নিচে বাড়লেও নীতিনির্ধারণী পদে নারী কম

সরকারি চাকরি ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ এখন সর্বত্র। সচিবালয় থেকে শুরু করে সরকারি চাকরির বিভিন্ন স্তরে নারী চাকরিজীবীর সংখ্যা বাড়ছে দিনে দিনে। গত ৯ বছরে সরকারি চাকরিতে নারীর সংখ্যা বেড়েছে ৩৮ হাজার ৫৫৮। বর্তমানে সরকারি চাকরিতে রয়েছেন ৯ লাখ ৮৭ হাজার ৬৭৯ জন পুরুষ এবং ৪ লাখ ৯ হাজার ১৩৯ নারী। 

তবে সরকারি চাকরিতে নারীর সংখ্যা বাড়লেও শীর্ষস্থানীয় ও নীতিনির্ধারণী পদে নারীর অংশগ্রহণ এখনো অনেক কম। বিষয়টি উঠে এসেছে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য থেকেই। 

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জেলা প্রশাসক পদে আছেন ১০ নারী। সচিব ও সচিব পদমর্যাদার ৭৭ কর্মকর্তার মধ্যে নারী ১০ জন, ৫১১ অতিরিক্ত সচিবের মধ্যে নারী ৮৩ জন, ৬৩৬ যুগ্ম সচিবের মধ্যে ৮১ জন নারী রয়েছেন। আর ১ হাজার ৬৯৫ উপসচিবের মধ্যে ৩৪৯ জন নারী, ১ হাজার ৫৪৯ সিনিয়র সহকারী সচিবের মধ্যে ৪৫৪ জন নারী এবং ১ হাজার ৫২৮ সহকারী সচিবের মধ্যে ৪৭২ জন নারী। দেশে এখন ১৪৯টি উপজেলায় নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পদে কর্মরত আছেন নারী। এ বিবেচনায় ইউএনও পদে নারীরা আছেন চার ভাগের এক ভাগ।

গুরুত্বপূর্ণ এ পদগুলোতে এই সংখ্যাই বলে দিচ্ছে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও নীতিনির্ধারক পর্যায়ে সংখ্যা সামান্য।  শীর্ষস্থানীয় ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অনুপস্থিতিকে নারীর ক্ষমতায়নের অন্তরায় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এখনো নারীদের শতকরা হিসেবে অংশগ্রহণ সন্তোষজনক নয়। নারীর জন্য উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা, পুরুষদের প্রথাগত মানসিকতা পরিবর্তনে সচেতনতা, চাকরি ক্ষেত্রে হয়রানি বন্ধসহ নানা ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশের জনসংখ্যার হিসেবে নারী ও পুরুষের চেয়ে বেশি হলেও চাকরি ক্ষেত্রে নারীদের সংখ্যা পুরুষের তুলনায় অনেক কম। 


সরকারি চাকরিতে শীর্ষ পর্যায়ের নারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন রংপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শাহনাজ বেগম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, একটা জেলা বা উপজেলায় জনসংখ্যার অনুপাতে নারী ও পুরুষের সংখ্যা প্রায় সমান। আমাদের দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের নারীরা এখনো নানাভাবে বঞ্চিত। গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে নারীদের সংখ্যা বেশি থাকলে এটা নারীদের অনুপ্রাণিত করে আবার অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রেও পুরুষের তুলনায় নারীরা বেশি সোচ্চার থাকেন।

গত সোমবার বিশ্বব্যাংকের ‘নারী, ব্যবসা ও আইন-২০২৪’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, কর্মক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীরা পুরুষের তিন ভাগের এক ভাগ আইনি অধিকার ভোগ করেন। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের পেছনে আছে শুধু আফগানিস্তান। বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্য নিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি ফোরাম (ডব্লিউইএফ) এক গবেষণায় জানায়, বাংলাদেশে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য প্রায় ২৮ শতাংশ।

ঢাক মেডিকেল কলেজের নাক, কান গলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হুসনা কুমার ওসমানী দেশ রূপান্তরকে বলেন, চাকরি ক্ষেত্রে বেশিরভাগ পুরুষ সহকর্মীই নারীদের সম্মান করেন। তবে পুরুষদের মধ্যে একটা অংশ যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নারীকে নিজের চেয়ে ভালো জায়গায় দেখতে চান না। এ নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগেন, অনেক ক্ষেত্রে নারীকে তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেন। যদি নারীদের বৈষম্য না করে সমান সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হতো তাহলে উচ্চপর্যায়ে নারীদের উপস্থিতি আরও বাড়ত।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে সরকারি চাকরিজীবী আছেন ১৩ লাখ ৯৬ হাজার ৮১৮ জন। এর মধ্যে ৯ লাখ ৮৭ হাজার ৬৭৯ জন পুরুষ। নারী চাকরিজীবী রয়েছেন ৪ লাখ ৯ হাজার ১৩৯ জন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ সরকারি কর্মচারীদের পরিসংখ্যান (৩০ মে ২০২৩ সালে প্রকাশিত) প্রথম শ্রেণির চাকরিতে মোট কর্মরত রয়েছেন ১ লাখ ৭৯ হাজার ৫১৪ জন। এর মধ্যে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৪৯৬ জন পুরুষ আর নারীর সংখ্যা ৪০ হাজার ১৮। দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কর্মরত রয়েছেন ১ লাখ ৯৩ হাজার ৬৬৪ জন, যেখানে ১ লাখ ২৭ হাজার ৬০৬ জন পুরুষ, ৬৬ হাজার ৫৮ জন নারী। তৃতীয় শ্রেণির চাকরিতে কর্মরত রয়েছেন ৬ লাখ ৩ হাজার ৪৩৩ জন, যেখানে পুরুষ ৩ লাখ ৫৬ হাজার ২৭১ এবং নারী ২ লাখ ৪৭ হাজার ১৬২ জন। চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে কর্মরত রয়েছেন ৪ লাখ ১৫ হাজার ১০৪ জন, যেখানে পুরুষের সংখ্যা ৩ লাখ ৬০ হাজার ১৭ এবং নারী ৫৫ হাজার ৮৭ জন।