ডিজিটালাইজেশনে গতি নেই

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) নিয়ম অনুযায়ী স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) পর্বের চূড়ান্ত পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগে পরীক্ষার ফি, হল ভাড়া, মাসিক বেতন ও সেশন ফিসহ যাবতীয় আনুষঙ্গিক ফি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংক শাখায় পরিশোধ করে আবাসিক হল থেকে ছাড়পত্র (ক্লিয়ারেন্স) নিতে হয়। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার থেকে বই নিয়ে পড়ার জন্য গ্রন্থাগার কার্ড নিয়ে থাকলে পরীক্ষা শুরুর আগে তা জমা দিয়ে গ্রন্থাগার থেকে ছাড়পত্র নেওয়ার জন্য আবেদন করতে হয়। অন্যথায় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে ফল প্রকাশ করা হয় না।

কিন্তু শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নিয়ম অনুযায়ী সব কাগজপত্র জমা ও ফি পরিশোধের পরও পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয় না। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার থেকে গ্রন্থাগার কার্ড না নিলেও পরীক্ষার আগে ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করতে হয়। এ ছাড়পত্র নিতে অনেক সময় বিড়ম্বনারও শিকার হতে হয়। নষ্ট হয় সময়। এ ছাড়া পরীক্ষার ফল পেতেও দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

গত ২২ জানুয়ারি সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের (৪৮ ব্যাচ) স্নাতক পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে ওই বিভাগে পাঠানো পরীক্ষার ফলাফলে কৃতকার্য শিক্ষার্থীদের তালিকায় ছয় শিক্ষার্থীর নাম বাদ পড়ে। এসব শিক্ষার্থী নিজ নিজ হল থেকে এবং কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার থেকে ছাড়পত্র নিলেও ফলাফলের তালিকায় তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অন্যদিকে একই বিভাগের অন্য দুই শিক্ষার্থী হল থেকে এবং কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার থেকে ছাড়পত্র না নিলেও তাদের ফল প্রকাশ করা হয়। বিষয়টি অবগত করানোর জন্য ফল না পাওয়া ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক সালাউদ্দিন আহমেদের কাছে গেলে তিনি শিক্ষার্থীদের বলেন, ফল প্রকাশিত না হওয়ার জন্য কোনো দায় পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় নেবে না।

এ প্রসঙ্গে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী নাহারিন জান্নাত বলেন, ‘হল ক্লিয়ারেন্স (ছাড়পত্র) ও গ্রন্থাগার ক্লিয়ারেন্স থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে আমার ফল প্রকাশ করা হয়নি। বিষয়টি জানাতে আমি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছে গেলে তিনি আমাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন।’

ডিজিটাল পদ্ধতিতে ফাইলের কাজ সম্পাদন করে সময় ও খরচ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে গত বছর ১৩ আগস্ট বাংলাদেশ মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) মিলনায়তনে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ডি-নথি কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। এরপর ছয় মাস অতিবাহিত হলেও তার বাস্তবায়ন করতে পারেনি কর্র্তৃপক্ষ।

এখনো শিক্ষার্থীদের বার্ষিক বা অর্ধবার্ষিকী চূড়ান্ত পরীক্ষার ফরম সত্যায়িত ও টাকা জমা দেওয়ার জন্য অন্তত পাঁচটি দপ্তরে যেতে হয়। অপেক্ষা করতে হয় তিন-চার দিন। সাময়িক সনদ তোলার জন্য আবেদন করতে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে দৌড়াতে হয় কমপক্ষে তিন দিন। আবেদনের পর অপেক্ষা করতে হয় ১৩ দিন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এসব করতে একদিকে যেমন সময় নষ্ট হয়, অন্যদিকে ভোগান্তিও পেতে হয়। গত বছর অক্টোবরে বড় বোনের স্নাতক পরীক্ষার সাময়িক সনদপত্র তোলার জন্য পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে যান অহনা হোসাইন। প্রথমে তাকে একটি আবেদন ফরম দেওয়া হয়। ফরমটি প্রাধ্যক্ষের স্বাক্ষরের জন্য হল অফিসে জমা দিলে পরদিন সেটি তাকে ফেরত দেওয়া হয়। ওই ফরমটি তিনি আবার বিভাগের সভাপতির স্বাক্ষরের জন্য জমা দিলে পরদিন হাতে পান। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংক শাখায় ২০০ টাকা জমা দিয়ে টাকা জমার রসিদসহ ফরমটি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের অফিসে জমা দিলে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে তাকে বলা হয়, ১৩ দিন পর সনদ নিতে যাওয়ার জন্য। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া সামলাতে গিয়ে সনদ হাতে না পাওয়ায় চাকরির মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি অহনার বড় বোন ফারিন হোসাইন।

শিক্ষার্থীরা কাগজপত্রের পরিবর্তে ডিজিটাল পদ্ধতিতে অটোমেশন প্রক্রিয়ার জন্য আবেদন করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু কোনো প্রতিকার পায়নি বলে অভিযোগ তাদের। গ্রন্থাগার থেকে বই পড়ার জন্য কার্ড না নেওয়া সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার থেকে ছাড়পত্র নেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের আবেদন করার কারণ জান১েত চাইলে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পরিচালক অধ্যাপক এম শামীম কায়সার বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি বিষয়টি সমাধানের জন্য। কিছুদিন পর থেকে অনলাইনে সব শিক্ষার্থীর তথ্য নিবন্ধন করা হবে। তখন আর কার্ডের ঝামেলা থাকবে না।’

শিক্ষার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মো. সালাহউদ্দিন বলেন, ‘ডিজিটাল নথির কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন। প্রশাসনিক ভবনের কাজ চলছে। শেষ হলেই পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকে শুরু হবে।’ এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড নূরুল আলম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিজিটাল নথির (ডি-নথি) কাজ শুরু হয়েছে। রেজিস্ট্রার ভবনের কাজ শেষ হলে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের কাজ শুরু হবে। তখন আর ভোগান্তি থাকবে না।’