ভার্চুয়াল সমাজ

মিমের সমাজ, মিমের সামাজিকতা

আর্থার সি ক্লার্ক একটা দুনিয়ার কল্পনা করেছিলেন। সেই দুনিয়ায় পৃথিবীর সমস্ত কৌতুক বা জোকস লিপিবদ্ধ থাকবে একটা বিশাল ডাটাবেজে। সেই ডাটাবেজ সবাই একলহমায় একসেস করতে পারবে। ক্লার্ক তার স্বভাবসুলভ সুগভীর রসিকতার মাধ্যমে দেখাচ্ছেন সেই যুগে কীভাবে মানুষ পরস্পরকে জোকস বলবে।

গোমরামুখো একজন মানুষ (নাকি অ্যান্ড্রয়েড? নাকি সাইবর্গ?) বাকি সবাইকে বলবে জোকস নম্বর ৪২১। বাকিরা একঝটকায় নিউরনের একটা অনুরণে টের পাবে জোকস নম্বর ৪২১ হচ্ছে সেই গল্পটা।

বাবা আর ছেলে পার্কে হাঁটতে গেছে। কয়েকজন মানুষ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে কী যেন খাচ্ছে। ছেলে জিজ্ঞাসা করে, বাবা ওরা কী খায়? চা। আমি চাইতে পারমু না, তুমি চাও।

এই হচ্ছে জোকস নম্বর ৪২১। এর উত্তরে, একই রকম গোমড়ামুখ করে থাকা স্রোতাদের কেউ কেউ ৫ তারকা দিয়ে জোকসটা খুবই পছন্দ হয়েছে বলে জানাবে। কেউ সাড়ে তিন, আবার কেউ কেউ (আমার মতো) শূন্য রেটিং দিয়ে বুঝায় দেবে এই জোকটা অতিমাত্রায় লেইম, ফালতু। এরপর, নেক্সট। আরেকজন বললেন, জোকস নম্বর ১৩, ২২, ৪৫৩। এন্ড দ্য শো গোজ অন এন্ড অন।

মিম নিয়ে লিখতে গিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম সেলিব্রিটি সায়েন্স ফিকশন লেখক ক্লার্কের উদাহরণ টেনে এ রকম একটা সূচনা দেওয়াতেও অনেকেই ইতিমধ্যেই নিশ্চয়ই এই লেখাকেও শূন্য রেটিং দেওয়া শুরু করেছেন। 

মিম কি তা সম্ভবত এই লেখার সকল পাঠকই জানেন না। যারা জানেন না, তাদের জন্য কিছু বোরিং সংজ্ঞা, কপি পেস্ট করে দিচ্ছি।

‘মিম’ শব্দটা এসেছে গ্রিক শব্দ ‘মিমেমা’ থেকে, যার অর্থ এমন কিছু, যাকে অনুকরণ করা হয়। ১৯৭৬ সালে বিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স তার সেলফিশ জিন বইয়ে ‘মিম’ শব্দের উল্লেখ করেন। ডকিন্স আবার পরিষ্কার করে বলেন, ‘মিম’ শব্দটির উচ্চারণ হবে ‘ক্রিম’ শব্দের মতো।

ডকিন্সের মতে, ‘মিম’ হচ্ছে এমন একটি ধারণা, আচরণ বা শৈলী, যা অনুকরণের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে সামাজিক রীতিনীতি, পরিবেশ, ঐতিহ্য ইত্যাদি ভূমিকা রাখে। আর যেসব ‘মিম’ উপযুক্ত পরিবেশ পায়, সেগুলো ছড়িয়ে পড়ে ও টিকে থাকে। অর্থাৎ, ডকিন্স জীবের সামাজিক বা সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ‘মিম’ শব্দটি ব্যবহার করেন।

কিন্তু ইন্টারনেট, বিশেষত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিপুল প্রসারে ‘মিম’ কেবল জীববিজ্ঞানে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় সামাজিক, বিশেষত সাংস্কৃতিক পাঠেও।

জীবের শরীরের জিনের মতো ইন্টারনেটে থাকা কনটেন্ট বা উপাদানের ছড়িয়ে পড়াকে একইভাবে ব্যাখ্যা দেওয়া যায়।

‘মিম’– বিশেষজ্ঞ মিশেল নোবেল ও কলনি ল্যাঙ্কাশায়েরের (২০০৭) মতে, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা ‘মিম’ শব্দটা ব্যবহার করেন এমন কিছু বোঝাতে, যাতে কোনো ‘নির্দিষ্ট ধারণা’ তথা কোনো লেখা, ছবি, ভাষা ‘মুভ’ অথবা অন্য কোনো ধরনের কৌশলে ছড়িয়ে যায়। আরেকজন বিশ্বখ্যাত ‘মিম’–বিশেষজ্ঞ লিমোর শিফম্যান বলেন, “ইন্টারনেটে এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তিতে ঠাট্টা, গুজব, ভিডিও, ছবি, লেখা ছড়িয়ে যায় আর এসব উপাদানকেই আমরা ‘মিম’ বলতে পারি।”

সহজ করে বললে, ‘মিম’ হচ্ছে এমন এক ধরনের কনটেন্ট, যা অন্য কনটেন্টকে হালকা পরিবর্তন করে বানানো হয়। সবচেয়ে প্রচলিত ও সহজবোধ্য ‘মিম’ হচ্ছে টেক্সট ওভার ইমেজ। সাধারণত পরিচিত কোনো একটা ছবির ওপর ভিন্ন ধরনের কথা দিয়ে এই ‘মিম’ বানানো হয়।

একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। গত বছর সিলেটি এক ভদ্রলোক, শাহীন নটির পোলাকে দরে ফ্যাল বলে নেটিজেনদের কাছে খুব বিখ্যাত হন। ভদ্রলোকের মুখভঙ্গি, শব্দচয়ন, সর্বোপরি দুজনকে জাপটে ধরে চোর ধরার সিনের রিক্রিয়েশন অনলাইন জগৎকে ভীষণ আমোদিত করে। ঘটনাটা এবং ডায়ালগটা ভাইরাল হয়। এরপর দেখা যায়, ওই লোকের ছবি কিংবা ডায়ালগটা জায়গায় জায়গায় বসিয়ে দেওয়া হয়। শাহীন দুর্নীতিবাজদের দরে ফ্যাল, শাহীন চোট্টা রেফারিরে দরে ফ্যাল, শাহীন বেইলি রোডে ঘুষ খেয়ে যারা বিল্ডিংয়ের অনুমোদন দিল তাদের দরে ফ্যাল। শয়ে শয়ে মিম তৈরি হয়ে গেল।

সেই ভাইরাল ডায়ালগ বা ছবিটা কিংবা কোনো ভিডিও হয়ে যায় টেমপ্লেট, আর এর থেকে তৈরি হয় অজস্র মিম। ঠিক যেন অক্ষর বা সংখ্যার মতো। আমরা যেমন অল্প কয়েকটা অক্ষর আর মাত্র দশটা সংখ্যা দিয়ে অসংখ্যা শব্দ এবং সংখ্যা বানাতে পারি তেমন।

অর্থাৎ, মিম জিনিসটা তৈরি করা খুবই সহজ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে একটা ক্লিকেই একটা মিম তৈরি হয়ে যায়। আর যেহেতু মোবাইল ফোনের কল্যাণে ইন্টারনেট এখন সত্যি সত্যিই হাতের মুঠোয়, ফলে তা দুনিয়াময় ছড়িয়ে দেওয়াও সেকেন্ডের ব্যাপার।

ফলত, যেই বার্তাটা ছড়াতে শত শত শব্দ লেখা লাগত, অনেক কষ্ট করতে হতো, মিম তা একেবারেই দূর করে দিচ্ছে। অন্যদিকে, যারা মিমগুলো দেখছেন, তাঁদেরও কষ্ট কমে যাচ্ছে। ঠিক যেন, জোকস নম্বর বলে গোটা দুনিয়াকে হাসানোর চেষ্টার মতো। নির্মাতা, গ্রহীতা উভয়েই মিনিমাল।

কিন্তু, এখানে একটা ব্যাপার আছে। আগের দিনে যেই যোগাযোগটা হতো শয়ে শয়ে শব্দে লেখায় কিংবা সামনাসামনি হয়ে হাজার হাজার বাক্য বলে, সেগুলো একটা মিমেই হয়তো বলা সম্ভব। কিন্তু এই ব্যাপারটা ক্লার্কের জোকস বলার মতো যান্ত্রিক নয়, বরং ভীষণ বুদ্ধিদীপ্ত।

মিমারকে নিশ্চিত করতে হয় যে, মিমটা বুদ্ধিদীপ্ত হতে হবে। যারা দেখবেন তাদের একটা ধাক্কা দিতে হবে। জোকস থিউরিতে বলা হয়, স্ট্রেস রিলিজ, সুপিরিওটি ইত্যাদি কাজ করলেও সবচেয়ে ভালো জোকসগুলা নির্মিত হয় ইনকনগ্রিউটির ওপর। অর্থাৎ এমন একটা সিচুয়েশন যার জন্য পাঠক প্রস্তুত নন। তাকে ধাক্কা দেওয়াটাই জোকসের স্বার্থক হয়ে উঠার পেছনে বড় কারণ।

এই ছোট লেখায় এসব বিশদ তত্ত্ব বিশ্লেষণের সুযোগ নাই, তেমনি এইটাও বলতে হয়, মিম মানেই রসিকতা না, বরং যোগাযোগের দারুণ এক মাধ্যম। মিম দিয়ে তীব্র ঘেন্না ছড়ানো যাইতে পারে, কঠোর রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া যাইতে পারে। কার্টুন মানেই যেমন কেবল হাস্যরস না, মিমও তেমনি। তবে, হাস্যরস যেহেতু যোগাযোগের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি, জোকসে যেহেতু ইনকনগ্রিউটির সুযোগ সবচেয়ে বেশি, ফলে বেশির ভাগ মিম আসলে হাস্যরস উৎপাদন করতে চায়।

আর কার্টুনের প্রসঙ্গে ছোট করে বলতে হয়, কেন নেটিজেনদের দুনিয়ায় এই সময়টাকে আমরা মিম সামাজিকতা বা মিমের আমল বলছি। কারণ, কার্টুন বা ফটোগ্রাফি দিনশেষে দক্ষ লোকদের কাজ। অনেক বছরের সাধনায় সেগুলোতে উৎকর্ষ সাধন করা যায়। মিম কোনো দক্ষতা দাবি করে না। সে একেবারেই আমজনতার।

আর মিমের আরেকটা শক্তি হচ্ছে এর অপূর্ণতা। প্রতিটি মিমার চেষ্টা করেন এই অপূর্ণতাকে পূরণ করতে। এবং তাত্ত্বিকভাবে বলতে গেলে, নতুন মিমটাও আরেকটা অপূর্ণ সৃষ্টি। ফলে, ক্রিয়েটিভ দক্ষতা দরকার না হলেও মিম এক ধরনের আগ্রহ উসকে দেয়, সামাজিকতার জায়গা থেকে এই প্যারাডাইস শিফট একই সঙ্গে মানুষের আদিসত্তা এবং আধুনিকতাকে ধারণ করে।

ইন্টারনেট, বিশেষত ফেসবুকের মতো মাধ্যম একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক। এখানে ব্যক্তি নিজেকে নানাভাবে প্রকাশে একান্ত একটা স্থান পান, যেটা তিনি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করেন। একই সঙ্গে তিনি বাকি নেটিজেনদের সঙ্গেও যুক্ত হতে চান। আদতে নিওলিবারেল (নব্য উদার) ব্যবস্থা আমাদের নানাভাবে এতে উদ্বুদ্ধ করে। এতে প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে শেখানো হয় এবং সামাজিক যূথবদ্ধতার গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া হয়। এতে একদিকে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি, অন্যদিকে চাইছি, আমাদের যেন মূল্যায়ন করা হয়। বাকিদের মনোযোগ কীভাবে আকর্ষণ করা যায়, সেটাই যেন আমাদের আকাক্সক্ষা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই ব্যবস্থায় ‘মিম’ খুব কার্যকর একটি হাতিয়ার।

ফলে, মিম একই সঙ্গে ভীষণ নিওলিবারেল আবার একই সঙ্গে ভীষণ কালেক্টিভ। আমরা যদি আগের দিনের সামাজিক আড্ডা আর সেখানকার নর্মগুলা মনে করে দেখি, তবে দেখব যে, মিম সেগুলো ধারণ করে। বন্ধুদের আড্ডায় একি সঙ্গে নিজের ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তোলা আবার সমষ্টির অংশ হয়ে যাওয়ার বাসনাকে সে পূরণ করে।

ফলত, মিম হচ্ছে প্রযুক্তির বিকাশে আমাদের পুরনো সামাজিকতার একটা দুর্দান্ত ধারক। ফরাসি দার্শনিক ব্রুনো লাতুর বিশদে দেখান, কীভাবে প্রযুক্তি আমাদের পরিবর্তন করে ফেলে। আমরা হয়তো কম্পিউটার আবিষ্কার করেছি, কিন্তু কম্পিউটারের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা, মোবাইলের দিকে অবিরাম তাকিয়ে থাকা আমাদের হাজার বছরের অভ্যাসও পরিবর্তন করে দিচ্ছে। লাতুর এঁকে দুই তরফের প্রভাব বলেই আখ্যা দেন। আবার এই লাতুরই, ‘উই হ্যাভ নেভার বিন মর্ডানে’ দেখান যে, নেচার থেকে কালচারকে আলাদা করার উপায় নেই। 

ক্লার্কের গল্পটা কিন্তু ভীষণ ডিপ্রেসিং। আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক দেওয়ার মতোই। একটা পরিচিত নম্বর মিলে গেলে হা হা কমেন্ট দিয়ে পরের জোকসে চলে যাওয়া। প্রাণহীন রোবটিক এক আড্ডা। টেকনোলজির উন্নয়নে ডায়াস্টোপিক এক ফিউচার সোশ্যাল চেঞ্জ।

মিমের সমাজ, মিমের সামাজিকতা কি সেদিকে ধাবিত হবে? নাকি প্রাণোচ্ছল বুদ্ধিদীপ্ত চর্চা চালিয়ে যাবে? প্রযুক্তির এ সময় দাঁড়িয়ে আমরা বড়জোর বলতে পারি, মিম বানায়ে কুল পাই না, এসব তত্ত্বচর্চা করব কখন?

লেখক : সাংবাদিক ও অনুবাদক