ক্যানভাসার

কথার সেই জাদুকরেরা কোথায়

কত মানুষ কতভাবে ব্যথার জ্বালায় বাঁচে না, মা-বোনেরা ব্যথার চোটে নামাজ পড়তে পারে না/ আমার কথা সত্যি কি না ব্যবহার করে দেখেন না, আরে! জাপানের পানি নারে বোতল ভরে বেচি না

মামা-ভাগ্নে, শহরতলির বাজার বা হাটের কোনো বড় সড়কের দুই পাশে দুজন দাঁড়িয়ে তালে-সুরে ছন্দ মিলিয়ে গেয়েই চলেছেন। উদ্দেশ্য কাঁধে ঝোলানো ব্যাগভর্তি বাতের ব্যথার মলমগুলো বিক্রি করা। পরিবর্তিত সমাজব্যবস্থায় দীর্ঘদিন বাদে এমন দুজন ক্যানভাসারকে দেখা গেল। এক হাতে খঞ্জনি, আর এক হাতে হ্যান্ডমাইক। দুলাইন করে করে একজনের পর একজন গান গেয়েই চলেছেন। তাদের ঘিরে কখনো জটলা বড় হচ্ছে, কখনো কমছে। এরই মধ্যে কেউ কেউ আকৃষ্ট হচ্ছেন। একটি মলম কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কেবল মাত্র যাপিত জীবনের ব্যস্ততা কাটাতে স্রেফ বিনোদনটুকু নিচ্ছেন। সেই জটলায় কারও চোখে উচ্ছ্বাস, কারও চোখে ভক্তি আর কারও চোখে গভীর অবিশ্বাস। তবু রাস্তার মানুষগুলো মামা-ভাগ্নেকে ঘিরে রয়েছেন। তাদের আকৃষ্ট করে রেখেছে এই ক্যানভাসারদ্বয়ের সুরেলা গান এবং মনে নাড়া দেওয়ার মতো শক্তিসম্পন্ন বাক্যসমূহ। বিজ্ঞাপন শিল্পের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘কপি’।  দশকের পর দশক ধরে গ্রামে-গঞ্জে, এমনকি শহরেও অহর্নিশ দাপিয়ে বেড়ানো ক্যানভাসারদের মূল শক্তি এটিই। মানুষকে বেঁধে রাখার মতো বাচনভঙ্গি, দরাজ গলা আর মনকে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো কথা। বিবিএ, আইবিএ, অ্যাড এজেন্সি, ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর, কপিরাইটার, ডিজাইনারসব ভূমিকায় অভিনয় করেন ক্যানভাসার একাই। করেন বলাটা বোধহয় সমীচীন হচ্ছে না, বলতে হবে করতেন। কেননা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই সময়ে পুঁজিবাদের বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় বৈষম্য আর বিভাজনের কাঠামোতে কোথায় যেন হারিয়ে গেছেন তারা।

নব্বইয়ের দশকে মফস্বলে বেড়ে ওঠা প্রত্যেক শিশু-কিশোর দ্বিপ্রহরে ঝুনঝুনির আওয়াজ শুনলেই ভোঁ দৌড় লাগাত উঠান ছেড়ে রাস্তার দিকে। বাড়ির শেষ সীমায় এসে উৎকণ্ঠিত চোখে খুঁজে বেড়াত ফেরিতে আজ কী এসেছে। কটকটি না হাওয়াই মিঠাই, নাকি ঝুড়িভাজা কিংবা হরেক রকমের আচার। মা-বাবার মধ্যে বাড়িতে একজন রাগী রূপে থাকতেন, অন্যজন নরম। খুচরো কটা পয়সার আবদার ওই নরম জনের কাছেই। তাই দিয়েই মিটত ওইসব চেখে দেখবার বাসনা। এভাবে বড় হওয়ার জন্যই মফস্বল-কেন্দ্রিক মানুষের মননে রাস্তার এই ফেরিওয়ালা গোছের মানুষদের ওপর বিশ্বাসবোধের জন্ম। খাবার ছাড়াও ফেরিওয়ালারা প্রতিদিনকার প্রয়োজনীয় টুকিটাকি জিনিস কাঁধে-মাথায় বয়ে হাজির হতেন বাড়ির ওপর। ঘরের কর্ত্রী সম্প্রদায় হতেন সে ফেরিওয়ালাদের টিজি (টার্গেট গ্রুপ)। তাদেরও বেচাবিক্রির পেছনে মূল শক্তি ওই একই কথা দিয়ে ক্রেতাকে সম্মোহিত করার অদ্ভুত ক্ষমতা।

বিভূতিভূষণের চরিত্র কৃষ্ণলাল তেমনই এক ক্যানভাসার। চাকরি থেকে বিতাড়িত হওয়ার পরও ডালহৌসি মোড়ে দাঁড়িয়ে দত্তপুকুরের বাতের ব্যথার তেলের এমনই ক্যানভাসিং তিনি করেছিলেন যে বসু ড্রাগের মালিক স্বয়ং এসে তাকে প্রমোশন দিয়ে চাকরিতে পুনর্বহাল করেন। আশি বা নব্বই দশকে জন্মানো প্রজন্মের প্রায় প্রত্যেকেই নিজ নিজ শহরের গঞ্জে, হাটে এমন অনেক কৃষ্ণলালকে দেখে বড় হয়েছেন। তাদের ক্যানভাসিংয়ে মোহনীয় হয়েছেন। কৃষ্ণলালদের কিছু ভাগ রয়েছে। বিভিন্ন ব্যথার মলম-ওষুধ-তেল বেচেন কেউ। কারও বিভিন্ন রোগের হারবাল ওষুধ, বনাজী শরবত, হালুয়াসহ তাবিজ তুমার। কেউ চলন্ত বাস-ট্রেনে বেচেন টুথ পাউডার, বই, কলমসহ টুকিটাকি প্রয়োজনীয় সামগ্রীর বিক্রেতা। পণ্য যেটাই হোক ক্যানভাসারদের মুখের সুমিষ্ট, সুন্দর, লোকভোলানো কথাই সাধারণ মানুষকে তাদের কাছে ভিড় জমাতে বাধ্য করত। কিন্তু এখন কোথায় তারা!

দিন আনি, দিন খাই গোছের ক্যানভাসারদের জীবনে বড় দুর্যোগরূপে হানা দেয় কভিড মহামারী। অর্থনীতির ওলটপালট অবস্থায় অসহায় হয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। ক্যানভাসাররাও সেই দুর্ভাগ্যের শিকার। কভিড পরিবর্তিত সময়ে স্বাস্থ্য সুরক্ষা-কেন্দ্রিক মানসিকতার বদল সমাজের মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজে ফেলেছে প্রভাব। কী খাচ্ছি, কী ধরছি- এসব প্রশ্নের উত্তরকে প্রভাবিত করেছে ‘সামাজিক দূরত্ব’ নামক প্রপঞ্চ। আধুনিকতার বিবর্তন, পুঁজির বিকাশ, সুপারশপ-কেন্দ্রিক বিলাসী পণ্যের ওপর অগাধ বিশ্বাস, সামাজিক কাঠামোর দেখনদারি শহর জীবনে বাস্তবতাই দিয়েছে আমূল বদলে। তার ছোঁয়া কিছুটা হলেও পড়েছে গ্রামীণ সমাজে। বিনোদনের চাক্ষুস সুযোগ প্রতিস্থাপিত হয়েছে অবাধ ইন্টারনেট সংযোগসংবলিত হাতে থাকা পাঁচ ইঞ্চির স্ক্রিনটি দিয়ে।

ক্যানভাসিংয়েও পরিবর্তনের বাতাস লেগেছে। একটা সময়ের খালি গলার ক্যানভাস লেকচার প্রতিস্থাপিত হয় হ্যান্ডমাইক দিয়ে, শুরুর দিকের মামা-ভাগ্নে ক্যানভাসারদের মতো। অধুনা সময়ে রাজধানীর বাস-ট্রেন স্টেশনের মতো ভ্রাম্যমাণ জনসমাগমপূর্ণ স্থানে এখন দেখা যায় রেকর্ডেড ক্যানভাসিং। পণ্য সেই পুরনো কবিরাজি ওষুধ বা বাতের ব্যথার তেল-মলম। কিন্তু ক্যানভাসারের গলাটা কেমন যেন যান্ত্রিক। শব্দ পিছু করে এগিয়ে গেলে দেখা যায়, ক্যাসেটে বাজছে আগে থেকে রেকর্ড করা কথামালা। একজন চাদর বিছিয়ে কেবলমাত্র সেলসম্যানের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। তাতে নেই সেই আবেগ, মানুষ ভোলানোর ক্ষমতা। উল্টো যান্ত্রিক শব্দদূষণে সাধারণের বিরক্ত হওয়ার উপক্রম।

বনফুলও তার ছোটগল্প ‘ক্যানভাসা’র গল্পে তাদের সামাজিক অবস্থার চিত্র তুলে এনেছেন। গল্পটির একটি চরিত্র ভৈরব তার স্ত্রী কাত্যায়নীর কাছে কটাক্ষ শোনেন, ‘এক কড়ার মুরোদ নেই, বিয়ে করতে যাওয়া কেন তার?’ রাগে-দুঃখে ভৈরব দাঁত না মেজেই বাড়ির বাইরে এসে নিমের ডাল দিয়ে দাঁতন করতে থাকে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় ক্যানভাসার হীরালাল। ঝকঝকে দাঁত দেখিয়ে চেষ্টা করেন ভৈরবকে টুথ পাউডার গছাতে। কথা চলার এক ফাঁকে ভৈরবই আবার ক্যানভাসার হীরালালকে এ-ই বলে ধাক্কা দেয়, ‘আপনারা হচ্ছেন দেশের শত্রু। দুনিয়ার যত শৌখিন বাজে জিনিস জুটিয়ে এনে দেশটাকে রসাতলে দিচ্ছেন। বুঝলেন?’ বিতণ্ডার এক পর্যায়ে ঘুষি চালালে খুলে পড়ে হীরালালের নকল দাঁতের পাটি। এর পরও মুখে হাসি টেনে ক্যানভাসার করুণ স্বরে বলেন, ‘কেন মারধর করছেন মশাই? গরিব মানুষ এই করে কষ্টেসৃষ্টে সংসার চালাই। বুড়ো বয়সে উপযুক্ত ছেলেটি মারা গেছে।’ মধ্যবিত্ত মনের ভৈরব ঠিকই এক কৌটা টুথ পাউডার কিনে ফেরত আসেন তার কাছ থেকে। ক্যানভাসার হীরালালের মতো একটি চরিত্র কদিন আগে দেখা গেছে বরেন্দ্র ট্রেনে। সেই ট্রেনে দায়িত্বরত রেলওয়ের এক কর্মকর্তা সাগর নামের এক হকারকে ধরে জরিমানা করতে যান। কী মনে করে ডেকে নিয়ে পরিবার সম্পর্কে খোঁজখবর করে আপ্লুত হয়ে যান। শেষমেশ কফি খাইয়ে ছাড়েন।

দেশের এই ক্যানভাসাররা অর্থনীতিতে কী এমন অবদান রাখেন যে তাদের কথা আমাদের ভাবতে হবে। কিংবা প্রশ্ন হতে পারে ‘আমরা’-বা কে! দুটো সহজ ভাগে যদি ভাগ করি- রাষ্ট্রযন্ত্র ও সাধারণ জনগণ। অর্থনীতির আলাপে ভাগ করতে হয় উৎপাদক ও ভোক্তা। হাটবাজারের বাইরে ফেরি করে বা হকারি করে পণ্য বেচাবিক্রির সংস্কৃতি এখানে অনেক পুরনো। আমাদের ক্যানভাসারদের অধিকাংশই উৎপাদক শ্রেণিতে পড়লেও পুঁজিতান্ত্রিক খাদ্যচক্রে অবস্থান একেবারে তলানিতে। ওপরে থাকা যে কারোর কাছেই তাদের হার মানতে হয়। রুপালি পর্দা কাঁপানো নায়িকারা যখন পাঁচ ইঞ্চির স্ক্রিনে আবির্ভূত হয়ে বলেন- আপনার টুথপেস্টে লবণ আছে কি! আমরা এখন সেখানেই মুগ্ধ হয়ে যাই। ক্যানভাসার হীরালাল আরও কয়েক পাটি দাঁত হারালেও আমাদের মন গলে না। এছাড়া বড় পুঁজি ছিল সব সময় মূলত নগরভিত্তিক। তারা ব্যবসা বাড়ানোর জন্য গ্রামের উপাদানব্যবস্থা কিংবা উৎপাদন বাড়ানোর জন্য চাপ দিতে পারত না। গ্রামের উৎপাদন ও এর বাজারজাতকরণ ছিল নিজস্ব নিয়মেই। সেই জায়গাটাই ছিল ক্যানভাসারদের নিজের ও পরিবারের অন্ন জোগানোর উপায়। একটা বড় কারখানা তৈরি করে একা বা কয়েকজন মালিক হয়ে গোটা বিক্রির লাভ নিজের পকেটে ঢোকানোসে অবস্থা আজও নেই তাদের উৎপাদনব্যবস্থায়। বড় পুঁজির পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র আর করপোরেট। বড় পুঁজিপতিরা সে তত্ত্ব জানে বলেই তার পক্ষে ক্যানভাসার গোত্রের পৃষ্ঠপোষক হওয়া আত্মঘাতী। ফলে প্রথম থেকেই করপোরেট কিংবা পুঁজিপতিরা এমন ছোট উৎপাদকদের প্রতিযোগী হিসেবে ভেবে নিয়ে হটাতে উদ্যোগী। রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পৃষ্ঠপোষণা করার বিষয়টি যতটা না তত্ত্বীয় ততটা ব্যবহারিক নয়। আর সেই সঙ্গে সমাজের চিরায়ত শ্রেণিবৈষম্য ও চক্রের নিচের দিকে থাকা মানুষদের হেয়চোখে দেখার তীব্র মানসিকতা বাড়তি পাওনা হিসেবে আছেই। সে সব মিলিয়ে তাই কথার জাদুকর ক্যানভাসারদের খুঁজে পেতে আজ প্রয়োজন হয় দুরবিনের।

লেখক : সাংবাদিক