আড্ডা বিনোদন

বিনোদনের হতদরিদ্র শহর ঢাকা

ঢাকা শহরের বিনোদন ও আমোদ-প্রমোদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আমরা নানা কারণে কম কথা বলি। এর মানে এই নয় যে, এই শহরে বিনোদনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে অথবা আমোদ-প্রমোদের খরা চলছে। অন্তত ৪০০ বছরের পুরনো এই শহরের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের পাশাপাশি বিনোদনেরও এক বিশেষ ঐতিহ্য রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ধারার ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, যোগ হয়েছে নতুন নতুন বিনোদন উপকরণ। কিন্তু আমরা কি জোর গলায় বলতে পারি, এই শহর একটি সত্যি সত্যিই মেট্রোপলিটন শহর এবং এখানে নাগরিকরা অনেক উদার ও সহনশীল জীবনযাপন করছেন? বরং হয়েছে উল্টোটি। বিনোদনের পরিবেশ, মান ও ক্ষেত্র অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে।

ইংরেজিতে চিত্তবিনোদন বা আমোদ-প্রমোদের পৃথক অর্থ রয়েছে। একটি হলো  Entertainment  আর অপরটি  Recreation। পরিশ্রমের পরে আমরা ক্লান্তিভাব দূর করার জন্য এবং শরীর ও মনে প্রশান্তি আনার জন্য ব্যক্তিগতভাবে যা করি তা হলো চিত্তবিনোদন। বই পড়া, ভ্রমণ করা, গান শোনা, কফি শপে বসে কফি পান করা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া হলো Recreation বা চিত্তবিনোদন। অপরদিকে, Entertainment-এর মানে হলো মনোরঞ্জন বা আমোদ-প্রমোদে মগ্ন হওয়া। এখানে দুটি পক্ষ আছে একপক্ষ হলো দর্শক আর অপর পক্ষ হলো যারা দর্শকদের আনন্দ দেন, তারা। ফলে Concert, মঞ্চনাটক, মঞ্চ কৌতুক, সিনেমা বা নাচের আসর হলো আমোদ-প্রমোদের জায়গা। বাংলা ভাষায় সাধারণভাবে আমরা ধরে নেই, যা কিছু আমাদের আনন্দিত করে তাই বিনোদন বা আমোদ-প্রমোদের অনুষঙ্গ। আমাদের শরীর ও মনের ওপর বিনোদনের ইতিবাচক প্রভাব অনেক।

বিনোদনের কারণে শরীরে নানা রকম হ্যাপি হরমোন, যেমন ডোপামিন, সেরোটনিন, অক্সিটোসিন, এন্ডারফিন ইত্যাদি তৈরি হয়। এসবের অভাব ঘটলে মানসিক অবসাদ, একাকিত্ব, সহিংসতা এমনকি আত্মহত্যার প্রবণতা সৃষ্টি হতে পারে। করোনাকালে আমাদের মধ্যে কেউ কেউ বাড়ি-বন্দি হয়ে মানসিক উদ্বেগের শিকার হয়েছিলেন, তারা বাড়ি থেকে বের হতেও ভয় পেতেন। আড্ডা আমাদের ভালো থাকতে সাহায্য করে আর পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল করে তোলে। আর এই ভালো থাকার ওপর নির্ভর করে মেধা, মনন, দক্ষতা, সৃজনশীলতা মনোসংযোগ ইত্যাদি বিষয়। আমাদের বিউটি বোর্ডিং আর ওপারের কফি হাউজের আড্ডা যে কত জনপ্রিয় ও খ্যাতিমান লেখক-কবি, চিত্রকর ও গায়ক তৈরি করেছে তা আমরা কমবেশি জানি।

আমরা জানি ঢাকা শহরে অন্তত ২ কোটি ৩০ লাখ লোকের বাস। একটি পরিবারের গড় সদস্য চারজন হলে ঢাকায় ৫০ লাখেরও বেশি পরিবার বাস করে। বেশির ভাগ পরিবারে একজন চাকরি করলেও অনেক পরিবারেই স্বামী-স্ত্রী দুজনই কাজ করেন। অনেকে ছাত্র পড়িয়ে, নানা রকম ছোটখাটো ব্যবসা করে, দোকান-ফার্মেসি ইত্যাদি খুলে জীবিকা নির্বাহ করছেন। শুধু পোশাক শিল্পেই কাজ করছেন প্রায় ৪০ লাখ মানুষ। এদের মধ্যে ভালো বেতনভুক কর্মচারী, যেমন- ম্যানেজার, ফ্লোর ম্যানেজার, মার্চেন্ডাইজার, ব্যাংকের কর্মচারী, সংবাদপত্র কর্মী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, কবি-সাহিত্যিক-চিত্রকর এদের সংখ্যা নিতান্তই কম নয়। শিক্ষিত হওয়ার কারণে এদের চিত্তবিনোদন বা আমোদ-প্রমোদের ধরনও একটু ভিন্ন। গত বছরের খানা জরিপের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে পরিবারপ্রতি মাসিক আয় ২০২২ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২,৪২২ টাকায়, যা ২০১৬ সালে ছিল ১৫,৯৮৮ টাকা । এটি হলো গড় মাসিক আয় এবং স্বভাবতই শহরগুলোতে আয় ও ব্যয়ের পরিমাণও বেশি। শহরগুলোতে আয় দেখানো হয়েছে ৪৫,৭৫৭ টাকা। মজার বিষয় হলো, মানুষ এখন খাদ্যপণ্য (৪৫.৮০ শতাংশ) থেকে বেশি অর্থ ব্যয় করছে খাদ্য নয় এমন পণ্যের ওপর (৫৪.২০ শতাংশ) । 

বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি আর তার মধ্যে ১৫ বছর থেকে ৫৯ বছর পর্যন্ত কর্মক্ষম লোকের সংখ্যা ১০ কোটি ৫০ লাখ (৬২ শতাংশ)। ঢাকায় যদি ৫০ শতাংশ মানুষও কর্মক্ষম থাকেন তবে তাদের সংখ্যা এক কোটিরও ওপর।

ঢাকাই বিনোদনের ইতিহাস

চারশ বছরের পুরনো এই শহরের বিনোদনের এক বিশাল ঐতিহ্য রয়েছে। মোগল আমলের আগেও ঢাকায় মোরগ লড়াই, গান-বাজনা ও আরও কিছু খেলাধুলার প্রচলন ছিল। তবে নবাবদের সময়ে গান-বাজনা ও আসরকেন্দ্রিক বিনোদনের মাত্রা বেড়ে যেতে থাকে। ইতিহাসে দেখা যায়, নবাবরা নাচ-গানের বিষয়ে অত্যন্ত সমঝতার ছিলেন। সে সময় লক্ষ্ণৌ থেকে নতর্কীরা (কাঞ্চনী) আসতেন বাংলায়। কারণ, নবাবরা তাদের অনেক মাসোহারা দিতেন। আর সাধারণ মানুষও রাগ সংগীতের প্রতি বিশেষ অনুরক্ত ছিলেন। অন্তত ১,২০০ জন কাঞ্চনী পুরনো ঢাকায় অবস্থান করতেন, যারা মাসিক বেতনভুক ছিলেন বলে জানা যায়। ইতিহাসবিদ হাকিম হাবিবুর রহমান তার ঢাকা পঞ্চাশ বছর আগে (ঢাকা পাচাশ্ বারস্ পাহেলে) বইটিতে লিখেছেন, নবাবপুরে নবাববাড়ির বাইরেও অনেক বৈঠকখানা ছিল যেগুলোতে সাধারণ মানুষেরও প্রবেশাধিকার ছিল। তিনি বলছেন : এটা ওই সময়ের কথা যখন সব হিন্দুস্তানের নামিদামি গায়ক, রবাব (বিশেষ বীণা বাদক) এবং সেতার বাদক মার্যাদা লাভের আশায় এখানে বারংবার আসতেন, বছরের পর বছর এখানে থাকতেন এবং ঢাকার অনুরাগী হয়ে পড়তেন যে, মিঠন খানের (সে সময়কার লক্ষ্ণৌ-এর বিখ্যাত গায়ক) মতো সারা জীবনের জন্য এখানেই রয়ে যেতেনৃ।

বিনোদন চা পানে

আমরা জানি যে ব্রিটিশ শাসকরা বিনে পয়সায় বাঙালিদের মধ্যে চা বিতরণ করতেন যাতে করে পরবর্তী সময় এই পানীয়টি একটি লোভনীয় বাণিজ্যে পরিণত হয়। ‘ঢাকাই খাবার ও খাদ্যসংস্কৃতি’ বইয়ে সাদ উর রহমান জানাচ্ছেন, ‘১৯১৫ সালে কলকাতায় চায়ের দোকান ছিল ৪৪৪টি, যা পরের বছর শেষ নাগাদ বেড়ে দাঁড়ায় ১,১২৪টিতে। তিনি আরও লিখেছেন : ১৯১৮ সালে শুরু আর ১৯২০ সালের জুলাই নাগাদ ভারত জুড়ে ৭,০০০ দোকানে প্যাকেটে চা বিক্রি শুরু হয়। একই সময়ে টি চেজ কমিটি ৭০ লাখ ইনভেলাপ প্যাকেট সরবরাহ করে।’ এই বাংলায় তো প্রবাদই আছে ‘চায়ের কাপে ঝড় তুলে’ গল্প চালিয়ে যেতেন আড্ডাবাজরা! চা ও হুক্কার ব্যবহার ছিল ব্যাপক। ঢাকায় কাশ্মীরি চায়ের প্রচলন সম্পর্কে হাকিম হাবিবুর রহমান বলছেন : ‘বিশেষত নিমকিন (নোনতা) কাশ্মীরি চা-এর স্বাদই ছিল আশ্চর্য ধরনের। এক ধরনের চা বিয়েশাদিতে পান করানো হতো, যাকে ‘গোলাম্নেবাদ’ বলা হতো। সঠিক শব্দ সম্ভবত হচ্ছে ‘গোলাব বানাত’, মূলত এটি ছিল শরবত, যা বিবাহের মাহফিলে পান করানো হতো।”

পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি, বড় বড় রেলস্টেশনে কয়লার আগুনে গরুর দুধের চা কীভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠল। বড় বড় রেল জংশন যেমন, পার্বতীপর, ঈশ্বরদী, যশোহর, চট্টগ্রাম এসব স্টেশনে দিনে একবার চা না পান করলে আমাদের অনেকেরই দিন যেন ‘রসকষহীন’ মনে হতো। আর ওই সব রেলস্টেশনে বইয়ের দোকানকে ঘিরে প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ ছাত্রদের এক নৈমিত্তিক অথচ সৃষ্টিশীল আড্ডা জমে উঠত। এগুলো ছিল আমাদের বিনোদনের বিশেষ উদ্দীপকের মতো।

ঢাকার বিউটি বোর্ডিং

ঢাকায় উদীয়মান কবি-সাহিত্যিক, চিত্রকর, শিল্পী, ভাস্কর ও সাংবাদিকরা ঐতিহাসিক বিউটি বোর্ডিং রেস্তোরাঁয় আড্ডার মাধ্যমে বিনোদিত হতেন বলে একাধিক বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। সদরঘাটের কাছে বাংলাবাজারের বিউটি বোর্ডিং রেস্তোরাঁয় নানামুখী সৃজনশীল ও মননশীল আড্ডায় মেতে উঠতেন। ‘আমার ঢাকা আমাদের ঢাকা’ (নজরুল ইসলাম ও কাজী মদিনা সম্পাদিত) বইয়ে লেখক আখতার হোসন আড্ডা বিষয়ক এক প্রবন্ধে বলছেন, সকাল ১০টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চলত সে আড্ডা। বাংলাদেশের প্রথিতযশা কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ বিভিন্ন স্তরের লোক বিউটি বোর্ডিং ঘিরে আড্ডায় অংশগ্রহণ করতেন। ‘কবি শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, আব্দুল গাফ্্ফার চৌধুরীসহ তৎকালীন বহু তরুণ আড্ডায় মাতোয়ারা হয়ে যেতেন সেখানে। বিউটি বোর্ডিং ছাড়া সমসাময়িক ক্যাপিটাল রেস্টুরেন্টেও আড্ডা হতো। পরবর্তী সময় একই ধরনের সৃজনশীল আড্ডা অন্যান্য রেস্তেরাঁয় বিশেষত গুলিস্তানের রেক্স, নিউমার্কেট ও ঢাকা কলেজের কাছে চিটাগাং হোটেলে কবি-সাহিত্যিকদের আড্ডা চলত। পরে ৭০-এর দশকের মধ্যভাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে হাকিম মিয়া ও শরীফ মিয়ার ছাপড়ায় সকাল থেকে রাত অবধি চলত আড্ডা। আর মধুর ক্যান্টিন ছিল মূল রাজনৈতিক আড্ডার সূতিকাগার। এরপর আজিজ সুপার মার্কেটে (স্টেডিয়াম মার্কেটের ম্যারিয়েটা গ্রন্থ বিপণি বন্ধের পর) আড্ডা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যায়। এ ছাড়াও বেইলি রোডের নাটকপাড়া ও শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ঢাকার আড্ডার রেশ কিছুটা রয়ে গেছে।

বিনোদন ও আড্ডার জনপ্রিয় স্থান

আগে যেসব স্থানে আড্ডা হতো, এখন নানা কারণে তা পরিবর্তিত হয়েছে। আগে চৌরাস্তার মোড়ে চায়ের দোকান, স্টেশনের চায়ের দোকান, ক্লাব ঘর, পুরনো দিনে খেয়াঘাট, রেস্তোরাঁ, সিনেমা হলের আশপাশে, স্টেশনের বুকস্টলে আড্ডা জমে উঠত। এ ছাড়া লাইসেন্সপ্রাপ্ত বার ও দেশি কেরু কোম্পানির পানীয় বিক্রয়ের ঘুপড়ি, অনুমোদনবিহীন আরও কিছু স্থান আমোদ-ফুর্তির বা বিনোদনের জন্য জনপ্রিয় ছিল। পুরনো দিনে হোমিও ডাক্তার খানা, ধনী ব্যক্তির বৈঠক ঘর ইত্যাদি ছিল আড্ডা দেওয়ার মোক্ষম স্থান। এখন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর খোলা নাটমঞ্চ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষককেন্দ্র, ফেব্রুয়ারি মাসের বইমেলা, শীতকালীন গানের আসর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বর, মধু দার ক্যান্টিন, শিল্পকলা একাডেমি, বেঙ্গল শিল্পালয় এবং দৃক গ্যালারি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষয়িষ্ণু আড্ডার অন্যতম স্থান দখল করে আছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিলিয়ার্ড ও বোওলিং ক্লাব, যেখানে তরুণ প্রজন্ম বিশেষত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের আনাগোনা বেশি।

মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তের আড্ডা

বিনোদন যেমন একদিকে একটি যূথবদ্ধ বিষয়, পাশাপাশি অন্যদিকে এটি নাগরিকের ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যকেও মর্যাদা দেয়। অনেকে ক্লাবে গিয়ে আড্ডা দিতে পছন্দ করেন। দি ইকোনমিস্ট পত্রিকা গত বছরের ২১ জুলাইয়ে এক প্রতিবেদনে বলছে, অ্যালকোহলিক পানীয়ের বিষয়ে সরকার ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে নতুন নিয়ম কার্যকর করেছে। ইকোনমিস্ট বলছে, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বিদেশিদের মানবিক কর্মী থেকে শুরু করে অবকাঠামো প্রকল্পে পরিশ্রমী চীনা শ্রমিকদের দিকে নজর রেখে সরকার নতুন আইনটি করেছে। এই আইন অনুযায়ী পানশালা কর্র্তৃপক্ষ তাদের স্টকের ৬০ শতাংশ দেশের দুটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত উৎপাদকের কাছ থেকে অ্যালকোহলিক পানীয় কিনবে। এ দুটি দেশি প্রতিষ্ঠান হলো যমুনা গ্রুপ, যা হান্টার, বাংলাদেশের একমাত্র দেশীয় বিয়ার তৈরি করে এবং কেরু অ্যান্ড কোম্পানি, যা একটি রাষ্ট্র পরিচালিত প্রতিষ্ঠান, যারা গোল্ড রিব্যান্ড জিন, ওল্ড রাম এবং ইম্পেরিয়াল হুইস্কি উৎপাদন করে। কেরু অ্যান্ড কোম্পানি তাদের পানীয় বিক্রি করে ২০১৯-২০ সালে ১৫৬ কোটি টাকা এবং পরবর্তী অর্থবছরে ১৯৫ কোটি টাকা আয় করেছে। তবে ঢাকা শহরে ঠিক কতটি বার বা পানশালা রয়েছে তার সঠিক হিসেব পাওয়া কষ্টসাধ্য। এসব পানশালায় যে মূল্যে পানীয় কিনতে হয়, তা অনেকেরই নাগালের মধ্যে নেই। এক অসমর্থিত সূত্র থেকে জানা যায়, ঢাকা শহরে অন্তত ৭০টির মতো বার রয়েছে। ঢাকা শহরের অনেক প্রাইভেট গেস্ট হাউজেও অ্যালকোহল পাওয়া যায় বলে জানা যায়। তবে এ বিষয়ে কেউ কথা বলতে চান না। আর বেশির ভাগ খদ্দেরকে অ্যালকোহল পানের জন্য বিশেষ লাইসেন্স নিতে হয়। অতিরিক্ত মূল্যের কারণে লোকজন অনুমতি নেই এমন স্থান থেকে স্বল্পমূল্যের বিষাক্ত অ্যালকোহল পান করে মৃত্যুবরণ করেন অথবা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। মোদ্দা কথা, কিছু মানুষের আয় রোজগার বেড়ে যাওয়ার কারণে এবং বিশ্বায়নের সংস্কৃতির পালে পরিবর্তনের যে ঢেউ তৈরি হয়েছে তাতে অনেক নাগরিকই এখন পানশালামুখী হচ্ছেন। তবে নানাবিধ সীমাবদ্ধতার কারণে এসব স্থানে বসে ইচ্ছা থাকলেও অনেকের পক্ষে আড্ডা দেওয়া সম্ভব নয়। 

প্রথাগত আড্ডা কি হারিয়ে যাচ্ছে?

নতুন নতুন স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়া এবং অফিস-ফ্যাক্টরিতে বাড়তি কাজের চাপে আমাদের হাজার হাজার বছরের পুরনো যূথবদ্ধ জীবনের আড্ডাকেন্দ্রিক বিনোদন কমে আসছে। বন্ধুরা পাশাপাশি বসে সবাই মোবাইল ফোনের দিকে তাকিয়ে থেকে কথা বলে। প্রয়োজনে অনেক সময় পাশে কাউকে পাওয়া যায় না। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, মোবাইল ফোনের নানাবিধ চাতুর্যপূর্ণ অ্যাপের কারণে আমরা সারাদিন বেশ কয়েক ঘণ্টা এই যন্ত্রটি নিয়েই ব্যস্ত থাকি। এতে আমাদের নানা ধরনের মানসিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে, যা মনোবিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছে। ভেবে দেখুন : আগে কিছু জায়গায় গিয়ে ভিডিও গেম খেলতে হতো। ধরুন আমি/আপনি মাত্র ঘণ্টা দুয়েক কোনো গেম সেন্টারে গিয়ে ভিডিও গেম খেলে আসতাম। এখন ভাবুন ওই যন্ত্রটি আমার সঙ্গেই থাকে আর আমি সকাল থেকে রাত অবধি নানা অজুহাতে তাতে (মোবাইল ফোন) খেলাধুলা করেই যাচ্ছি। আমাদের সন্তানদের হাতেও স্মার্টফোন ধরিয়ে দিয়েছি। গবেষকরা বলছেন, গ্যাজেটের অতিরিক্ত ব্যবহার আমাদের একনিষ্ঠ মনোযোগ মারাত্মকভাবে নষ্ট করে দেয়। আমরা আগে যেখানে বেশির ভাগ সময় বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন বা শিক্ষক-শিক্ষিকার বক্তৃতার প্রতি যে মনোযোগ দিতাম এখন সেখানে রহঃবৎসরঃঃবহঃ অর্থাৎ অনিয়মিত বা টুকরো-টুকরো মনোযোগ দেই। এতে করে পেশাগত ক্ষেত্রেও মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে সামনা-সামনি বসে আড্ডা দেওয়ার রেওয়াজ।

বিনোদনে নানা পক্ষের বৈরিতা

দুঃখজনক বিষয় হলো, নানা অজুহাতে, বিশেষ করে নিরাপত্তা ইস্যুতে ঢাকার আড্ডার জায়গাগুলোতে মাঝে মাঝে পুলিশি হয়রানি ও ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়, গণগ্রন্থাগারসহ আরও অনেক পাবলিক প্লেসে গেলে নানা রকম নোটিশ চোখে পড়ে, এই যেমন, এখানে বসা নিষেধ, এখানে প্রবেশ নিষেধ ইত্যাদি। শুধু এই কথাটি বলা বাকি ‘এদিকে তাকানো নিষেধ।’ অথচ, নব্বুইয়ের দশকেও এ বিষয়গুলো ছিল না। আগে দেখেছি সন্ধ্যায় নানা পেশাজীবীর লোকজন কাজকর্ম শেষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একটু আড্ডা দেওয়ার জন্য আসতেন। টিএসসির পাশে আয়োজন করা হতো পথনাটক কিংবা গান-কবিতার আসর। সে সময় অবশ্য স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছিল। যা হোক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কেউ কেউ হয়তো কিছু নেশা করতেন। কিন্তু এই স্থানটি সন্ধ্যার পর বন্ধ করে দেওয়া হয়। কবি মাকিদ হায়দার এক প্রবন্ধে (আড্ডা থেকে সঞ্চয়) বলছেন, ‘ঢাকা শহরের পরিধি বেড়েছে। সংকুচিত হয়েছে আড্ডা। তবে আজকাল শিল্প-সাহিত্যের আড্ডার চেয়ে দলবাজি বেড়েছে লক্ষণীয়ভাবে। বিভাজন সৃষ্টি শুরু হয়েছিল সেই ১৯৭৫ সালের পর থেকে, যার স্বরূপ প্রকট থেকে দিনকে দিন প্রকটতর হচ্ছে। লক্ষ করছি এ শতকের শুরুর ভাগ থেকেই, শিল্প-সাহিত্যের আড্ডা আজকাল নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, দলাদলি বিভাজনে। এবং একই সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কোনো কোনো কবি গল্প লেখক নাট্যকার সমাজের ওপর দিকে বিচরণ করছেন ঠিকই, তবে তারা শিল্পকে প্রাধান্য না দিয়ে কোথায় কে কীভাবে নিজের স্বার্থের দিকে লক্ষ রেখেই কেউ কেউ ধরছেন চেয়ার।’

আড্ডা চর্চার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে

আড্ডা সংস্কৃতির চর্চা প্রথমেই শুরু করতে হবে পরিবারে। পারিবারিক আড্ডার গুরুত্ব অপরিসীম। সম্ভব হলে দুপুর ও রাতে পরিবারের সব সদস্যকে একসঙ্গে খেতে বসা উচিত, টিভি দেখা উচিত। এতে করে বাবা-মা ও ছেলেমেয়েরা ভাব বিনিময় করার সুযোগ পায়। বাবা-মা এবং সন্তানরা পরস্পরের বন্ধু হয়ে ওঠে। এ বন্ধুত্ব জীবনকে সুন্দর করে তোলে। এ ধরনের পরিবারের সন্তানরা সফল হয়ে থাকে। কর্মক্ষেত্রেও সহকর্মীদের আড্ডা হলে তাদের মধ্যে হৃদ্যতা গড়ে ওঠে, টিম স্পিরিট ভালো হয় এবং কর্মক্ষেত্রে অনেক সমস্যা সমাধানের ধারণা আড্ডা থেকে উঠে আসে। মানুষজনকে সৃজনশীল, মননশীল ও মানসিকভাবে সুস্থ রাখার জন্য তাদের নির্মল আড্ডার সুযোগ করে দিতে হবে। বাড়াতে হবে আড্ডার পরিসর ও মাত্রা আর কমাতে হবে বিনোদনের ব্যয়।

লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক