সামাজিকতা বলতে আমরা কী বুঝি? আমার কাছে সামাজিকতা হলো সৌহার্দ্য। আর মানুষকে যেহেতু সামাজিক জীব বলা হয় সেহেতু শিশুকে অসামাজিক বলার সুযোগ নেই। কিন্তু শিশুর সামাজিকতা কেমন? খুব সম্ভবত স্নেহ, বন্ধুত্ব কিংবা সঙ্গের চাহিদা থেকে সামাজিকতার সূত্রপাত। কারণ প্রাণ মাত্রই স্নেহের প্রতি দুর্বল। শিশুকে যেহেতু আমরা শুরু থেকেই নানা বিষয় শেখাতে ব্যস্ত থাকি, তাই আলাদাভাবে শিশুর নিজস্ব সামাজিকতার ধরন বুঝতে পারাটা বেশ কঠিন। শিশুর সামাজিকীকরণে পরিবারের পর সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে বিদ্যালয়। লক্ষ করে দেখবেন দুরন্ত, অস্থির, দুষ্টু শিশুটি বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা শুরু করার পর কেমন পরিশীলিত হয়ে ওঠে, যেন সে এখন আর ছোট নেই, যেন সে অনেক দায়িত্বশীল।
শিশুর সামাজিকতায় কপটতা নেই। তার যাকে ভালো লাগে সে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে, যাকে ভালো লাগে না তাকে সরাসরি জানিয়ে দেয় নাহ, তোমার কাছে আমি যেতে চাই না। শিশুরা আপনাকে ভালোবেসে উপহার দিয়ে ভরিয়ে দেবে। চিঠি, আঁকা ছবি, হাতে বানানো উপহার ইত্যাদির মধ্য দিয়ে সে প্রতিনিয়ত নিজের ভালোবাসা, আন্তরিকতা প্রকাশ করে যায়। বড়দের বৈষয়িক প্যাঁচগোছ সে বোঝে না। নিজের হাতে বানানো ‘টোকেন অব লাভ’-এর চেয়ে দামি আর কী হতে পারে? আমাদের শৈশবের এই সাবলীলতা বড় হতে হতে কেমন যেন হারিয়ে যায়। আমরা আর আমাদের ভালো না লাগাগুলোকে সহজভাবে উপস্থাপন করতে পারি না। আমাদের ভালোলাগাগুলোকে আমরা নিঃসংকোচে বলে ফেলতে পারি না। বাকি জীবন কেমন কপট সামাজিকতার ভার বয়ে বেড়াতে হয়।
শিশুর সামাজিকতা নিয়ে আরও কিছু গল্প বলে ফেলি। একবার একটি শিশুকে বছরের প্রথম দিনে বাবলস উপহার দিয়েছিলাম। তার মা আমাদের রান্না করে খাওয়াতেন। পরদিন সেই আপা রাত ১১টায় এসে হাজির। তার প্রথম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে বাসায় বায়না ধরেছে, সে আমাকে ধন্যবাদ জানাতে চায়! অগত্যা মা তাকে নিয়ে আসে। কিন্তু এত ছোট একটা মানুষের মাথায় এত বড় চিন্তা, নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করার চাহিদা এলো কোত্থেকে?
আরেক দিনের কথা। স্কুলের শিক্ষক থাকাকালে হঠাৎ করে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রাফা আমার অসম্ভব ভক্ত হয়ে গেল। আমিও তাকে সময় দিলাম যেন তার মুগ্ধতার তীব্রতা ধীরে ধীরে কমে আসে। একদিন টিফিনের সময় স্কুল থেকে বের হচ্ছি, সে দৌড়ে এসে আমার হাতে একটা জিনিস গুঁজে দিয়ে চলে গেল। হাত খুলে দেখি একটা চিপস, আমাকে ভালোবেসে তার টিফিনের ভাগ দিয়ে গেল।
নতুন কেউ স্কুলে এলে শিশুরা নানা উপহার দেওয়ার জন্য অস্থির হয়ে যায়। ফুল, ছবি কী রেখে কী দেবে ভেবে পায় না। এবার অনেক দিন পর শিশুদের সঙ্গে দেখা করতে গেয়েছিলাম, হঠাৎ করে। ফিরে আসার সময় চেইন, আংটি, কলম, ফুল, ব্রেসলেট এগুলো নিয়ে ফিরতে হলো। এত ছোট মানুষ, হয়তো বাবা-মা টিফিনের টাকা দিয়েছে কিংবা নিজের হাতে একটা ব্রেসলেট ছিল, নির্দ্বিধায়, আনন্দের সঙ্গে শিক্ষকের জন্য উপহার হিসেবে দিয়ে দিল। এগুলোই হয়তো শিশুর সাবলীল সামাজিকতার বহিঃপ্রকাশ।
শিশুদের গুরুত্ব দিতে হয়, কারণ নবীনপ্রাণ মাত্রই গুরুত্বপূর্ণ। তাই যেখানেই শিশুদের দেখি আগ বাড়িয়ে কথা বলার চেষ্টা করি। তারাও এমন উৎসুক বন্ধুকে সহজভাবে গ্রহণ করে। সেদিন গেট থেকে ঢুকতে গিয়ে দেখি একজন শিশু দাঁড়িয়ে আছে। জানতে চাইলাম কী কারণ, সে জানাল এখনো স্কুলে কোনো বন্ধু আসেনি। তাকে বললাম দোলনায় বসে খেলতে, এর মধ্যে বন্ধুরা চলে আসবে। ১২টার দিকে দেখি শিশুদের একটি ছোট দল আমার জানালার পাশে উঁকি দিচ্ছে। সকালের সেই ছোট্ট শিশুটির স্কুল ছুটি। ফেরার পথে বন্ধুদের নিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করে গেল। তারা সবাই প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী। যাওয়ার সময় বলে গেল আগামীকালকে আবার দেখা করতে আসবে। এগুলো আসলে শিশুর নির্ভেজাল সামাজিকতারই প্রকাশ। শিশুর সামাজিকতার এমন অনেক টুকরো উদাহরণ আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে। একটু খেয়াল করলেই আমরা দেখব শিশু একটু একটু করে সবসময়ই নিজেকে সামাজিক জীব হিসেবে প্রকাশ করে যায়। সবারই নিশ্চয়ই শিশুদের সঙ্গে এমন কোনো না কোনো অভিজ্ঞতা আছে। আমি প্রায়ই শিশুদের কাছে নানা বৈষয়িক আবদার করি তাদের একটু পরখ করে দেখতে ‘আমাকে একটু চিপস দাও’, ‘তুমি এত্তগুলো উপহার পেয়েছ প্রতিযোগিতায়! আমি একটা নিয়ে যাই’ ইত্যাদি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিশু কিন্তু তার বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয় এবং এ উদারতা আমি সবার মধ্যেই দেখেছি, যার অল্প আছে তার মধ্যেও কার্পণ্য দেখিনি।
এ যুগের শিশুর সামাজিকতার ধরন কি আগের সময়ের শিশুদের চেয়ে আলাদা? প্রশ্নের উত্তর একই সঙ্গে হ্যাঁ ও না। শিক্ষা একটি প্রবাহমান বিষয়। এক প্রজন্ম নিজেদের সামাজিক শিক্ষার আদলে আরেক প্রজন্মকে গড়ে তোলে। তাই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সামাজিকতার ধরনে হঠাৎ কোনো বড় পরিবর্তন দেখা যায় না। পরিবর্তন আসে কিন্তু সেগুলো সূক্ষ্ম। যেমন ধরি, একটি প্রজন্ম পর্যন্ত শিশুরা খালাম্মা-খালুজান ইত্যাদি বাঙালি সম্বোধন শিখে এসেছে। তার চর্চা এখনো আমরা সমাজে দেখি বড়দের মধ্যে। কিন্তু ছোটদের মুখ থেকে ‘খালাম্মা-খালুজান’ সম্বোধন সরে গিয়ে ‘আংকেল-আন্টি’ জায়গা করে নিয়েছে। একক কিংবা বিচ্ছিন্ন জীবনের ফলে আমাদের সামাজিক অন্তরঙ্গতা যেমন কমেছে, আমাদের সম্বোধনগুলোও সেই তালে তাল মিলিয়ে কমার্শিয়াল হয়ে উঠেছে। এর ফলে সম্বোধনে যে আন্তরিকতা সেটা অনিচ্ছাকৃতভাবেই লোপ পেয়েছে। আমরা অনেক সময় মুরুব্বিদের বলতে শুনি আমাদের সময় আমরা এমন ছিলাম না... কেমন ছিলাম না? আগের সময়ের শিশুদের বড়দের সঙ্গে যে দূরত্ব ছিল কিংবা সমীহের সম্পর্ক ছিল, এখনকার শিশুদের মধ্যে সেটি কমে গিয়ে বন্ধুত্বের সম্পর্কে পরিণত হয়েছে। তবে শিশুদের পারস্পরিক সামাজিকতায় পরিবর্তন এসেছে। আগে সবাই মিলে চড়ুইভাতি কিংবা পিকনিকের যে প্রচলন ছিল তা এখন নেই বললেই চলে। তবে এ দায় আমাদেরই। আমরাই শিশুদের এ ধরনের সামাজিক আনন্দ থেকে বঞ্চিত করে ঘর, যন্ত্র আর রেস্টুরেন্টমুখী করে তুলেছি। যন্ত্র আর রেস্টুরেন্টেও সামাজিকতার চর্চা হয় বটে কিন্তু দলগতভাবে কাজের মধ্য দিয়ে যে হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং একই সঙ্গে মনের অজান্তেই যে দক্ষতাগুলো বিকশিত হয়, সেই সজীব বিষয়গুলো থেকে শিশু বঞ্চিত হচ্ছে। আমাদের বিশ্বাস, বাংলাদেশের সামাজিকতার যে ধরন, তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হবে। কারণ মানুষ অভিজ্ঞতা থেকে শেখে। আবার প্রতি প্রজন্মেই সামাজিকতায় কিছু তুলনামূলক সূক্ষ্ম পরিবর্তনও আসবে। সেই পরিবর্তনের ছোঁয়া যেন শুধু ইতিবাচকই হবে কি না, তা নিশ্চিত নই। তবে এ ব্যাপারে আমাদের সচেতন ও যত্নশীল হতে হবে। শিশুর যথাযথ সামাজিকীকরণে আমরা কতটা ভূমিকা রাখছি, কতটা সুযোগ করে দিচ্ছি সেই ব্যাপারে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। নিজেদের অতীত ঐতিহ্য কিংবা হৃদ্যতা হারিয়ে যাওয়ার দায় আমরা যদি শিশুদের কাঁধে চাপাই, তখন আমরা যেন মনে রাখি অগ্রজ হিসেবে সেই পথের দিশারী আমরাই ছিলাম।
লেখক: প্রশিক্ষক, প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট