শিক্ষার্থীদের সব দাবি-দাওয়া আদায়, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) বরাবরই অগ্রণী ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া দেশের প্রতিটি লড়াই-সংগ্রামে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছে ডাকসু। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় তার শতবর্ষ পার করলেও ডাকসু নির্বাচন হয়েছে মাত্র ৩৭ বার। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে প্রায় নিয়মিত ডাকসু নির্বাচন হলেও স্বাধীন দেশে ৫৩ বছরে এই নির্বাচন হয়েছে মাত্র আটবার। সর্বশেষ প্রায় তিন দশকের অচলাবস্থা ভেঙে ২০১৯ সালের ১১ মার্চ দেশের সেকেন্ড পার্লামেন্টখ্যাত ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। গত চার বছর ডাকসু নির্বাচন না হলেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফি নিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়। এ সময়ে কমপক্ষে এক কোটি টাকা ফি নেওয়া হয়েছে।
সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচনের পর এই নির্বাচন ক্যালেন্ডার ইভেন্ট হিসেবে চালু রাখার কথা বললেও পাঁচ বছরেও নতুন নির্বাচন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অর্থবহ কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। আবার কত বছর অপেক্ষা করতে হবে কিংবা পরবর্তী ডাকসু নির্বাচন কবে হবে সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ডাকসুর ইতিহাস থেকে জানা যায়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশে ছাত্র সংসদের বিষয়টি আছে। ছাত্র সংসদের জন্য আলাদা গঠনতন্ত্র আছে। ১৯৭৩ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশে ডাকসুর কথা বলা হয়েছে। গঠনতন্ত্রে বলা হয়েছে, প্রতি বছর ডাকসু নির্বাচন হবে। তবে এ গঠনতন্ত্রকে থোড়াই কেয়ার করছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একটি সূত্র বলছে, সরকারের সবুজ সংকেত না পাওয়া পর্যন্ত শিগগির নির্বাচন দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। যদিও এ সময়ে শিক্ষক সমিতির নির্বাচন, সিনেট, সিন্ডিকেটসহ সব পর্যায়ের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষার্থী ও ক্রিয়াশীল বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের পক্ষ থেকে ডাকসু নির্বাচনের দাবি জানালেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগ্রহ দেখা যায়নি।
শিক্ষার্থী ও ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা বলছেন, ডাকসু নির্বাচন শিক্ষার্থীদের কথা বলার একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিয়েছিল। শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় ও হলের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে খোলামেলা কথা বলতে পারছিলেন। হলগুলোতে গেস্টরুম নির্যাতন কমে আসে। নতুন করে নির্বাচন না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের কথা বলার জায়গা আবারও সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। সরকারের সবুজ সংকেত না পাওয়া, সরকার সমর্থক ছাত্রসংগঠনকে সুবিধা দেওয়া এবং ক্যাম্পাসে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের কোনো উদ্যোগ সরকারঘনিষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিচ্ছে না বলে অভিযোগ কারও কারও।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা শিগগিরই ডাকসু নির্বাচনের দাবি করছেন। তারা মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যাণে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণ চায় না প্রশাসন। সে কারণেই ডাকসু নির্বাচনে অনীহা। প্রকাশ্যে সেভাবে আন্দোলন করতে দেখা না গেলেও ডাকসু নির্বাচনের পক্ষেই মত ছাত্রনেতাদের। গত নির্বাচনে বিজয়ী নেতারাও চান ডাকসু নির্বাচন হোক। সর্বশেষ ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) নুরুল হক নুর নির্বাচন না হওয়ার পেছনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং উপাচার্যকে দুষছেন। তার দাবি, তাদের গাফিলতির কারণেই নির্বাচন হচ্ছে না। তিনি মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং ভিসির ব্যর্থতার কারণে ডাকসু নির্বাচন হচ্ছে না। তারা চাইলে খুব তাড়াতাড়ি ডাকসু নিবার্চন করা সম্ভব।
ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়মিত হওয়ার পক্ষেই মত দিয়েছেন ঢাবি শিক্ষক সমিতির নেতারা। ভবিষ্যৎ জাতীয় নেতৃত্ব গঠনে এটি জরুরি বলে মনে করেন তারা। সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. নিজামুল হক ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা চাই নিয়মিত ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। ছাত্ররা চাইলে আমরা তাদের হয়ে দাবি জানাব।’
এদিকে ডাকসু সচল না থাকলেও প্রতি বছরই ফি দিতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। এ ছাড়া লাখ লাখ টাকা বেতন-ভাতাও পাচ্ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব পরিচালকের দপ্তরের তথ্য বলছে, ডাকসু ও হল সংসদের ফি হিসেবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতি বছর ১২০ টাকা হারে আদায় করা হচ্ছে। সে হিসেবে ডাকসু নির্বাচনের পর চারটি শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তি করিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ ছাড়া ২০১৮-১৯ সেশন এবং ২০১৭-১৮ সেশনেরও অনার্স-মাস্টার্স প্রোগ্রাম চালু ছিল। সে হিসেবে গত চার বছরে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ১ কোটি টাকার বেশি ফি আদায় করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ ছাড়া ডাকসুর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতাবাবদ প্রতি বছর খরচ করা হচ্ছে কমবেশি ৩০ লাখ টাকা। যদিও তারা সেখানে অলস সময় কাটাচ্ছেন।
ডাকসুর কার্যক্রম সেভাবে না থাকায় এ খাতের ব্যয়কে ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থের অপচয়’ বলে মনে করেন অনেকেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ মমতাজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ডাকসুর নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই। তাই যে টাকাটা ডাকসুর নামে নেওয়া হচ্ছে তা কেন্দ্রীয়ভাবে অন্যান্য সব খাতে খরচ করা হচ্ছে। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বাজেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আয় হিসেবে ধরা হচ্ছে। ডাকসুর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আগে থেকেই নিয়োগপ্রাপ্ত। তাই তাদের বেতন-ভাতা আমাদের দিতেই হয়।’
ডাকসু প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাংলাদেশের প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এই ছাত্র সংসদ। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে চালিকাশক্তির ভূমিকায় ছিল এই সংসদ। আজকের তোফায়েল আহমেদ, রাশেদ খান মেনন, মতিয়া চৌধুরী, আ স ম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ অনেকেই ছিলেন ডাকসুর জননন্দিত নেতা। ডাকসু নেতাদের বলিষ্ঠ উদ্যোগেই ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলায় প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়।
ডাকসু নির্বাচন চলমান না থাকাকে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একসময় ছাত্র সংসদের নির্বাচন ছিল উৎসবমুখর। মেধাবী ছাত্ররাই নির্বাচিত হতো, মেধাহীনরা নির্বাচিত হতে পারত না। তাদের গান করতে হতো, ডিবেট করতে হতো, নাটক করতে হতো, খেলাধুলা করতে হতো। চৌকস ছেলেরাই নেতৃত্বে আসত। সেখান থেকেই ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গঠিত হতো। এখন তা হয় না।’
ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি গড়ে ওঠে। আমরা চাই নেতৃত্বের বিকাশ হোক। যে নেতৃত্বে শিক্ষা এবং সহ-শিক্ষা কার্যক্রম আরও বহুলাংশে সম্প্রসারিত করতে পারবে।’
তিনি বলেন, ডাকসু থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ ডাকসুর নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করে যেকোনো সমস্যা সমাধানে আরও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। সেজন্য ডাকসুর প্রয়োজন আছে। সময় সুযোগ হলে এবং অনুকূল পরিবেশ পেলে আমি সেদিকে মনোযোগ অবশ্যই দেব।’