বাংলাদেশে কোনো একটা ঘটনা বা দুর্ঘটনা ঘটলে আমরা প্রথম যে কাজটা করি, তা হলো দায় চাপানো। নিজের দায় এড়িয়ে, অন্যের ঘাড়ে দায় চাপানোতেই আমাদের সব আনন্দ। বেইলি রোড ট্র্যাজেডির পরও একই ঘটনা ঘটছে। ঢাকায় একটি নিরাপদ ভবন বানাতে ও সেখানে ব্যবসা পরিচালনা করতে অনেকগুলো সংস্থার অনুমোদন লাগে রাজউক, সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিস্ফোরক অধিদপ্তর; তালিকা অনেক লম্বা। যারা অনুমোদন দেন, তাদের দায় তো আছেই। তবে যারা ভবন বানান, যারা ডিজাইন করেন; দায় তাদেরও কম নয়। নিরাপদ হোক আর অনিরাপদ ঢাকার সব ভবনেরই অনুমোদন আছে। কারা অনুমোদন দিয়েছেন? যারা দেওয়ার তারাই দিয়েছেন। কীভাবে দিয়েছেন? সহজ হিসাব, ঘুষ খেয়ে দিয়েছেন।
কর্র্তৃপক্ষ না হয় ঘুষ খেয়ে অনিরাপদ ভবনের অনুমোদন দিয়েছেন। কিন্তু আমরা যারা ঘুষ দিয়ে অনুমোদন নিলাম, তারা কি নিজেদের স্বার্থটাও বুঝলাম না? অনিরাপদ যে ভবনটি আমরা অনিয়ম করে অনুমোদন নিলাম; সে ভবনে তো রাজউক, সিটি করপোরেশন বা ফায়ার সার্ভিসের কেউ থাকবে না। আমরাই থাকব, আমরাই ব্যবসা করব। নিজের ভালো নাকি পাগলেও বোঝে। আমরা কি পাগলের চেয়েও কম বুঝি! ঘুষ দিয়ে আমরা বিষ কিনে খাব? বিষ খেয়ে মরা আর আগুনে পুড়ে মরা তো একই কথা। কম দামে পেলে কি আমি ব্রেক ছাড়া গাড়ি কিনব? অনিয়ম করে বানানো ভবনে দুর্ঘটনা ঘটলে সেটা আসলে দুর্ঘটনা নয়, কাঠামোগত হত্যাকান্ড। এর দায় ভবন মালিক, ভবনের আর্কিটেক্ট, ব্যবসায়ী সবাইকেই নিতে হবে।
কোনো একটা ঘটনা বা দুর্ঘটনা ঘটলেই আমরা সবাই দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করি। বলা হয়, কোনো ঘটনায় কঠোর শাস্তি হলে সেটা দৃষ্টান্ত তৈরি করবে। যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর ব্যাপারে সতর্ক থাকে। শাস্তির ভয় তাকে নিবৃত করবে। কিন্তু বাংলাদেশে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু কারও সাজা হয় না। তাই দৃষ্টান্তও হয় না। নিমতলী, চুড়িহাট্টা, সীতাকুন্ডের বিএম ডিপো, মগবাজারের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ দুর্ঘটনার তালিকা অনেক লম্বা করা যাবে। এসব ঘটনায় শত শত মানুষ মারা গেছে। নিশ্চয়ই কেউ না কেউ দায়ী এই মৃত্যুর জন্য। ভবন মালিক, রাজউক, সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিস কারও না কারও দায় তো ছিলই। কিন্তু আজ পর্যন্ত এসব ঘটনায় কারও সাজা হওয়ার কথা শুনেছেন? আমি শুনিনি। অনুসন্ধান করেও দেখেছি। অধিকাংশ মামলাই ডিপফ্রিজে, নইলে ফাইনাল রিপোর্টের পর্যায়ে। তার মানে এতগুলো আগুনে এতগুলো মানুষের মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। তারা নিজে নিজে গিয়ে আগুনে ঝাঁপ দিয়েছিলেন! দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে দুর্ঘটনার নামে এ ধরনের হত্যাকান্ড চলতেই থাকবে। আপনি যখন জেনে যাবেন, যত অনিয়মই করেন, আপনার কিচ্ছু হবে না; তখন আপনি বারবার একই অপরাধ করতে থাকবেন। অপরাধীর শাস্তি না হলে আজ চুড়িহাট্টায়, কাল বেইলি রোডে, এরপর কোনো মার্কেটে, রেস্টুরেন্টে, ডিপোতে আগুন লাগবে; মানুষ মরবে, কিছুদিন হইচই হবে। আবার সব চুপচাপ। আবার আমরা অপেক্ষা করব নতুন কোনো ঘটনা বা দুর্ঘটনার জন্য। শাস্তিও হবে না, দুর্ঘটনাও কমবে না।
মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। প্রযুক্তিতে, বিজ্ঞানে মানব সভ্যতা এখন অনেক এগিয়েছে। কিন্তু কিছু কিছু দুর্যোগ বা দুর্ঘটনার সামনে মানুষকে এখনো অসহায় মনে হয়। অগ্নিকান্ড তেমনই এক দুর্যোগ। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের সামনে সব সভ্যতা, সব আবিষ্কারকে অর্থহীন মনে হয়। এমনিতে আগুন লাগতেই পারে, দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। কিন্তু আমাদের দায়িত্ব হলো, আগুন যাতে না লাগতে পারে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা। লাগলেও যাতে ক্ষয়ক্ষতি-প্রাণহানি কম হয়, তা নিশ্চিত করা। নগরজীবনে আগুন লাগার মূল কারণ বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট, সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, সিগারেটেরে ফেলে দেওয়া অংশ। চাইলেই কিন্তু অগ্নিকান্ড কমিয়ে আনা বা একেবারে বন্ধ করা সম্ভব।
অগ্নিকান্ড প্রতিরোধে সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই। তারপরও আগুন লাগতে পারে। নিশ্চিত করতে হবে আগুন লাগলেও যেন প্রাণহানি না হয়। প্রথম কথা হলো, সব ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা দেখি, অনেক ভবনেই ফায়ার এক্সটিংগুইশার থাকে। কিন্তু থাকে নামকাওয়াস্তে। প্রথম কথা হলো, কেউ সেটার ব্যবহার বিধি জানে না। দ্বিতীয়ত, বছরের পর বছর এই জিনিস ঝুলিয়ে রাখা হয়। মেয়াদ আছে কি নেই, তা দেখারও কেউ নেই। আগুন তো প্রতিদিন লাগবে না। যেদিন লাগবে, সেদিন যেন আমরা প্রস্তুত থাকতে পারি, তা নিশ্চিত করতে হবে। আবাসিক, বাণিজ্যিক সব ভবনের বাসিন্দাদের আগুনের ব্যাপারে সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে। আগুন লাগলে বেরোনোর রাস্তা পরিষ্কার রাখতে হবে। মালের ক্ষতি হলেও জানের ক্ষতি যেন না হয়। মালের ক্ষতি পোষানো যায়। জানের ক্ষতি পূরণ হয় না। যার যায়, শুধু সে-ই জানে।
অগ্নিকান্ডের সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের ওতপ্রোত সম্পর্ক। বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়ে অনেক অভিযোগ আছে। কিন্তু ফায়ার সার্ভিস নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই। কখনো কখনো আমরা অভিযোগ করি বটে। কিন্তু সেটা না জেনে করি। খবর পাওয়ার পর স্টার্ট করার জন্য তাদের সময় ৩০ সেকেন্ড। ঝড়ের বেগে বেরিয়ে যায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি। এটা নিয়ে কারও কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু রাস্তায় যানজটের কারণে, উৎসুক মানুষের ভিড়ের কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি সময়মতো পৌঁছাতে পারে না। এটা তো তাদের দোষ নয়। বাংলাদেশের ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যতটা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে, পৃথিবীর আর কোনো দেশ অতটা ঝুঁকি অনুমোদনই করে না। সীতাকুন্ডের বিএম ডিপোর আগুন নেভাতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের অন্তত ৯ জন কর্মী প্রাণ দিয়েছেন। বাংলাদেশের ফায়ার সার্ভিস এখন অনেক আধুনিক হয়েছে। অনেক আধুনিক অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ও সামগ্রী এসেছে। অনেক উঁচু ল্যাডার আনা হয়েছে। কিন্তু ঢাকা যেভাবে উঁচু হয়েছে, কোনো ল্যাডারের পক্ষেই তার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সম্ভব নয়। তাই বাঁচতে হলে জানতে হবে, সচেতন হতে হবে।
নিমতলী, চুড়িহাট্টা বা বিএম ডিপোর মতো রাসায়নিকের আগুন সাধারণ পানিতে নেভানো যায় না বটে। তবে আগুন নেভানোর মূল উপাদান পানি। ঢাকায় সবচেয়ে বড় সংকট এই পানির। ঢাকা সৃষ্টিকর্তার এক আশীর্বাদ। চারপাশে চারটি নদী ঘেরা এমন শহর বিশ্বেই বিরল। আমরা লিখি বটে, ঢাকা বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত। একসময় বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষেই ছিল এক চিলতে ঢাকা। বাড়তে বাড়তে ঢাকা এখন মেগাসিটি। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা- চারটি চমৎকার নদী আমাদের ঘিরে রেখেছে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার দেওয়া এই চমৎকার চারটি নদীকে আমরা দখলে-দূষণে মেরে ফেলতে বসেছি। ঢাকায় একসময় জালের মতো বিস্তৃত খাল ছিল। সেই খালে বড় বড় নৌকা চলত। অধিকাংশ খাল দখল হয়ে গেছে, রাস্তা হয়ে গেছে। যে দুয়েকটি টিকে আছে, সেগুলো আসলে এলাকার ডাস্টবিন। ধানমন্ডি লেক, গুলশান লেক, হাতিরঝিল ছাড়া বড় কোনো জলাধার নেই। পুকুর আছে হাতেগোনা। তাহলে আগুন লাগলে তা নেভানোর জন্য পানি পাবে কোথায় ফায়ার সার্ভিস? ঢাকায় অনেক কিছু হয়েছে। কিন্তু ফায়ার হাইড্রেন্টের সংস্কৃতি নেই। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জীবন দিতে পারবে, কিন্তু পানি ছাড়া তো আগুন নেভাতে পারবে না। পুরান ঢাকার অনেক সড়ক আছে, যেখানে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকাই মুশকিল।
সব দায় সরকার, রাজউক, সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিসের ঘাড়ে চাপিয়ে বসে থাকলে চলবে না। নিজেদের জীবন বাঁচাতে নিজেদেরও সচেতন ও সতর্ক হতে হবে। আগুনে পুড়ে গেলে তো দায় চাপানোরও সুযোগ পাব না।
লেখক: বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ
probhash2000@gmail.com