আমাদের সমাজে নানা ধরনের উন্নয়ন হয়েছে। কুঁড়েঘর ইমারত হয়েছে। কবুতর চিঠি থেকে ডাকঘর, ল্যান্ডফোন থেকে মোবাইল ফোন। ভয়েস কল থেকে ভিডিও কল। এখন সারা দুনিয়ায় হাতের মুঠোয়। দেশের জিডিপি বাড়ছে। পদ্মা সেতু হয়েছে। ঢাকা শহর দেখছে মেট্রোরেল। কিন্তু আমরা সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক কোনো ক্ষেত্রেই নারীর প্রকৃত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারছি না। শুধু গ্রামীণ সমাজ নয়, শিক্ষিত সমাজেও, শহুরেও সমাজেও। নারীর অংশগ্রহণ এখনো আমাদের কাছে স্বতংস্ফূর্ত না। নারীকে প্রান্তিক করে রাখা হয়েছে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায়।
এক সময় গ্রামীণ সমাজে পুরুষ একাধিক বিয়ে করেছে যাতে নারীকে দিয়ে কৃষি ও গৃহস্থালির কাজ করাতে পারে। নারীর গৃহস্থালির শ্রমকে পুরুষ যে পণ্য করে লাভবান হয়েছে তাতে নারীর শেয়ার মেলেনি। প্রত্যেক পরিবারের আর্থিক প্রয়োজনে নারীর মাটির ব্যাংকে জমানো টাকা এগিয়ে এসেছে কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারী প্রাধান্য পায়নি।
গ্রামাঞ্চলে সামাজিক যেকোনো অনুষ্ঠান উপলক্ষে সামাজিক বৈঠক ডাকার রেওয়াজ আমাদের শত শত বছর ধরে। এসব সামাজিক বৈঠক অনেক সময় ঐতিহ্যগত বিচারালয়ের কাজ করে। কিন্তু এসব বৈঠকে কোনোভাবেই কোনো নারীর অংশগ্রহণ নেই। আমার গবেষণার অংশ হিসেবে আমি অন্তত তিনটি গ্রামের সামাজিক বৈঠকের ওপর দুই বছর নজর রেখেছি। বৈঠকে নারীর অংশগ্রহণ ছিল না। এমনকি যেসব বৈঠক নারী সংক্রান্ত ছিল সেখানেও ভুক্তভোগী নারী ছাড়া কোনো নারীর উপস্থিতি ছিল না। প্রায় শতভাগ পুরুষবেষ্টিত একটি স্থানে একজন গ্রামীণ নারীর পক্ষে তার বক্তব্য নির্ভয়ে ও নিসঃঙ্কোচে বলা সম্ভব না। ফলে সামাজিক বিচারেও নারীর স্বর প্রায়শই অবদমিত থেকে যায়।
গ্রামীণ বিয়ে, মেজবান বা যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে ঘরপ্রতি একজন দাওয়াত দেওয়ার একটি রেওয়াজ রয়েছে। সে রেওয়াজ অনুযায়ী যদি ঘরপ্রতি একজনকে দাওয়াত দেওয়া হয় সেক্ষেত্রে সেসব ঘর থেকে পুরুষ সদস্যই আসেন দাওয়াতে। ফলে গ্রামের বিয়ে, মেজবান ও সামাজিক অনুষ্ঠানের পুষ্টিকর ও সুস্বাদু খাবার শুধুমাত্র পুরুষেরই জুটেছে। কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে যদি ঘরের প্রতিটি সদস্যকেও দাওয়াত দেওয়া হয় সেক্ষেত্রেও উপস্থিত অতিথি সংখ্যায় ৮০ শতাংশ থাকে পুরুষ।
বাড়ির খাদ্য বণ্টনেও নারীর প্রতি বৈষম্য করে আসছি। বাড়ির সব পুরুষের খাওয়া শেষে যে পোড়া ভাত থাকছে তাই আমরা নারীর জন্য রাখছি। নারীর প্রতি পুষ্টি বৈষম্য করে আমরা প্রত্যাশা করছি নারীর গর্ভে আসবে স্বাস্থ্যবান নবজাতক!
নারীকে মূল্যায়নে সমাজের কৃপণতা থাকলেও নারী অবমাননায় কোনো কৃপণতা নেই। সমাজে প্রচলিত প্রতিটি গালির লক্ষ্যবস্তুই মা ও বোন! অথচ ইসলামের স্বর্ণালি যুগে মূলধারায় নারী সবসময় মূল্যায়িত হয়েছে। মহানবী (সা.) গৃহস্থালির কাজকে স্ত্রীর সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন। স্ত্রীর সঙ্গে একই ধরনের একই পাত্রে খাবার খেয়েছেন।
আমাদের দেশে আমরা নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিতে সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য ও উপজেলায় সংরক্ষিত মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান রেখেছি। কিন্তু পুরুষ চেয়ারম্যান ও পুরুষ ইউপি সদস্যের দাপটে তারা প্রায় অদৃশ্য থাকেন। কভিড-১৯ চলাকালে আমি কয়েকজন সংরক্ষিত ইউপি নারী সদস্যের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তারা বলেছেন, জনগণের জন্য যে ত্রাণ আসে তার বেশিরভাগ বরাদ্দ পান পুরুষ সদস্যরা। ফলে জনগণের কাছে তারা খুব একটা যেতে পারেন না।
কভিডকালে টিকা গ্রহণ কর্মসূচিতেও নারী ছিল প্রান্তিক। যখন সরকার অনলাইনে টিকার জন্য রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করল তখন দেখা গেল পুরুষদের টিকার রেজিস্ট্রেশন ছিল বেশি। কারণ পুরুষের ইন্টারনেট এক্সেস বেশি ছিল। পুরুষ যেহেতু বাইরের জগতের সঙ্গে বেশি সংযুক্ত ফলে নিজে না পারলেও বাইরে কারও মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করিয়ে নিয়েছে। অন্যদিকে নারী যেহেতু ঘরে থাকে ফলে নারীর টিকা গ্রহণকে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়নি। কভিডকালে আমি নিজস্ব উদ্যোগে একটি ফ্রি ভ্যাক্সিন রেজিস্ট্রেশন ক্যাম্প পরিচালনা করেছি। সে রেজিস্ট্রেশন ক্যাম্প পরিচালনা করতে গিয়ে দেখি ঘরের বেশির ভাগ নারীই টিকার জন্য রেজিস্ট্রেশন করেননি।
শুধু আজকের দিনেই নয়, ঐতিহাসিকভাবে আমরা নারীর অবদানকে খাটো করে এসেছি। নারীর গুরুত্বকে ম্লান করেছি। নারীর অংশগ্রহণকে অদৃশ্য করে ফেলেছি সমাজ থেকে। মুক্তিযুদ্ধে বীরাঙ্গনা উপাধি দিয়ে নারীর স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি করা হয় সেটা আদতে স্বীকৃতি নয়। ‘বীরাঙ্গনা’ উপাধি দিয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ভয়াবহ লাঞ্ছনার অভিজ্ঞতাকেই শুধু সামনে আনা হয়েছে, আর আড়াল করা হয়েছে নারীর সম্মুখযুদ্ধের অবদান। দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টায়নি বলেই স্বাধীনতার পরও এই নারীরা নিপীড়িত-বঞ্চিত হয়েছেন, সামাজিক লাঞ্ছনা হয়েছে তাদের নিত্যসঙ্গী।
একবার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পক্ষ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি গার্ড অব অনারে নারী ইউএনওর বদলে পুরুষ এসিল্যান্ড বা উপজেলার অন্য কোনো পুরুষ সরকারি কর্মকর্তার বিকল্প খোঁজার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নারীকে শুধু গ্রামীণ সমাজে নয় শিক্ষিত ও শহুরে সমাজেও মেনে না নেওয়ার যে ‘রোগ’ রয়েছে এটা তার প্রমাণ। আমাদের ভাষা ও বয়ান তৈরিতেও নারীকে প্রান্তিক করার একটি প্রবণতা লক্ষণীয়। যখন ‘মহিলা কবি’ বলা হয় তখন এটা স্পষ্ট হয় জেন্ডার পরিচয় দিয়ে তাদের বিশেষায়িত করা হচ্ছে। কোনো পুরুষ কবিকে আজ পর্যন্ত ‘পুরুষ কবি’ বলা হয়নি!
আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী একজন নারী। বিভিন্ন সময়ে নারী স্পিকার, নারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, নারী বিরোধীদলীয় নেতা, নারী উপাচার্য, নারী মেয়র, নারী সচিব পেয়েছি আমরা। কিন্তু ক্ষমতাবান অনেক নারীই আদতে ক্ষমতার চর্চা করতে পারেন কিনা তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। যেসব নারী অফিস করছেন, বাইরে যাচ্ছেন তাদের প্রতিদিনকার সংগ্রাম পাবলিক ট্রান্সপোর্টে আরোহণ করতে পারা না পারা। শহর জুড়ে নারীবান্ধব কোনো পাবলিক বাস নেই।
প্রান্তিক পর্যায়ে তো নারীর ক্ষমতায়ন একেবারে নিশ্চিত করা যায়নি। নারীর সম্পত্তির উত্তরাধিকারের আইনগত অধিকার থাকলেও সামাজিক অধিকার নেই। গ্রাম্য সালিশে নারীর বিচার করছে পুরুষ। বিচারক প্যানেলে কখনো কোনো নারী থাকে না। কীভাবে পুরুষের পক্ষে একজন নারীর বেদনা অনুভব করা সম্ভব!
নারীকে বঞ্চিত করে, অদৃশ্য করে, নারীর প্রতি অবিচার করে মানবিক সমাজ গড়া সম্ভব না। নারীকে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশেষ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ দিতে হবে। তবেই আমাদের পক্ষে প্রকৃত অগ্রগতি সম্ভব হবে।
লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট