নির্ঝর চৌধুরী এ সময়ের একজন আলোচিত সংগীতশিল্পী। ভারতেও তিনি বেশ জনপ্রিয়। সম্প্রতি ঘুরে গেলেন যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি রাজ্য থেকে। সেখানে শোনালেন বাংলা গান। নির্ঝরের সঙ্গে গান ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে মুখোমুখি হয়েছেন মাহতাব হোসেন
যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরলেন। সেখানে বাংলা গান শোনানোর অভিজ্ঞতা কেমন?
ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকার টেক্সাসের ডালাস শহরে গিয়েছিলাম একাডেমি অব বাংলা আর্ট অ্যান্ড কালচার (অবাক-অইঅঈ) এর আমন্ত্রণে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে ট্রিবিউট করে খুব সুন্দর একটা অনুষ্ঠান করলাম সেখানে আরভিং আর্ট সেন্টারের কার্পেইন্টার হলে। পশ্চিমবঙ্গের অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত ছিলেন সেই অনুষ্ঠানে। উপহার হিসেবে আমার জন্য নিয়ে এসেছিলেন কলকাতার ফতুয়া। এরপর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অনুষ্ঠান করেছি নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটির বাংলাদেশ স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজনে।
আপনার এই সময়ের গান-গল্প বলুন
গত সপ্তাহে নজরুল সংগীতশিল্পী রত্না দাসের সঙ্গে ‘চৈতালী চাঁদনী রাতে’ শিরোনামে একটি দ্বৈত গান প্রকাশিত হয়েছে। এই সপ্তাহে মুক্তি পাবে শান শায়েকের ‘কালার অব ফোক’ প্রজেক্টে আমার গাওয়া একটা গান। পরিচালক রিয়াদ আমিনের একটা নাটকের গানে কণ্ঠ দিলাম। আমার কথা ও সুরে সংগীতায়োজন করেছে মার্সেল। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গের ‘শক্তি সম্মান ২০২৪’ সম্মাননা অনুষ্ঠানের থিম সং-এর কাজ করছি এই মুহূর্তে।
গানের পাশাপাশি শিক্ষকতাও করছেন। সে জীবন নিয়ে বলুন ‘কল্পতরু’-এ ক্রিয়েটিভিটি সেন্টারের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি আমি দুই বছর ধরে। এখানে ছেলেমেয়েরা ধ্রুপদী নাচ (মণিপুরী, ভরতনাট্যম, কত্থক, ওড়িশি) ও গান শেখে। আমরা নিয়মিত ভারত থেকে প্রশিক্ষক এনে আমাদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিই যেন তারা তাদের অনুশীলন ও পরিবেশনার মান আরও উন্নত করতে পারে।
এ সময়ের চলচ্চিত্রের গান নিয়ে অভিমত
এখন তো খুব ভালো কাজ হচ্ছে চলচ্চিত্র অঙ্গনে। নতুন নতুন সব কণ্ঠ নিয়ে নিরীক্ষামূলক কাজের দিকে পরিচালক, প্রযোজকরা আগ্রহী হচ্ছেন। আমার মনে হয় এই ইতিবাচক পরিবর্তনে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ওয়েব কনটেন্টগুলো প্রধান ভূমিকা রেখেছে।
এ প্রজন্মের গানের রুচির ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হয়েছে কী?
রুচির পরিবর্তন তো আসলে রাতারাতি হয় না। এটাতে সময় লাগে। বছরের পর বছর আমরা দর্শক-শ্রোতাদের নিম্নমানের গান, ছবি দেখিয়েছি শুনিয়েছি। সেখান থেকে উত্তরণের জন্য আবারও দীর্ঘ একটা সময় জুড়ে ভালো গানের প্রচার চালাতে হবে। এখন তো আবার ভাইরাল নামক ভাইরাসে আক্রান্ত সবাই। রুচির অবক্ষয়ের চূড়ান্ত দুর্দশা দেখা যায় এই ভাইরাল ভিডিওগুলোতে। আমাদের ছাত্রজীবনে বই পড়া ও কেনার অভ্যাসটাকে সংস্কৃতির সর্বোচ্চ স্তরের রুচি বলে গণ্য করা হতো। আর এখন মোবাইল কেনা আর টিকটকের নেশায় আচ্ছন্ন প্রজন্ম। আমরা ছাত্রজীবনে টাকা জমাতাম বইমেলায় গিয়ে পছন্দের লেখকদের বইগুলো কিনব বলে। বর্তমান প্রজন্ম টাকা জমায় দামি মোবাইল কেনা আর টিকটকের পোশাক কেনার জন্য। কারও জন্মদিনে এখন বই উপহার দিলেও অনেকে অবাক হয়। শিক্ষা, রুচি আর মূল্যবোধগত অবক্ষয়ের ব্যাপারটা তো এখানেই স্পষ্ট।
এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ সম্ভব? কী মনে হয় আপনার?
এই অবস্থার জন্য আমরাই দায়ী। দীর্ঘদিন ধরে করপোরেট ইন্ডাস্ট্রি, কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটবাজি আরও নানা ব্যাপার আছে এর ভেতরে। এ থেকে বের হয়ে আসতে অনেক সময় লাগবে। তবে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবেই। কারণ এত অসুস্থতা, নেতিবাচকতার মধ্যেও একদল তরুণকে আমি দেখি যারা পথশিশুদের পড়াশোনা করায়, সমাজের স্রোতের উল্টোদিকে গিয়ে নতুন কিছু নির্মাণের চেষ্টা করে, রাস্তায় অসুস্থ কুকুর বিড়ালের জন্য শেল্টার তৈরি করে, ধ্রুপদী গান-নাচের চর্চা করে। তখন আমি ভীষণ আশাবাদী হই যে রুচির সুস্থতা ফিরে আসবেই।