সাকিব আল হাসানরা যখন হতাশায় ডুবছিলেন, বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটাররা তখন উচ্ছ্বাসে ভাসছিলেন। ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপে টানা হারছিল যখন ছেলেরা। নিগার সুলতানা জ্যোতিরা তখন ঘরের মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে লড়াই করে সিরিজ জিতেছিলেন। গত নভেম্বরের শুরুতে টি-টোয়েন্টি সিরিজে হারানোর পর মিরপুরের হোম অব ক্রিকেটে ৫০ ওভারের ক্রিকেটে লড়েন তারা। প্রথম ম্যাচে হেরে গেলেও পরে ঘুরে দাঁড়ায়। সুপার ওভারে গিয়ে ম্যাচও জিতেন। একইভাবে ভারতের সঙ্গে লড়াই করে একেএম মাহমুদ ইমনের শিষ্যরা। তাদের এমন পারফরম্যান্স বাংলার নারী ক্রীড়াজগতের আকাশে যেন নতুন চাঁদের উদয়।
অথচ এই দেশে নারী ক্রিকেটে কোনো ভবিষ্যৎ নেই বলে একসময় প্রচার করা হতো। সেই তত্বকে যেন ভুল প্রমাণ করলেন জ্যোতিরা। গর্ব করেই সেই কথাটা ইএসপিএন ক্রিকইনফোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন। এসময় তিনি এই উপত্যকার সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থান নিয়েও কথা বলেছেন।
নারী দিবসে পাওয়ার প্লে পডকাস্টে নিগার বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমাদের সূচনাটা মসৃণ ছিল না। কারণ আমরা মুসলিম প্রধান একটা দেশে বাস করি। ক্রিকেটকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তটা এখানকার একজন মেয়ের জন্য মোটেও সহজ কোনো সিদ্ধান্ত না। এখানকার সংস্কৃতি রক্ষণশীল। এদেশের সমাজ মনে করে মেয়েদের বাড়িতে থেকে বাড়ির সব কাজ করা উচিৎ। তবে আমি সব নারী খেলোয়াড়দে বাবা-মাকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। কারণ তারা সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্তানদের ইচ্ছাকে সমর্থন করেছেন। তাই আমরা ক্রিকেটার হতে পেরেছি।’
গত বছরের নভেম্বরের মিরপুরে পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ বাঁচিয়ে রাখার ম্যাচে হাল ধরেছিলেন নিগার। তার ৫৪ রানের ইনিংসে ভর করে ১৬৯ রানের সংগ্রহ দাঁড় করায় বাংলাদেশ। তবে ৪৭ ওভার শেষে পাকিস্তান ৭ উইকেটে ১৫৩ রান সংগ্রহ করে বসে। ঠিক সেই সময় ডায়ানা বেগকে আউট করেন টাই করে বাংলাদেশ। সুপার ওভারের শেষ বলে নাশরা সান্ধুকে মিড অফের উপর দিয়ে চার মেরে সিরিজে সমতা ফেরান নিগার।
সেই ম্যাচের বর্ণনা দিয়ে জ্যোতি বলেন, ‘চার মারার পর আমি গ্যালারিতে আমার বাবা-মায়ের কাছে ছুটে গিয়েছিলাম। তাদের জড়িয়ে ধরেছিলাম। এটা ছিল আমার জীবনের সেরা মুহূর্ত। আমি মনে করি এটা অনেক মা-বাবাকে অনুপ্রাণিত করেছে। অনেক মেয়ে ক্রিকেটকে পেশা হিসেবে নেওয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু করেছে বলেও আমার বিশ্বাস।’
২৬ বছর বয়সী বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের অধিনায়ক বলেন, ‘আমি একটি ছোট শহরের খুব মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছি। আমার জন্য, এটা খুব কঠিন ছিল। আমি যখনই মাঠে যেতাম, লোকে অনেক নেতিবাচক কথা বলত। তারা বলেছে, বাংলাদেশে নারী ক্রিকেটারদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, আমাদের জার্সি-টি-শার্ট পরে বাইরে যাওয়া উচিত নয়। এটা ভালো সংস্কৃতি ছিল না। সবচেয়ে কঠিন অংশটি ছিল বাবা-মায়েরা তাদের মেয়েদের তাদের স্বপ্ন খেলতে দিতে ইচ্ছুক ছিলেন।’
২০১৮ সালে নিগারের ক্যারিয়ারের তিন বছর পূর্ণ হওয়ার পর টি-টোয়েন্টি এশিয়া কাপের ফাইনালে শেষ বলের থ্রিলারে ভারতকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। সেই বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি ছিল আমাদের প্রথম বড় অর্জন এবং এটি সমগ্র বাংলাদেশের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। এরপরই শুরু হয় বিপ্লব। আমরা আর পেছনে ফিরে তাকাইনি।’
এর এক মাস পর বাংলাদেশ ২০১৮ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের প্রতিটি ম্যাচ জিতে তাদের তৃতীয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পৌঁছেছিল। নিগারের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ, তারা তাদের প্রথম ৫০ ওভারের বিশ্বকাপের জন্যও যোগ্যতা অর্জন করেছিল। ২০২২ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপের কয়েক মাস পর আইসিসি তার প্রথম নারী ফিউচার ট্যুর প্রোগ্রাম (এফটিপি) উন্মোচন করে, যা নিয়মিত হওয়ায় নিগার এটাকে ‘গেম চেঞ্জার’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন, ‘এভাবেই শুরু হয়েছিল আমাদের পথ চলা। আমরা নিয়মিত বড় দলগুলোর সঙ্গে খেলা শুরু করি। সাফল্যও পাই। ভারত-পাকিস্তানকে হারিয়ে আমরা প্রমাণ করেছি, মেয়েদের ক্রিকেটেরও ভবিষ্যৎ আছে।’