নারীর সমঅধিকার ও সমসুযোগের সংগ্রাম কবে শেষ হবে?

বিশ্বের মোট পুরুষদের প্রায় ৮০ ভাগই কাজ করেন, সেখানে নারীদের মধ্যে এখন পর্যন্ত কাজ করেন প্রায় ৫০ ভাগ। এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার ৭৭ ভাগ পুরুষ এবং ৩১.৬ ভাগ নারী কেবল শ্রমশক্তির অংশীদার হতে পেরেছেন। দক্ষিণ এশিয়ায় নারীদের পরিসংখ্যান কম মনে হলেও গত এক দশকের বেশি সময়ে বাংলাদেশে নারী শ্রমশক্তির চিত্র খুব দ্রুতগতিতে পাল্টে গেছে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে বিগত দশ বছরের বেশি সময়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় শামিল হওয়া প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ নতুন শ্রমশক্তির মধ্যে ৫০ লাখই নারী। বাংলাদেশের নারী শ্রমশক্তির এই সংখ্যাটি বেশ স্বস্তির ও আশা জাগানিয়ার। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এই বিপুল পুরুষ শ্রমশক্তির পাশে স্বল্প সংখ্যক নারী শ্রমশক্তির ব্যাপারটি সাদামাটা চোখে একটু অন্যরকম লাগতেই পারে। যেহেতু নারীরাই সচরাচর সমঅধিকার বা সমসুযোগের কথা বলে বলে মুখে ফেনা তুলছেন, তাহলে কাজের বেলায় সংখ্যাটি এতো কম কেন, বাকি ৫০ ভাগ নারী কি বসে বসে খাচ্ছেন? এই প্রশ্নটি আসা খুবই স্বাভাবিক। যদিও ইহজগতের কোথাও নারীদের জন্য বসে খাওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। 

শ্রমশক্তির অংশ হিসেবে কাজ করা নারী বলতে স্বামী, সংসার, বাচ্চা বা নিজের পরিবার সামাল দেওয়ার পরেও পুরুষের মতো রোজগারে বেরিয়ে পড়েন যে নারীরা তাদেরকে বুঝানো হয়েছে। নারীরা যদি পারিবারিক এই বিস্তর কষ্টসাধ্য কাজগুলো না সামলাতো তাহলে আয়-রোজগারকারী বিশ্বের বিরাট পুরুষ গোষ্ঠীর অবস্থা কি হতো? এই জলজ্যান্ত প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে নারী পুরুষের মধ্যে পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য থেমে নেই। অথচ শুধুমাত্র জেন্ডার বৈষম্য নিরসন করতে পারলেই আরও ৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৭ কোটি ৬৪ লক্ষ ৪৫ হাজার ৩৯০ কোটি টাকার বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধিত হতে পারতো। জাতিসংঘ ঘোষিত ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রাগুলো অধিকতর বিস্তৃত এবং পরস্পর নির্ভরশীল, তারমধ্যে ৫নং ও ১০ নং লক্ষে পরিষ্কারভাবে জেন্ডার সমতা ও অসমতাকে কমিয়ে আনার ব্যাপারে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে উন্নত বিশ্বের নারীরা পুরুষের তুলনায় দৈনিক অন্তত ৩০ মিনিট আর উন্নয়নশীল দেশগুলোত অন্তত ৫০ মিনিট বেশি কাজ করে থাকেন। তবুও এই সভ্য যুগে নারীকে নিজ কর্মস্থলে প্রতিনিয়ত নানান প্রতিকূলতার মধ্যে টিকে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত হতে হচ্ছে। সভ্যতা বিকাশের সাথে সাথে অর্থনৈতিক ও সামগ্রিক উন্নয়নে নারীর অবদানও ক্রমান্বয়ে বিকশিত হতে শুরু করেছে, যদিও বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থা সেগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়ার চেয়ে বরং স্বাক্ষী হয়ে বসে থাকাটাই সমীচীন মনে করে আসছে।

ইতিহাস বলছে নারীদের কোনো অধিকারই আপনা-আপনি অর্জিত হয়নি। সভ্যতা বিনির্মাণের পরতে পরতে নারীর প্রতি  নির্মমতা ও অবজ্ঞার ছাপ অমোচনীয়। ইসলামপূর্ব 'আইয়ামে জাহেলিয়া' বা অন্ধকারাচ্ছন্ন ও কুসংস্কারপূর্ণ যুগেও নারীরাই বেশি বর্বরতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। নারীর অধিকার যেনো খর্ব না হয় সেজন্য পবিত্র ইসলাম ধর্মেও নারীর সর্বোচ্চ মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার বিধান রয়েছে। তবুও মানুষ হিসেবে নারীদের সমঅধিকার বা সমমর্যাদার বিষয়টি এখনো অনেকটাই অধরা। উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ‘নারীবাদ’ নিয়ে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে যে সক্রিয় আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিলো তার মূলে ছিলো বৈবাহিক চুক্তিতে নারীদের সমঅধিকার এবং সম্পত্তি লাভ ও ভোগ করার অধিকার অর্জন করা। পরবর্তীতে নারীদের ভোটাধিকারের দাবীও জোরালো হয়। ১৮৪৮ সালে লেখক ও নারী অধিকার আন্দোলনের আমেরিকান নেতা এলিজাবেথ ক্যাডি স্ট্যানটন এবং আমেরিকান নারী অধিকার কর্মী ও সমাজ সংস্কারক লুক্রেটিয়া মট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের অধিকার সংক্রান্ত প্রথম সম্মেলনের আয়োজন করেন। উভয়ই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের ভোটাধিকার বিলোপের বিরুদ্ধে প্রথম সমন্বিত দাবি প্রণয়ন করেছিলেন। নিউ ইয়র্কের সেনেকা ফলসে আয়োজিত এই সম্মেলন ‘সেনেকা ফলস কনভেনশন’ নামে পরিচিত যেখানে ৩০০ জনেরও বেশি অংশগ্রহণকারী ছিলেন যাদের অধিকাংশই ছিলেন নারী প্রতিনিধি। এই সম্মেলনেও তাদের দাবী ছিলো যে নারীরা কর্মসংস্থান এবং শিক্ষার সুযোগ লাভের পাশাপাশি কারো অধীনে না থেকে আত্মনির্ভরশীল হয়ে বাচতে চান। যে দাবীগুলো উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের প্রধান দাবিতে পরিণত হয়, যেখানে দ্বিতীয় ধাপের এই নারীবাদ আন্দোলনে ভোটাধিকার আদায়ের জন্য নারীরা বিক্ষোভ শুরু করেন।

নারী জাগরণের ডামাডোলের মধ্যে ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের রাস্তায় সুতা কারখানার কয়েক হাজার নারী শ্রমিক মজুরি বৈষম্য দূর করা, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা এবং অমানবিক কর্ম পরিবেশকে ঠিক করার দাবীতে জোরালো প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। মার্কিন সরকারের লাঠিয়াল বাহিনী সেই ন্যায্য দাবীকে রুখে দিয়েছিলো। কিন্তু নারী মননে দির্ঘকালের নিষ্পেষণ ও অন্যায়ের প্রতিবাদের যে আগুন জ্বলে উঠেছিলো তা নেভানোর সাধ্য কারোরই ছিলো না। নারী ও পুরুষের মধ্যকার সমতার আন্দোলনের মতবাদ হিসেবে নারীবাদ ১৮৯০ সালে যুক্তরাজ্যে পরিচিত লাভে করে। এরই মধ্যে ১৮৯৩ সালে নিউজিল্যান্ড বিশ্বের প্রথম জাতি যারা সর্বজনীন নারী ভোটাধিকার নিশ্চিত করে ইতিহাস গড়ে। তবে ১৮৫৭ সালের নারী আন্দোলনকে ঘিরে নিউইয়র্ক শহরের লাঠিয়াল বাহিনীর সেই বর্বর দমন-পিড়নের ইতিহাস পরবর্তী ৫২ বছরের মধ্যে বিশ্বব্যপী নারীদেরকে আরো প্রতিবাদী ও সংগঠিত হতে প্রেরণা যোগায়।

যুক্তরাজ্যের পর ১৯১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রেও নারীবাদ মতবাদটি জনপ্রিয়তা লাভ করার আগের বছর অর্থাৎ ১৯০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত নারী সমাবেশে ছিলো আজকের আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপনের ঐতিহাসিক মাইল ফলক। বিশ্বের সর্বপ্রথম এই আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনের নেতৃত্বে ছিলেন জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম স্থপতি ও জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিন। এরই ধারাবাহিকতা  ১৯১০ সালের ২৬ ও ২৭ আগস্টে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন যেখানে ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন। এ সম্মেলন থেকেই  ক্লারা জেটকিন ঘোষণা করেণ যে ১৯১১ সাল থেকে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করা হবে। যার ফলশ্রুতিতে ১৯১৪ সালে বেশ কয়েকটি দেশ ৮ মার্চকে নারীদের সমঅধিকার দিবস হিসেবে পালন করে। বিশ্বব্যপী নারীদের সংগঠিত হওয়া, বৈষম্য ও নিপিড়নের বিরুদ্ধে সচতনতা বৃদ্ধি, নারীদের অধিকার ও ন্যায্যতার দাবীতে আওয়াজ তোলার দিন হিসেবে ৮ মার্চ ইতিমধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ দিবসটির গুরুত্ব অনুধাবন করে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। এরপর থেকে সারা পৃথিবী জুড়েই নারীর সমঅধিকার ও সমসুযোগের অভিপ্রায়ে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। জাতিসংঘ ১৯৯৬ সাল থেকে প্রতি বছর দিনটির প্রতিপাদ্য ঘোষণা করে আসছে। 

উল্লেখ্য, উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ‘নারীবাদ’ নিয়ে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে যে সক্রিয় আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিলো তার ফলে  যুক্তরাজ্যে গৃহসম্পত্তির মালিক ত্রিশোর্ধ নারীরা ১৯১৮ সালে নিজেদের ভোটাধিকার অর্জন করেন। পরবর্তীতে ১৯২৮ সালে ২১ বছরের ঊর্ধ্বে সকল নারীরা ভোটাধিকার লাভ করেন। এই ভোটাধিকার প্রাপ্তি ছিলো প্রথম ধারার নারীবাদ আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য প্রথম অর্জন। ১৯১৯ সালের আমেরিকান সরকার সংবিধানের ১৯তম সংশোধনীর মাধ্যমে  নারীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করে। এরপরেই নারীবাদীরা নারীবাদের দ্বিতীয় ঢেউের যুগে প্রবেশ করেন যেখানে সামাজিক ও সংস্কৃতিগত বৈষম্য এবং রাজনৈতিক অসমতার বিষয়গুলো সামনে চলে আসে। নারী ও পুরুষের মধ্যকার সমতার আন্দোলনের মতবাদ হিসেবে ১৯৮০ সালে ‘নারীবাদ’ বৈশ্বিক আন্দোলন হিসেবে ফ্রান্সেও ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়।

ইতিহাসের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় নারীর অধিকার রক্ষা, উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার ধারাকে অব্যাহত রাখতে সর্বত্র নারীকেই রাস্তায় নামতে হয়েছে। নারীকে এই কাজটি করে আসতে হচ্ছে নারীর ঘরে থাকা পুরুষটি বা পুরুষগুলোকে তাদের কর্মে নিয়োজিত হওয়ার জন্য সর্বোচ্চ সাপোর্ট নিশ্চিত করে। তারপরেও গত ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায় যে বিশ্বের ১১.৩ শতাংশ দেশের রাষ্ট্রপ্রধানগণ নারী এবং ৯.৮ শতাংশ দেশের সরকার প্রধানগণ নারী অথচ এক দশক আগেও এই  পরিসংখ্যান ছিল যথাক্রমে ৫.৩ শতাংশ ও ৭.৩ শতাংশ। সমস্ত অঞ্চলের মধ্যে ইউরোপে নারীদের নেতৃত্ব সর্বাধিক যার সংখ্যা ১৬ জন। তবে নারীদের এই অভূতপূর্ব অর্জনের পেছনে পুরুষের ভূমিকাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে নেহায়েত কম নয়।

বৈশ্বিক গতির সাথে তাল মিলিয়ে নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই ডিজিটাল বাংলাদেশ  মিশন শেষে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ অভিযানের আওতায় প্রযুক্তির সমর্থনে পরিচালিত হবে আগামির বাংলাদেশের সকল অর্থনৈতিক কর্মকান্ড। বাংলাদেশের এই প্রযুক্তি-নির্ভর উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় নারীরা নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করার সমান সুযোগ পেলে তারা বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সহায়তা করবে। বাংলাদেশ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে আইসিটিতে নারীর অংশগ্রহণ ৩০ শতাংশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা প্রণয়ন করেছে এটা খুবই আশার কথা। এখন বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বৈষম্য দূর করতে জাতীয় বাজেটে জেন্ডার-সমতাকে  সর্বাধিক প্রাধান্য দিতে হবে। পাশাপাশি নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও)সহ জাতিসংঘ ঘোষিত সকল সনদপত্র ও রাষ্ট্রীয় সকল আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তবেই হয়তো যুগযুগ ধরে নারীর সমঅধিকার ও সমসুযোগ অর্জনের কষ্ট কিছুটা লাঘোব হবে।  

লেখক: এম এম মাহবুব হাসান, ব্যাংকার ও উন্নয়ন গবেষক