রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে রোগীদের জন্য বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা নেই। হাসপাতালের জরুরী বিভাগের পাশে একটি পানির ফিল্টার থাকলেও সেটি এখন অকেজো। হাসপাতালের মূল ফটকের সামনে একমাত্র টিউবওয়েলটিও বেশ কিছুদিন ধরে নষ্ট। খাবার পানি নিয়ে নিয়মিত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের।
১০০ শয্যা বিশিষ্ট রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল জেলার পাঁচটি উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় হাসপাতাল। হাসপাতালটি ১০০ শয্যার হলেও এখানে রোগী ভর্তি থাকে এর তিন থেকে চার গুন। জেলার পাঁচটি উপজেলা থেকেই রোগীরা এখানে সেবা নিতে আসেন। তবে এখন পর্যন্ত হাসপাতালের রোগীদের জন্য কোন বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা নেই। রোগীদেরকে হাসপাতালের বাইরে বিভিন্ন জায়গা পানি আনতে হয়। অনেকেই দোকানের কেনা পানি ব্যবহার করেন। এতে করে এক দিকে সংক্রমণ ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা রোগীরা। দ্রুত এই পানির সমস্যা দূর করার দাবি জনান ভুক্তভোগীরা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালে জরুরী বিভাগ, বহি-বিভাগ, ভর্তি রোগী ও বৈকালিক সেবাসহ মোট চারটি বিভাগে চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম চালু রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিতে আসে। হাসপাতালে প্রায় ২০০ জন কর্মকর্তা কর্মচারী রয়েছেন। হাসপাতালে সাপ্লাই পানি আছে। তবে এই পানি খাওয়ার উপযোগী না। হাসপাতালে এখন একটি টিউবওয়েল আছে। তবে টিউবওয়েলের পানিতে অনেক আয়রন ও আর্সেনিক থাকায় এই পানি কেউ ব্যবহার করে না। করোনার সময় হাসপাতালের জরুরী বিভাগের একটি বিশুদ্ধ পানির ফিল্টার বসানো হয়েছিল। তবে সেটি মাস ছয়েক চলার পর থেকেই বন্ধ রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের প্রবেশ পথে একটি টিউবওয়েল। টিউবওয়েলটি পানিশূন্য রয়েছে। জরুরী বিভাগের দেওয়াল ঘেঁষে একটি বেসিন রয়েছে। বেসিনটি আবর্জনায় ভর্তি। বেসিনের ওপরে দেওয়ালের সঙ্গে একটি বিশুদ্ধ পানির ফিল্টার। তবে সেটি অকেজো। হাসপাতালের মূল ফটক থেকে কমপক্ষে ১০০ মিটার দূরে রাজবাড়ী টেকনিক্যাল স্কুলের সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে দুইটি টিউবওয়েল। সেখানে পানি আনতে ভিড় জমিয়েছেন হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীর স্বজনেরা।
পানি নিয়ে এসেছিলেন অঞ্জলি নামে এক রোগীর স্বজন। তিনি বলেন, আমার ভাগ্নের জ্বর নিয়ে তিনদিন ধরে হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছি। হাসপাতালের কোথাও খাবার পানি খুঁজে পাইনি। পরে জানতে পারলাম হাসপাতালের বাইরে থেকে পানি আনতে হয়। হাসপাতালের বাইরে গেইটের বাম দিকে একটি এগিয়ে টিউবওয়েল পেয়েছি। সেখান থেকে পানি আনলাম।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক কর্মী বলেন, হাসপাতালের পানির সমস্যা দীর্ঘ দিন ধরে চলছে। হাসপাতালের কোন পানিই খাওয়ার উপযোগী না। আমরা যারা কর্মী রয়েছি অনেকেই কেনা পানি খাই। কেউ কোয়ার্টার থেকে পানি নিয়ে আসে। আবার কেউ বাড়ি থেকে নিয়ে আসে। সুপেয় পানির ব্যবস্থা করাটা খুবই জরুরী।
রাজবাড়ী সদর উপজেলার বানিবহ ইউনিয়নের খানবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা ভানু বেগম তার স্বামীর ডাইরিয়া জনিত কারণে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। তিনি বলেন, ডাইরিয়া রোগীর জন্য বেশি পানির প্রয়োজন। আমি মহিলা মানুষ। পানি আনার জন্য হাসপাতালের গেটের বাইরে আরও কিছুদূর যেতে হয়। রাস্তায় অনেক গাড়ি চলাচল করে। এছাড়া রাতের বেলায় রাস্তায় অনেক কুকুর থাকে। ঝুঁকি নিয়েই পানি আনতে যাই।
রাজবাড়ী শহরের সজ্জনকান্দা গ্রামের বাসিন্দা কাকলী আক্তার তার ছেলের জ্বর নিয়ে হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছেন। তিনি বলেন দুই দিন আমি হাসপাতালে আছি। হাসপাতালের পরিবেশ খুবই নোংরা। টয়লেটে যাওয়া যায় না। হাসপাতালে একটি টিউবওয়েল আছে। তাতে পানি নেই। খাবার পানি হাসপাতালের বাইরে থেকে আনতে হয়। হাসপাতালের ভেতর পানি পাওয়া গেলে আমাদের জন্য ভালো হতো।
নাম না বলার শর্তে এক চায়ের দোকানদার বলেন, আমরা যারা এখানে দোকান করি তাদের উদ্যোগে এই টিউবওয়েলটি বসানো হয়েছে। হাসপাতালে কোন পানি নেই। সকল রোগীর লোকজন এখানে আসে পানি নিতে। অনেকে খাবার ফেলে নোংরা করে রেখে চলে যায়। আমাদের সেগুলো পরিষ্কার করতে হয়। হাসপাতালের ভেতর বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা জরুরী।
রাজবাড়ী জেলা নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক ফকীর শাহাদত হোসেন বলেন, রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল এই জেলার মধ্যে একটি বৃহত্তর হাসপাতাল। এখানে প্রতিদিন প্রায় হাজার খানেক মানুষ চিকিৎসা নিতে আসে। দুই থেকে তিনশো রোগী হাসপাতালে ভর্তি থাকে। এই আধুনিক যুগে এত বড় একটি হাসপাতালে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নেই। এটি কল্পনাও করা যায় না। এটি খুবই হতাশাজনক। যত দ্রুত সম্ভব এই সমস্যা সমাধানের দাবি জনান তিনি।
রাজবাড়ী সদর উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল কার্যালয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মিলন ফকির বলেন, এখন পর্যন্ত হাসপাতাল থেকে আমাদেরকে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত করেনি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাদের কাছে লিখিত আবেদন দিলে আমরা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারবো।
রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক শেখ মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান বলেন, হাসপাতালে সাপ্লাই পানি আছে। তবে সেটা খাওয়ার উপযোগী নয়। আমাদের একটা টিউবওয়েল আছে। এই টিউবওয়েলের পানি কেউ খায় না। সেটা যে নষ্ট রয়েছে। এ বিষয় সম্পর্কে আমি অবগত ছিলাম না। বিষয়টি আপনাদের মাধ্যমে জানতে পারলাম। যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালের সুপেয় পানির সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবো।
জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ ইব্রাহিম টিটন বলেন, হাসপাতালে সাপ্লাই পানি আছে। হাসপাতালের সকল অবকাঠামোর কাজ গণপূর্ত বিভাগ করে। হাসপাতালের সব কিছু দেখভালের দায়িত্ব তত্ত্বাবধায়কের। তিনিই এ বিষয়ে ভালো বলতে পারেন।