অনেকের মতো ইয়ারজান বেগমের গল্পটাও মিলেছে যাচ্ছে। অসচ্ছল পরিবারে বেড়ে ওঠা, সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিকে পেছনে ফেলতেই ঢাল হিসেবে বেছে নেওয়া ফুটবলকে। স্বপ্ন পূরণে তিনিও পাশে পেয়েছিলেন একজন নিবেদিত প্রাণ কোচ। সমাজ পঞ্চগড় থেকে উঠে আসা ১৫ বছরের কিশোরীকে লড়াকু হতে, তেকাঠীর নিচে প্রাচীর হয়ে দাঁড়াতে শিখিয়েছে। আর এত এত প্রতিবন্ধকতা পেড়িয়ে এসে তিনি হয়েছেন সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ ওমেন্স চ্যাম্পিয়নশিপের সেরা গোলকিপার।
ভারতের বিপক্ষে ফাইনালে টাইব্রেকারে তিনটি শট ঠেকিয়ে দিয়ে নেপালে দলকে দিয়েছেন শিরোপা জয়ের উপলক্ষ। অথচ ইয়ারজানের এক সময় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিতে চেয়েছিলেন। তবে আর দশটা মেয়ের মতো তাকে সমাজের কাছে হার মানতে দেননি কোচ আবু তালেব টুকু। গ্রামের মানুষের কটূকথার সামনে ঢাল হয়ে আগলে রেখেছেন, দেখিয়েছেন বড় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন।
একটা পারফরম্যান্সেই ইয়ারজানকে বড় ফুটবলার বলে দেওয়ার সময় আসেনি ঠিক। তবে টাইব্রেকারের পর্বতসম চাপ জয় করে যেভাবে তিনি তিনটি শট রুখে দেন, সেটা দেখে অবাক হতেই হয়।
প্রথম বিমানে ওঠা, বিদেশে প্রথম আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়েই নিজের শক্ত মানসিকতার ছাপ রেখেছেন তিনি। রবিবার ইয়ারজান দেশ রূপান্তরের কাছে শুনিয়েছেন তার ফুটবলে আসার লড়াইয়ের কথা।
পঞ্চগড়ে ভীষণ গরিব পরিবারে জন্ম তার। নিজেই জানালেন, 'পরিবারে আমার বাবা-মা আছেন। আর ছোট একটা বোন। বাবা অসুস্থ, ওনার শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে। মা কাজ করে, এভাবেই আমাদের সংসার চলে। তবে বাবা আমাকে সমর্থন দিতেন সবসময়। স্কুল জীবনে খেলতাম। এক পর্যায়ে খেলা বন্ধ হয়ে যায়। তখন আমার এলাকার বড় ভাই, যিনি আমার কোচ আবু তালেব আমাকে খুঁজে বের করে ওনার অ্যাকাডেমিতে ভর্তি করে দেন। ওইখানেই ভাইয়ের কাছে আমার হাতেখড়ি। আমার যাতায়াত ভাড়া ছিল না। কোচই আমাকে সেটা ব্যবস্থা করে দিতেন।'
এরপর যোগ করেন, 'আমার কোচেরই সবচেয়ে বড় অবদান। উনি অনেক পরিশ্রম করেছেন, অনেক মানুষের অনেক কথা শুনতে হয়েছে। তবে উনি আমাকে নিয়ে হাল ছাড়েননি। উনি বলেছিলেন আমাকে ঢাকায় খেলানোর কথা। গ্রামের মানুষ অনেক খারাপ কথা বলতো। কোচ বলতেন, সেগুলো যেন আমি কানে না তুলি, এসব কথা হবেই।'
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনে নারী দলের ক্যাম্পে যোগ দিতে প্রথমে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ট্রায়াল অংশ নিয়েছিলেন ইয়ারজান। তিনি বলেন, 'বয়স কম বলে বাফুফে আমাকে অনূর্ধ্ব-১৬ দলের জন্য নেয় বাফুফে। এখন আমি স্বপ্ন দেখি রূপনা আপুর (জাতীয় দলের কিপার রূপনা চাকমা) মতো একজন ভালো গোলকিপার হতে চাই।'
একটা সাফল্যে শুরু হলো লড়াকু ইয়ারজানের পথচলা। সামনে অনেক পথ বাকি। সেই পথচলাটা মসৃণ হোক, এটাই প্রত্যাশা।