচ্ছে যে গ্রামে গ্রামে শুধু স্কুল নয় বরং কলেজ, ইউনিভার্সিটি হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষক নেই, অন্যান্য সুবিধা নেই। তা ছাড়া ঢাকা ইউনিভার্সিটিসহ অন্যান্য বড় বড় ইউনিভার্সিটি যেগুলো আছে, সেগুলোর বিষয়েও পুনঃচিন্তার সুযোগ রয়েছে। বলতে চাচ্ছি যে মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষা খাতে সুশাসন অন্যতম একটা বিষয়। এখানে কোনগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে, মেধাকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে কিনা, এসব লক্ষণীয়। সার্বিকভাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, অতি আমলাতান্ত্রিকীকরণের অনেক উদাহরণ রয়েছে। তার একটা হচ্ছে বিসিএসকে এমন লোভনীয় করে তোলা হয়েছে যে, সোনার হরিণ পাওয়ার মতো। কিন্তু বিসিএসে কতজনকে দিতে পারবে? কেন সবাই প্রশাসক হতে চাইবে? কেননা প্রশাসকরাই ড্রাইভিং সিটে। এটা গত এক দশকে সবচেয়ে বেশি হয়েছে। এটা থেকে আমরা একটা সিগন্যাল পাচ্ছি যে, সমাজে প্রশাসক হচ্ছে সবচেয়ে লুকরেটিভ জব। এটা সার্বিকভাবে অর্থনীতি ব্যবস্থাপনার একটা আমলাতান্ত্রিকীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নব্বই থেকে শুরু করে দুই হাজারের দশকে আসলে আমাদের এক ধরনের মৌলিক পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। যার কারণে আমাদের নানারকম বিস্তার ঘটছে জনসংখ্যা বাড়ছে, অর্থনীতি বড় হচ্ছে। কিন্তু সস্তা শ্রমের অর্থনীতি থেকে যাচ্ছে এবং আমাদের অর্থনীতি খাতওয়ারি বাড়ছে না। এখনো মাত্র দুই-তিনটা খাতই আমাদের আয়ের মূল উৎস। এর মধ্যেও আবার বলব মানুষের অদম্য চেষ্টাও থেমে নাই। তার ফলে অর্থনীতি টিকে থাকছে, ধসে পড়ছে না এবং অব্যাহত থাকছে। কিন্তু সমাজ কিসের ওপর টিকে থাকছে, যেখানে সবকিছুতে অবনমন ঘটছে।
অর্থনীতিতে ফাইট দেওয়া যতটুকু সম্ভব, সমাজের ক্ষেত্রে সেটা মোর ডিফিকাল্ট। কারণ সমাজে নিয়ন্ত্রণটা অনেক বেড়ে গেছে। এখন গ্রামাঞ্চলে পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সংস্থার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে আমাদের সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেগুলো ছিল সেগুলো কাজ করছে না। যেমন সমাজ ছিল, মসজিদ কমিটি ছিল, স্কুল কমিটি ইত্যাদির মধ্যে দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। ফলে একটা শ্রেণি, বিশেষ করে তরুণ সমাজের মনোভাব যদি দেখি তাদের বৃহৎ অংশ এখানে ভবিষ্যৎ দেখছে না। যারা বিসিএস ক্যাডার হয়ে যেতে পারে তাদের জন্য স্বস্তি, যারা অর্থনৈতিক সুবিধার ভেতর তাদের জন্যও খুব আরাম, কিন্তু বৃহত্তর সাধারণ তরুণ যারা রয়েছে তারা ডেসপারেট যে কীভাবে দেশত্যাগ করা যায় এবং তারা অব্যাহতভাবে সে চেষ্টা করে যাচ্ছে।
লেখক : সমাজবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদ
অনুলিখন: মোজাম্মেল হক হৃদয়