যুদ্ধ কেড়ে নিয়েছে আরও বেশি কিছু

চলতি সপ্তাহে পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এ সময়ে আলোচনায় উঠে এসেছে ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত ফিলিস্তিনি নারীদের কথা। বিভিন্ন সূত্র অবলম্বনে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

বিশ্ববাসী যখন বিভিন্ন দিবস উদযাপন করছে, নারী স্বাধীনতার কথা বলছে, তখন অনেকেরই চোখ নিবদ্ধ গাজার দিকে।

আন্তর্জাতিক এনজিও অ্যাকশন-এইডের মতে, বর্তমান বিশ্বে পূর্ণবয়স্ক ও কিশোরী নারীদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে গাজায়। সেখানে সহিংসতার ‘অভূতপূর্ব মাত্রার’ সম্মুখীন হচ্ছে তারা। প্রতি ঘণ্টায় তিনজনের বেশি নারী ও কিশোরীকে হত্যা করা হচ্ছে।

এ পর্যন্ত নিহত ৩০ হাজারের বেশি মানুষের মধ্যে ৯ হাজার নারী। উপরন্তু প্যালেস্টাইন সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ স্ট্যাটিস্টিকস জানিয়েছে, ইসরায়েলি হামলায় আহত ৭২ হাজার ১৫৬ জনের মধ্যে ৭৫ শতাংশই নারী।

যারা বেঁচে আছেন তারা বাস্তুচ্যুতি, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের অভাব, শিশুর যত্ন এবং যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য পরিষেবা থেকে মারাত্মকভাবে বঞ্চিত হচ্ছে।

বিশ্ব কি তাদের পরিত্যাগ করেছে

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার নারীরা ভাবছেন, বিশ্ব হয়তো তাদের পরিত্যাগ করেছে। সাংবাদিক আবীর আইয়ুবের মিডল ইস্ট আই-এ প্রকাশিত এক লেখায় এমনটাই বলেন অ্যাকশন-এইডের কর্মকর্তা রিহাম জাফারি। তিনি বলেন, সবচেয়ে মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য প্রতিদিন তাদের মরিয়া সংগ্রাম করতে হয়। কয়েক মাস ধরে এ দুঃস্বপ্নের ভেতর তারা ভাবছে। গাজার নারী ও মেয়েরা ভাবছে কেন বিশ্ব তাদের পরিত্যাগ করেছে!

আবীর আইয়ুব জানান, গাজার নারীরা মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবে পাওয়া ত্রাণে স্যানিটারি প্যাড না দেওয়ার অভিযোগ করেছেন। আর এ অভাব পূরণের জন্য অনেক নারী তাদের মাসিকের সময় অস্থায়ী প্যাড হিসেবে শিশুর ডায়াপার কেটে ব্যবহার করছেন। অন্যরা বিকল্প হিসেবে কাপড়ের টুকরো ব্যবহার করছেন বলে জানান। সম্প্রতি দক্ষিণ গাজার একদল নারী একটি কর্মশালা শুরু করেছেন। সেখানে দেখা গেছে তারা মানবিক সংস্থার দেওয়া তাঁবুর স্ক্র্যাপ ব্যবহার করে স্যানিটারি প্যাড সেলাই করছেন।

আলজাজিরায় আরেক ফিলিস্তিনি নারী সাংবাদিক মারাম হুমেইদ জানান, নাদা আবদেলসালামের কথা। ৩৪ বছর বয়সী ওই নারীর সঙ্গে কথা বলেন হুমেইদ। নাদা তাকে বলেন, তার আট সন্তান। এমন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তাদের দেখে রাখতে গিয়ে তিনি ভুলে গেছেন দিন-তারিখের হিসাব। তার মতে, গাজার নারীরা এ যুদ্ধে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। আমাদের বোঝা বহুগুণ বেড়েছে, এবং তাদের গোপনীয়তার বোধ হারিয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘এই যে আমি রাস্তায় তাঁবুতে বসে আছি, জীবনের মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত। পানি নেই, বিদ্যুৎ নেই, বাথরুম নেই, স্যানিটেশন নেই। কিছুই না।’

যুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েলি উচ্ছেদের মুখে পড়ে নাদা গাজা শহরের মাগাজি শরণার্থী শিবির থেকে মধ্য গাজার দেইর এল-বালাহয় পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। তার বাড়ি বোমায় ধ্বংস করা হয়। নাদা বলেন, আমি শুধু আমার পরা কাপড় এবং আমার বাচ্চাদের জন্য কিছু জামাকাপড় নিয়ে বেরিয়েছিলাম। আমি কখনো ভাবিনি যে এ পর্যায়ে পৌঁছাব। আমার আলমিরা এক সময় জামাকাপড়ে ভর্তি ছিল। আর এখন আমি তাঁবুর বাইরে যেতে পারি না জীর্ণ, ছেঁড়া জামাকাপড় পরে। নামাজ পরতে, ঘুমাতে, বাইরে যেতে একটাই

পোশাক পরি।

হুমেইদ জানাচ্ছেন, যুদ্ধে নাদা শুধু বাড়ি এবং সম্পত্তি হারাননি। আরও বেশি কিছু কেড়ে নেওয়া হয়েছে তার কাছ থেকে। তার আত্মবোধও হারিয়ে গেছে। ওই নারী বলেন, একজন নারী বলতে কী বুঝায় আমি ভুলে গেছি এ যুদ্ধে। আমার বয়স কয়েক দশক বেড়ে গেছে। এমনকি আমার চেহারায়ও তা প্রতিফলিত।

নাদা বলেন, যুদ্ধের আগে আমরা বেকারি থেকে রুটি কিনতাম, মেশিন দিয়ে কাপড় ধুয়েছি এবং পরিষ্কার, আধুনিক অ্যাপার্টমেন্টে থাকতাম। এখন আমরা প্রস্তর যুগের পদ্ধতিতে ফিরে এসেছি, খোলা আগুনে রুটি সেঁকছি এবং হাত দিয়ে কাপড় ধুই। এটি এমন এক কষ্ট যা আমি চাই না কোনো নারীর জীবনে আসুক।

বাস্তুচ্যুতির কঠোর জীবন

জাতিসংঘ জানিয়েছে, গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরুর সময় থেকে এ পর্যন্ত আনুমানিক ৫০ হাজার গর্ভবতী ছিল। ব্রিটিশ দাতব্য সংস্থা অক্সফাম জানিয়েছে এ সময়ে, মানসিক চাপ এবং আঘাতের কারণে এসব নারীর অকাল জন্মদানের হার বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা কেয়ারের মতে, কিছু নারীকে ভয়ে গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। যার ফলে গর্ভপাত ৩০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা জানাচ্ছে, অনাহার, তীব্র প্রতিকূলতা এবং মৃত্যু ও রোগের হুমকির চ্যালেঞ্জের মধ্যে কোনো চিকিৎসা সহায়তা ছাড়া নারীদের সন্তান প্রসব করতে হয়েছে। তারা তাঁবুতে সন্তান প্রসব করেছেন। কেউ কেউ অপ্রশিক্ষিত নারীদের সহায়তায় বাথরুমে প্রসব করেছেন। এনজিও প্রতিবেদনে জানা গেছে, অ্যানেসথেশিয়া ছাড়া অনেক নারী সিজারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দিচ্ছেন।

জাতিসংঘ বলেছে, গাজায় বিধবা নারীর সংখ্যা বেড়েছে। এমন পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৩,০০০ বেড়েছে। এর কারণ গাজা জুড়ে পুরুষদের প্রাণহানি। যার ফলে প্রায় ১০ হাজার শিশু তাদের বাবাকে হারিয়েছে। ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটর জানিয়েছে, ২৪ হাজারের বেশি শিশু তাদের মা-বাবাকে হারিয়েছে।

হুমেইদ নাদার কাছাকাছি তাঁবুতে বাস করা আরেক নারীর সঙ্গে কথা বলেন। তার নাম সাওসান আল-জেইন, বয়স ৫০। তিনি আত্মীয়দের সঙ্গে থাকছেন। গাজা শহরের পূর্বে সালাহ আল-দিন স্ট্রিটে তার বাড়ি ছিল। যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই বোমা হামলায় গুরুতর আহত হয়ে চোখ হারান তিনি। তারও আট সন্তান।

তিনি জানান, আমরা সেদিন স্বাভাবিকভাবে বসে ছিলাম, হঠাৎ আমি নিজেকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পেলাম। হাসপাতালে গেলে আমাকে বলা হলো আমার চোখে গুরুতর আঘাত লেগেছে এবং চোখ অপসারণ করা হয়েছে। আমার এখন একটি চোখ আছে এবং আমার আরও চিকিৎসা প্রয়োজন। যার জন্য বিদেশে যেতে হবে। আমার হাতেও আঘাত লেগেছে আমি সেটা নড়াতে পারছি না।

তিনি জানান, তার এক মেয়ে এবং তার জামাই বোমা হামলায় নিহত হয়েছেন। পরে তারা দেইর এল-বালাহে পালিয়ে আসেন। সাওসান জানান, চোখ হারানোর ঘটনা আমার মনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। এক সময় আমি ছিলাম পরিবারের স্তম্ভ। আর যেকোনো মায়ের মতো ছোট-বড় সবকিছু পরিচালনা করতাম। অথচ এখন আমি নিজের কাজ ঠিকমতো করতে পারি না। আঘাতের কারণে আমি খোলা আগুনে রান্না করতে পারি না বা জিনিসপত্র বহন করতে পারি না।

সাওসান বলেন, আগে, আমার বাচ্চারা আমার রান্না পছন্দ করত, কিন্তু এখন আমি পারি না। আমি এ পরিস্থিতিতে অক্ষম, যেখানে মা এবং নারীদের তাদের পারিবারিক বিষয়গুলো পরিচালনা করার জন্য প্রচুর শক্তি প্রয়োজন।

হুমেইদ জানাচ্ছেন, সাওসানের একমাত্র ইচ্ছা যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হোক, যাতে তিনি উত্তর গাজায় বাড়ি ফিরে যেতে পারেন, এমনকি যদি এটি ধ্বংসস্তূপও হয়ে থাকে। তার মতে, বাস্তুচ্যুতির জীবন কঠোর। আমরা জীবনের সহজতম দিকগুলোতে কষ্ট পাই। নারী হিসেবে আমাদের গোপনীয়তা নষ্ট হয়ে গেছে। প্রিয়জন হারানো এবং শিশুদের ভয়ে আমাদের হৃদয় ভারাক্রান্ত।

তবুও স্বপ্ন জাগে...

হুমেইদের কথা হয় ২৯ বছর বয়সী ইতেমাদ আসাফের সঙ্গে। তিনি তাঁবুর বাইরে একটি পাথরের ওপর বসে হাত দিয়ে কাপড় ধুচ্ছিলেন। ইতেমাদ দুই সন্তানের মা। আট মাসের তৃতীয় সন্তান তার পেটে। এ পরিস্থিতিতে পরিবারের যত্ন নিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। তিনি জাবালিয়া শরণার্থী শিবির থেকে দেইর এল-বালাহয় পালিয়ে আসেন। ইতেমাদ বলেন, যুদ্ধ আমাদের জীবনকে উল্টে দিয়েছে। প্রতি রাতে আমার মনে হয়, আমি খুব ক্লান্ত, এ অবস্থায় সন্তান জন্ম দিতে যাচ্ছি। এটি কি একটি গর্ভবতীর জন্য উপযুক্ত জীবন? যেখানে ঠাণ্ডা, খোলা বাতাস আর জীবনের মৌলিক চাহিদার অভাব রয়েছে। ইতেমাদ বলেন, আমার ছোট মেয়ের বয়স ১১ মাস তার ডায়াপার দরকার এবং সেগুলো কেনার সামর্থ্য নেই। আমরা শুধু খাবার কিনতে পারি এবং কখনো কখনো খাবারও কিনতে পারি না। এখন আমার বড় উদ্বেগের বিষয়, আমার সন্তানের জন্ম এবং চারপাশের ভয়াবহ পরিস্থিতি। বিশেষ করে গাজার হাসপাতালগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে বলে শুনেছি। স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। প্রসবের পর বিশ্রাম নেওয়ার উপযুক্ত জায়গাও নেই।

ইতেমাদ বলেন, তিনি কখনো কল্পনা করেননি জীবনে এত খারাপ সময় আসতে পারে। দুদিন আগে আমি প্রথমবারের মতো আয়নায় নিজেকে দেখি এবং আমার মুখ কেমন পাল্টে গেছে। আমার ত্বক রোদে কালো হয়ে গেছে। আমি নিজের যত্ন নিতাম, ঘুমানোর আগে আমার ত্বক এবং হাতকে ময়েশ্চারাইজ করতাম এবং গোসল ছিল আমার প্রতিদিনের রুটিন। এখন এগুলো দূরের স্বপ্ন।

আর ১৯ বছরের মারাহ আল-কায়েদ বলেন, যুদ্ধ তার নারীত্বের অনুভূতি কেড়ে নিয়েছে এবং তাকে এমন একটি ভূমিকায় ঠেলে দিয়েছে যা সে কখনো কল্পনাও করেনি। আমি পুরোপুরি ভুলে গেছি যে আমি একজন নারী। আমার মনে হচ্ছে আমি একটা ছেলে হয়ে গেছি। আমি ভোরবেলা বের হয়ে বেকারির সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে ৯ জনের পরিবারের জন্য রুটি কিনি। মাঝে মাঝে আমি পানির অভাবে মুখ না ধুয়েই রুটির লাইনে যাই।

মারাহ জানান, যুদ্ধের আগে অন্য মেয়েদের মতো ছিলেন। নিজের যত্ন নিতেন এবং কঠোর কোনো কাজ করার প্রয়োজন ছিল না। তিনি বলেন, আমি দাঁত ব্রাশ করেছি, নিজেকে সাজিয়েছি, গান শুনেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ফটোগ্রাফি শিখেছি। এখন আমার সব স্বপ্ন হারিয়ে গেছে। আমি খুব হিংস্র হয়ে উঠেছি, এবং আমার কণ্ঠস্বর উচ্চ। তিনি বলেন, আমি যুদ্ধের আগে যে মেয়েটি ছিলাম আবার তা হওয়ার জন্য আকুল হয়ে আছি।