পবিত্র রমজান মাস শুরু হয়েছে। বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা সিয়াম সাধনা করছে, নিজ পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে এবং ইবাদত-বন্দেগিতে নিজেদের আত্মনিয়োগ করছে। কিন্তু আমাদের গাজার মুসলমানদের জন্য পবিত্র এই মাসটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও শোকে ভরা। পাঁচ মাসেরও বেশি সময় ধরে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে। আমরা অসুখ ও অনাহারে দিনযাপন করছি। রমজান শুরু হলেও তাদের সহিংসতা ও বর্বরতা একটুও কমেনি।
এখন আমরা সামান্য সাহরি ও ইফতারের জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকি। শান্তিতে একটু ইবাদত-বন্দেগি করার জন্য নিরাপদ জায়গা খুঁজি। বলা যায়, এসব আমাদের জন্য এখন দুপ্রাপ্য। ইসরায়েলি জঙ্গি বিমান এবং বিস্ফোরণের ভয়ানক শব্দে আমি চোখ বন্ধ করে গাজার জাঁকজমকপূর্ণ রমজানের কথা স্মরণ করি। ভয়ানক বিস্ফোরণের মাঝেও অতীতের রমজানস্মৃতি আমাকে প্রাণবন্ত রাখে।
রমজান আসার দু-তিন সপ্তাহ আগেই এ মাসের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেত। চারদিকে একটা আমোদে ভাব বিরাজ করত। সবাই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে বের হতো। এ সময় বাজারে বিরাজ করত রমজানের ঐতিহ্যবাহী সব খাবার, ইফতার তৈরির সামগ্রী, নানা জাতের খেজুর, জুস, কোমল পানীয়, টক আচার এবং সুস্বাদু মসলা। বিশেষ করে বাহারি মসলার সুগন্ধে স্নাত হয়ে থাকত বাজার এবং বাজারের আশপাশ। রমজানের জন্য নতুন জামা-কাপড় কেনা হতো। ছোট বাচ্চাদের হাতে শোভা পেত বিভিন্ন রঙের ফেস্টুন। যাতে রমজানকে স্বাগত জানাতে বিভিন্ন পঙ্্তি লেখা হতো।
রমজানের চাঁদ ওঠার পর চমৎকার একটা পবিত্র মুহূর্তের সূচনা হতো।
গাজার আশপাশের মসজিদগুলো থেকে তারাবি নামাজের নান্দনিক তেলাওয়াত ভেসে আসত। বাচ্চারা সবচেয়ে উৎফুল্ল হতো। তারা দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত বাসার বাইরে থাকত, রাস্তায় খেলাধুলা করত, ফানুস উড়াত এবং রমজানের উল্লাসে দলবেঁধে ধর্মীয় গান গাইত।
শেষ রাতে পরিবারের সবাই একত্রে সাহরি খেত। সবাই দলবেঁধে ফজরের নামাজ আদায় করতে মসজিদে যেত। ফজর শেষে কেউ ঘুমাত। কেউ পড়াশোনা করত, অতঃপর স্কুলে যেত। কেউ কাজে বের হতো। যে যেখানেই থাকুক না কেন, বিকেল নাগাদ সবাই বাসায় ফিরে আসত। বিকেলে পবিত্র কোরআন পাঠের আসর হতো। বাচ্চারা ঘরে বা মসজিদে কোরআন তেলাওয়াত করতে যেত। বাবা-মা ও দাদা-দাদিরা বাচ্চাদের নবী রাসুলদের গল্প শোনাত।
সূর্যাস্তের এক ঘণ্টা আগে চলত ইফতার তৈরির প্রস্তুতি। বাড়ির বড়রা এ কাজে ব্যস্ত থাকত। ইফতারে থাকত মজাদার বাহারি খাবার। সুস্বাদু খাবারের সুগন্ধে মাত হতো পুরো এলাকা। ইফতার তৈরির কাজ শেষ হলে থালা ভর্তি ইফতার প্রতিবেশীদের দেওয়া হতো। কেউ কারও বাড়িতে ইফতার নিয়ে গেলে তাকেও আরেক থালা ইফতার দেওয়া হতো। এভাবে বাড়ি বাড়ি চলত ইফতার বিনিময়।
আজানের সময় ঘনিয়ে এলে পরিবারের সবাই এক টেবিলে বসত। সামনে থাকত বাহারি ইফতারসামগ্রী। আজানের সুমধুর সুর ভেসে আসলে মুখে তুলে নিত সুস্বাদু জুস-শরবত। প্রথমে খাওয়া হতো মজাদার খেজুর। এরপর অন্যান্য খাবার। ইফতার শেষে মাগরিবের নামাজ পড়ত সবাই। তারাবি নামাজ পড়তে নারী, পুরুষ ও বাচ্চারা দলবেঁধে মসজিদে যেত। তারাবি নামাজের মুগ্ধকর তেলাওয়াতে ব্যাকুল হতো হৃদয়।
রমজান মাস গাজার মুসলমাদের জন্য বছরের সবচেয়ে সেরা সময়। রমজানের সময় গাজা হয়ে ওঠে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গা। চারদিকে বিরাজ করে ইবাদতমুখর অবস্থা। কিন্তু এবার এই পবিত্র মাসে আমরা শান্তিতে ইবাদত করতে পারছি না। রমজানকে স্বাগত জানাতে রঙিন ফেস্টুন, ফানুস ও বাচ্চাদের শুভেচ্ছা গান প্রতিস্থাপিত হয়েছে ইসরায়েলি বোমা বিস্ফোরণের শব্দ ও ঝলকানিতে। শিশুদের খেলাধুলা ও আনন্দ-হুল্লোড়ের শব্দ প্রতিস্থাপিত হয়েছে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মানুষের আর্তচিৎকারে। প্রাণবন্ত এলাকাগুলো পরিণত হয়েছে কবরস্থানে। সব ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় মসজিদগুলোতে মানুষের ভিড় নেই। রাস্তায় লোকজনের ভিড় নেই।
এবারের রোজায় মানুষ ইফতার, তারাবি ও সাহরির জন্য আনন্দ উল্লাসে একত্রিত হয় না। একত্রিত হয় মৃতদের কবর দিতে। এখন যে উপলব্ধি আমাকে সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণা দেয় তা হলো, পৃথিবী ফিলিস্তিনের মানুষকে পরিত্যাগ করেছে। পৃথিবী ইসরাইলকে পবিত্র রমজান মাসেও মুসলিম নিধন চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে।
আলজাজিরা অনলাইন থেকে ভাষান্তর
আতিকুর রহমান