কক্সবাজার শহরের প্রাণকেন্দ্রে কিংবা সি বিচে কোনো শ্বেতাঙ্গ চোখে পড়েনি। আমার দেখার সীমাবদ্ধতা হতে পারে, কিন্তু প্রায় এক দশক পর সমুদ্রপাড়ের শহরটাতে গিয়ে অন্য পরিবর্তনের পাশাপাশি এ ব্যাপারটা চোখে পড়ল। গত সপ্তাহে হুট করেই সংক্ষিপ্ত এক সফরে গেলাম। এর আগের বছর অফিসের খরচায় ছিলাম ইনানীর ধারে এক অতি দামি রিসোর্টে। সেই রিসোর্টের বিচও প্রায় এক্সক্লুসিভ। সেই সফরে মূল শহর বা মূল বিচ এলাকায় যাওয়া হয়নি। ফলত মূল দুটি বিচ লাবণী ও সুগন্ধী এলাকায় গেলাম বছর দশেক বাদে।
বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘতম সমুদ্রতটের গৌরব বহু বছর ধরেই শুনে আসছি। এ স্থানটা বিদেশিদের জন্য আকর্ষণীয় করে তোলাটা খুবই উপযোগী হতো। বিশাল তটে নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া উপভোগ করতে পারতেন পর্যটকরা। কিন্তু সাদা চোখে দেখে যা মনে হলো, কক্সবাজার বিদেশিদের কাছে আকর্ষণীয় হয়নি। একসময় ফরাসি ভাষার ভাষান্তরিক হিসেবে ট্যুরিস্টদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে জানি যে, হলি আর্টিজেন ঘটনার পর থেকে এ দেশে ট্যুরিস্ট, বিশেষ করে শ্বেতাঙ্গদের আসা কমে গেছে। এরপর আরেকটা ধাক্কা করোনা। সেসব ধাক্কা মনে হয় এখনো সামলে ওঠা হয়নি।
তবে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এবং কিছু বিদেশি বন্ধুদের সঙ্গে আলাপে জানলাম কক্সবাজারে পর্যটকরা আসেন না মূলত অতি খরচের ভয়ে! এ শহরের ট্যুরিস্টদের যে খরচ এর চেয়ে কম খরচে নাকি তারা থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ঘুরতে পারেন। আর আমাদের প্রচারইবা কই? ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে কক্সবাজার অনেক নিচের দিকে। কেউ কেউ বলেন, এ শহরে রাতের জীবন না থাকাও একটা সমস্যা। ব্যাপারটা আংশিক সত্য। নাইট ক্লাব বা পানের সুবিধা এখানেও আছে, তবে তা শুধুই পাঁচতারা হোটেলগুলোতে। যার জন্য আকাশছোঁয়া মূল্য দিতে হয়। মানে হচ্ছে, শেষতক ওই উচ্চ খরচেরই মামলা।
অথচ কক্সবাজারের বিপুল বিপুল দালান দেখলে তা মনে হবে না। একের পর এক হোটেল গড়েই উঠছে। এসবের প্রভাবে পরিবেশ এবং সমুদ্র কীভাবে ধ্বংস হচ্ছে তা নিয়ে এন্তার গবেষণা হয়েছে। সোনার ডিম পাড়া হাঁসের মতো শহরটাকে মেরে ফেলা হচ্ছে। আমার তো কলাতলীতে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যা বেলায় মনে হচ্ছিল শব্দ মাপলে ডেসিবলে তা দুপুরবেলার গুলিস্তানকে ছাড়িয়ে যাবে। একদিকে বলছি পর্যটকরা আসছেন না অন্যদিকে বলছি শহরটায় এত হোটেল আর মানুষের ঢল! এর কারণ, মূলত ২০ কোটি মানুষের দেশে বেড়াতে যাওয়ার জায়গার অভাব। জীবনে একবার কক্সবাজারে যেতে পারা অনেকেরই স্বপ্ন। আমার পর্যবেক্ষণ বলে, এখানে একটা সামাজিক শ্রেণির ব্যাখ্যা আছে। মধ্যম এবং নিম্নমধ্যম আয়ের লোকজনই এখানে মূলত পর্যটক হিসেবে যান। এদের বড় অংশই তরুণ। নিজের আগ্রহে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললাম। একটা দল এসেছে যারা ফ্রিল্যান্স করে। এ তরুণরা খুব বেশি উচ্চশিক্ষিত নয়, ফ্রিল্যান্স করে কিছু টাকা-পয়সা আয় করে দৈনিক জীবনের শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে এখানে এসেছেন। দুদিনের সফরে এদের কয়েক সপ্তাহের আয় খরচা হয়ে গেলেও তারা তুষ্ট। যদিও সত্যিকারের পর্যটন সেবা কী জিনিস তার ধারেকাছের স্বাদ এ বেচারারা পাননি। আবার পাসপোর্ট সংক্রান্ত জটিলতা, বিদেশভীতি এসব কারণে উনারা দেশের বাইরে সফর করারও সাহস পাননি। এদের মতো বেশ কয়েকটা গ্রুপ এসেছে যাদের বেশিরভাগই ছোটখাটো চাকরি বা ব্যবসা করেন। একটা বড় অংশ তরুণ দম্পতি মূলত মধুচন্দ্রিমা যাপনে ব্যস্ত। কিছু পরিবার আছে, যাদের দেখে মনে হলো মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত। আর বেশি কিছু বিভিন্ন কলেজ বা ইউনিভার্সিটির শিক্ষা সফর বা প্রমোদ ভ্রমণে। নিজে পর্যটক বিধায় এ বিষয়টা নিয়ে আগে বললাম। কিন্তু সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্যবেক্ষণ সম্ভবত কক্সবাজারের স্থানীয় সমাজব্যবস্থা। বছর ছয়েক আগে রোহিঙ্গাদের বাধ্যগত আগমনের পর থেকে এ শহরের অনেক কিছুর আগাপাশতলা পরিবর্তন হয়ে গেছে।
রোহিঙ্গাদের আগমনের পর এই এলাকায় বিপুল পরিমাণ অর্থের স্রোত এসেছে। বিদেশি দাতা সংস্থাদের টাকায় গড়ে উঠেছে প্রচুর আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় এনজিও। শুরুর দিকে এসব এনজিওতে বেতন ছিল বাংলাদেশের অন্য সেক্টরের তুলনায় অনেক বেশি। এ বেতনের কারণে ঢাকাসহ অন্য জায়গা থেকে অনেকে যোগ দেন। এরা সেখানে অন্যরকম একটা সম্প্রদায় তৈরি করেছেন। এদের স্থানীয়রা শুরু থেকেই ‘বিদেশি’দের মতোই ট্রিট করেছেন। উনারা যেসব বাসায় থাকেন সেগুলোর ভাড়া স্থানীয়দের চেয়ে অনেক বেশি। এমনকি বাজার করতে গেলেও এই বৈষম্য দেখা যায়। আমরা ঢাকায় বারিধারা, গুলশান বা ধানমন্ডির মতো এলাকায় এ ঘটনা দেখতে পাই।
এসব মানুষও তা মেনে নিয়েছেন। মূলত নিজেদের মতোই থাকেন। তাদের জন্য বেশ কিছু কফিশপ, এমনকি একটা ইংরেজি বইয়ের দোকানও স্থাপিত হয়েছে দেখলাম। এদের কেউ কেউ বললেন, প্রথমদিকে আইএনজিওগুলো নিজেরাই ইনানী কিংবা উখিয়ার দিকে বিলাসবহুল আবাসনের ব্যবস্থা করতেন। এখন তা কমে গেছে। এর বড় কারণ, বৈশ্বিক মন্দা, করোনা আর রোহিঙ্গাবিষয়ক রাজনীতির অনেক পেছনে পড়ে যাওয়া। এনজিওকর্মীরা বলছেন, অর্থের প্রবাহ নাকি প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এর প্রভাব পড়েছে নিচের দিকের কর্মীদের ওপর সবচেয়ে বেশি। নিচের দিকের কর্মীদের ভাগ আবার দুরকম। একদল ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েট। এরা চাকরিজীবনের শুরুতেই বেশ মোটা বেতন পেয়ে একধরনের জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। এখন বেকার হওয়ার পর আবিষ্কার করছেন চাকরির বাজার এত সুখের না। একই ঘটনা ঘটেছে আবাসনসহ অন্য খাতে জড়িত থাকা শ্রমিকদের ওপরও। তবে এর চেয়েও ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে স্থানীয়দের ওপর। কক্সবাজার এলাকায় শিক্ষাদীক্ষার হার এমনিতেই কম। প্রান্তিক অঞ্চল হওয়ার কারণে এসব এলাকার মানুষের সুযোগ বহুকাল ছিল অপ্রতুল। অল্প কিছু মানুষ যারা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পান তারা জীবিকার জন্য দেশ-বিদেশের অন্যত্র চলে যান। কিন্তু এনজিওগুলোতে শুরুর দিকে স্থানীয় ভাষা (রোহিঙ্গাদের ভাষা) জানাশোনা মানুষের বিপুল সুযোগ ছিল। অল্পশিক্ষিত তরুণরা এ সুযোগটা লুফে নিয়েছিলেন। এখন অর্থের প্রবাহ কমে যাওয়ায় এরা বিপাকে পড়েছেন। কিছুটা রাগ এসে পড়ছে ‘বিদেশ’ থেকে আসা ওপরের স্তরে থাকা ধনী এনজিওকর্মীদের ওপর। সামাজিক বিদ্বেষ বাড়ছে।
এমনিতেই এই এলাকায় সামাজিক ভাগ বেশি। বর্ণপ্রথার মতো প্রথম ভাগে থাকেন স্থানীয়রা, দ্বিতীয় ভাগে বৃহত্তর চাটগাঁর মানুষ। তৃতীয় স্তরে বোইঙ্গা বা চাটগাঁর বাইরের লোকজন। এখন যুক্ত হয়েছে আরও দুটি স্তর ‘স্থানীয় বিদেশি’ এবং শেষ স্তর রোহিঙ্গা। এই শেষ দল নিয়ে বহু লেখা হচ্ছে। বহু তহবিল হচ্ছে। কিন্তু রাজনীতির সমীকরণে উনারা এখনো বিভিন্ন ক্যাম্পেই বন্দি। নানা সংগত কারণেই উনাদের কাজকর্ম করার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। সৌভাগ্যবশত (ওনার দুর্ভাগ্য) একজনকে পেলাম যিনি রোহিঙ্গা হয়েও অবৈধভাবে কাজ করছেন। প্রচন্ড ভীত হয়ে পড়া মানুষটাকে অনেক অভয় এবং সান্ত্বনা দেওয়ার পর উনি অল্প কিছু কথা বললেন। কথাগুলো জানাই। ঘাটে ঘাটে চাঁদা দিয়ে, ভুয়া পরিচয়পত্র দেখিয়ে ওনাদের শহরে চলতে হয়। সেই সত্তরের দশক থেকেই এ দেশে চলে আসা রোহিঙ্গারা অপরাধচক্রের জন্য দারুণ কার্যকরী। ওনাদের অসহায়ত্ব কাজে লাগিয়ে নানারকম অপকর্ম হয়। আমার সঙ্গে কথা বলা ভাইটিও যেমন জানালেন, ইয়াবা পাচারসহ নানারকম অপরাধে তাকেও বাধ্য হয়ে জড়িত থাকতে হয়। রোহিঙ্গাদের কেন্দ্র করে বিপুল অর্থের প্রবাহ এলেও স্থানীয়রা তাদের নমশূদ্রের মতোই দেখেন।
এমনকি এই আইনও করা হয়েছে যে, রোহিঙ্গাদের জন্য যে তহবিল আসবে তার একটা অংশ স্থানীয়দের উন্নয়নের খাতে অতি অবশ্যই ব্যয় করতে হবে। কিন্তু দেখতে হবে এ উন্নয়ন আসলে কীভাবে হচ্ছে। আমাদের যেই উন্নয়নের ধারণা তাতে হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট না হয়ে হয় অবকাঠামোভিত্তিক। ঝা-চকচকে দালান, বিশাল বিশাল রাস্তা এগুলোকেই আমরা উন্নয়ন ভাবি। কিন্তু সেই তুলনায় মানবসম্পদ উন্নয়নে পয়সা খরচ করা হয় না। যোগাযোগের দারুণ উন্নতিতে কক্সবাজার এখন কোনোভাবেই প্রান্তিক এলাকা নয়। কিন্তু সেই তুলনায় স্থানীয়দের মধ্যে শিক্ষার হার বাড়ানো, গণস্বাস্থ্যর উন্নতি বা এসবের গুরুত্ব বোঝানোর যথাযথ প্রভাব চোখে পড়ছে না। সবার জন্য ভালো মানের প্রচুর স্কুল, হাসপাতাল চোখে পড়েনি। রোহিঙ্গা সাহায্যের অর্থ আরও কমে গেলে ব্যাপারটা আরও নাজুক হবে। শেষতক দেখা যাবে যে, এ পয়সা কাজে লাগিয়ে যা প্রাপ্তি হবে তা হচ্ছে শহরের কোনায় কোনায় (যেখানে ইউএনওসহ বড় বড় এনজিওর কার্যালয়) কার্পেটিং রাস্তা, বিমানবন্দর থেকে বিচ পর্যন্ত এলইডি ব্যানার সজ্জিত আলো ঝলমলে পথ আর দারুণ দারুণ অথচ পরিত্যক্ত কিছু দালান। সমুদ্রে ভাটার টান এলে যেমন কিছু আবর্জনা, অকেজো জিনিস পাওয়া যায় এমন। পরিবেশ বিপর্যয় আর আর্থিক অনটনে সমুদ্রপাড়ের প্রবল সামাজিক ভাগে ভাগ হওয়া শহরটা একটা এপোক্যালিপ্টিক রূপ নিতে পারে। একদিকে দূষণে ভরে যাবে অন্যদিকে বাড়তে থাকবে একশ্রেণির মানুষের প্রতি আরেক শ্রেণির প্রবল বিদ্বেষ।
অথচ এ শহরটা হতে পারত আমাদের সবচেয়ে সুন্দর, নান্দনিক, স্বর্গোদ্যান।
লেখক: সাংবাদিক
faizbsu002@gmail.com