পরিবার মোটরসাইকেল কিনে না দেওয়ায় একাধিক দফায় ‘আত্মহত্যার চেষ্টা’ করেছিল রাজবাড়ীর এক তরুণ। পরে এক প্রকার ‘বাধ্য হয়ে’ তাকে মোটরসাইকেল কিনে দিয়েছিলেন তার বাবা। কিন্তু কিনে দেওয়ার তিন দিন পর সেই মোটরসাইকেলের দুর্ঘটনাতেই প্রাণ হারিয়েছে রাজন শেখ নামে সেই কিশোর। গতকাল মঙ্গলবার সকালে সদর উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের শান্তিনগর এলাকার ওই দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে তার এক বন্ধুরও।
গতকাল মর্মান্তিক ওই দুর্ঘটনা ছাড়াও কুমিল্লার চান্দিনায় মাছবাহী ট্রাক উল্টে নিহত হয়েছেন চার শ্রমিক। এদিন ঢাকা ও শরীয়তপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে আরও দুজনের। এ ছাড়া গত সোমবার রাতে ময়মনসিংহের নান্দাইলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে আরও দুজন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে অন্তত ১০ জন।
দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে বিস্তারিত :
রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানান, মঙ্গলবার সকালে সদর উপজেলায় আলীপুর ইউনিয়নে শান্তিনগর ব্রিজের পাশে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে সংঘর্ষে দুই কিশোর নিহত হয়েছে। নিহতরা হলো রাজন শেখ (১৬) ও তার সহপাঠী সোহাগ প্রামাণিক (১৬)। নিহত রাজন আলীপুর ইউনিয়নের গোপিনাথদিয়া গ্রামের বাসিন্দা লাল চাঁদ মিয়ার ছেলে। সোহাগ ইন্দ্রনারায়ণপুর গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবার নাম রব প্রামাণিক। দুজনই আলাদীপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাজনের বাবা একটি প্রজক্টের গাড়িচালক। ছোটবেলা থেকেই তার মোটরসাইকেল চালানোর খুব শখ। মোটরসাইকেল কিনে না দেওয়ায় একবার সে ঘুমের বড়ি খেয়ে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে। গত বৃহস্পতিবার সে বাড়িতে গলায় রশি দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। তাকে উদ্ধার করে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করার পর শুক্রবার সে বাড়িতে যায়। এরপর পরিবার থেকে বাধ্য হয়েই শনিবার তাকে মোটরসাইকেল কিনে দেওয়া হয়। মঙ্গলবার খুব সকালে সোহাগকে নিয়ে রাজন ঘুরতে বের হয়। রাজবাড়ী-ফরিদপুর সড়কের রাজবাড়ী সদর উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের শান্তিনগর সেতুর পাশে পল্লী বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খায়। পরে তাদের উদ্ধার করে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।
রাজনের চাচা আরিফ মিয়া বলেন, রাজন ছিল তার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান।সে দশম শ্রেণির ছাত্র। বয়সে ছোট হওয়ায় পরিবার থেকে তাকে কিছুতেই মোটরসাইকেল কিনে দিতে চায়নি। কিন্তু রাজন ছিল নাছোড়বান্দা। বাধ্য হয়ে তাকে কিনে দেওয়া হয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস; সেই মোটারসাইকেল কেনার তিন দিনের মধ্যেই দুর্ঘটনায় সে মারা গেল।
সোহাগের খালা রীনা খাতুন বলেন, রাজন ও সোহাগের বাড়ি একই জায়গায়। সকালে রাজন গিয়ে সোহাগকে ডেকে নিয়ে আসে। পরে আমরা এ দুর্ঘটনার খবর শুনতে পাই। সোহাগরা তিন ভাই, এক বোন। ভাইদের মধ্যে সে সবার ছোট। সোহাগের বাবা বিভিন্ন মেলায় খেলনার অস্থায়ী দোকান করেন।
সদর থানার ওসি ইফতেখারুর বলেন, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে রাজন তার নিজ মোটরসাইকেলে সোহাগকে নিয়ে আলীপুরের দিকে আসছিল। পথে শান্তিনগর এলাকায় পৌঁছলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে ধাক্কা লাগে। এতে ঘটনাস্থলেই দুজনের মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে পুলিশ দুজনের মরদেহ উদ্ধার করে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, অতিরিক্ত গতির কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
কুমিল্লা থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চান্দিনায় মাছবাহী ট্রাক উল্টে চারজন নিহত হয়েছেন। এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও পাঁচজন। গতকাল ভোর ৫টার দিকে কুমিল্লা জেলার চান্দিনা উপজেলার বেলাসর এলাকার আরএনআর পাম্পের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। মাছবাহী ট্রাকটি নোয়াখালী থেকে মাছ নিয়ে ঢাকা যাচ্ছিল।
দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন ভোলার মনপুরা এলাকার মনির হোসেন (২৮), একই এলাকার হাবীবুর রহমান (৩২), সাতক্ষীরা সদর থানা এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম (২৩) ও আক্তার হোসেন (৩৫)।
ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ে থানার ওসি মো. মনজুরুল আলম জানান, মাছবাহী ট্রাকটি নোয়াখালী থেকে ঢাকায় যাচ্ছিল। চান্দিনার বেলাসর এলাকায় সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রাকে ধাক্কা দিয়ে উল্টে যায় এটি। মাছবাহী ট্রাকটির ওপর ঘুমিয়েছিলেন শ্রমিকরা। ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই চারজন প্রাণ হারান। দুর্ঘটনায় আহতদের উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য চান্দিনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।
শরীয়তপুর প্রতিনিধি জানান, জেলার রুদ্রকরে কাভার্ড ভ্যান ও নছিমনের মুখোমুখি সংঘর্ষে লোকমান শেখ (৪৫) নামে এক নির্মাণশ্রমিক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ছয়জন। গতকাল সকাল ৬টার দিকে সদর উপজেলার রুদ্রকর ইউনিয়নের আমিনবাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত লোকমান শেখ উপজেলার রুদ্রকর ইউনিয়নের হোগলা মাকসাহার এলাকার মৃত মনব শেখের ছেলে। তার পরিবারে স্ত্রী ও দুই সন্তান রয়েছে।
পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার সকালে লোকমানসহ সাতজন শ্রমিক কাজের উদ্দেশ্যে নছিমনে হোগলা মাকসাহার থেকে মনোহর বাজারের দিকে যাচ্ছিলেন। তারা আমিনবাজার এলাকায় পৌঁছলে বিপরীত দিক থেকে আসা চাঁদপুরগামী একটি কাভার্ড ভ্যানের সঙ্গে নছিমনের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এ সময় নছিমনটি ছিটকে খালে পড়ে যায় এবং লোকমান সড়কে পড়ে গেলে কাভার্ড ভ্যানের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান।
এদিকে রাজধানী ঢাকার শাহবাগ এলাকায় বাসের ধাক্কায় এক নারী নিহত হয়েছেন। গতকাল সকাল সোয়া ৮টার দিকে আজিজ সুপার মার্কেটের সামনের রাস্তা পার হওয়ার সময় অজ্ঞাতনামা (৪৫) ওই নারী গুরুতর আহত হন। পরে তাকে উদ্ধার করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের জরুরি বিভাগে আনা হয়। এ সময় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
একইদিন সকাল ৬টার দিকে মহাখালী সেতু ভবনের পাশে একটি মাইক্রোবাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রোড ডিভাইডারের ওপর উঠিয়ে দেয়। এতে মাইক্রোবাসের সাত যাত্রী আহত হন।
তেজগাঁও ফায়ার স্টেশনের লিডার আবদুল হান্নান জানান, সৌদিপ্রবাসী মো. কায়েস মঙ্গলবার ভোরে দেশে ফেরেন। তাকে নিতে গ্রাম থেকে এসেছিলেন স্বজনরা। বিমানবন্দর থেকে সকালে সবাই মিলে মাইক্রেবাসটিতে করে গ্রামের বাড়ি নড়াইলের লোহাগড়ায় ফিরছিলেন।
ময়মনসিংহের নান্দাইল প্রতিনিধি জানান, জেলার নান্দাইলে সড়ক দুর্ঘটনায় সড়ক দুর্ঘটনায় দুজন নিহত হয়েছেন। একই ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন আরও দুজন। সোমবার রাত ১০টার দিকে নান্দাইল দেওয়ানগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের চানপুর গ্রামে নবাব আলী ব্রিজসংলগ্ন মসজিদের সামনে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানায়, চার যুবক একটি মোটরসাইে লে করে নান্দাইল সদরের দিকে আসছিল, পথে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি পিকআপের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা দেয়। এ ঘটনায় চার আরোহীর মধ্যে তিনজন গুরুতর ও একজন সামান্য আহত হন। পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠায়। তিনজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানে মধ্যরাতে চানপুর গ্রামের আলিম উদ্দিনের ছেলে সাগর ও শেরপুর গ্রামের শহর আলীর ছেলে সাজেদুল ইসলাম মারা যান।