দেশের ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুরা বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ খাতে কাজ করছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বলছে, ৫টি খাতে ৩৮ হাজার ৮ জন শিশু কাজ করছে, যার ৯৭ দশমিক ৫ শতাংশই ছেলেশিশু। সবচেয়ে বেশি কাজ করে অটোমোবাইল ওয়ার্কশপে।
গতকাল বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে ‘সেক্টরভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত শিশুশ্রম জরিপ ২০২৩’ প্রকাশ করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শহীদুজ্জামান সরকার। বিশেষ অতিথি ছিলেন আইএলওর কান্ট্রি ডিরেক্টর টুওমো পতিয়ানান, ডেপুটি ব্রিটিশ হাইকমিশনার ম্যাট ক্যানেল ও পরিসংখ্যান বিভাগের সচিব ড. শাহনাজ আরেফিন। সভাপতিত্ব করেন মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।
বিবিএস বলছে, বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ৪৩টি সেক্টরকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে, বিবিএস সরকার ঘোষিত এই ঝুঁকিপূর্ণ তালিকা থেকে সেক্টরভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত শিশুশ্রম জরিপ-২০২৩ পরিচালনার জন্য পাঁচটি খাত নির্বাচন করেছে। এই সেক্টরগুলোকে ফোকাস করে, শিশুশ্রম বিরাজমান রয়েছে এবং জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন, সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই এই জরিপটি পরিচালনা করা হয়েছে।
এই নির্বাচিত সেক্টরগুলো মাছ, কাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ (শুঁটকি মাছ উৎপাদন), পাদুকা উৎপাদন (চামড়ার তৈরি পাদুকাশিল্প), লোহা ও ইস্পাত ঢালাই (ওয়েল্ডিংকাজ বা গ্যাস বার্নার মেকানিকের কাজ), মোটর যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত (অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ) এবং ৫ ব্যক্তিগত এবং গৃহস্থালি সামগ্রীর মেরামত (অনানুষ্ঠানিক এবং স্থানীয় টেইলারিং এবং পোশাক সেক্টর)।
জরিপের প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী, ৪০ হাজার ৫২৫টি প্রতিষ্ঠান এবং ৩৮ হাজার ৮ জন ৫-১৭ বছর বয়সী শিশু এই ৫ ঝুঁকিপূর্ণ খাতে কর্মরত আছে। ঝুঁকিপূর্ণ সেক্টরে কাজে নিয়োজিত শিশুদের মধ্যে ৯৭ দশমিক ৫ শতাংশ ছেলে এবং ২ দশমিক ৫ শতাংশ মেয়েশিশু।
জরিপের তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, এই ৫টি সেক্টরে শ্রমজীবী শিশুর সংখ্যা হলো যথাক্রমে শুঁটকি মাছ উৎপাদনে ৮৯৮, চামড়ার তৈরি পাদুকা তৈরিতে ৫ হাজার ২৮১, ওয়েল্ডিং বা গ্যাস বার্নার মেকানিকের কাজে ৪ হাজার ৯৯, অটোমোবাইল ওয়ার্কশপে ২৪ হাজার ৯২৩ এবং অনানুষ্ঠানিক এবং স্থানীয় টেইলারিং বা পোশাক খাতে ২ হাজার ৮০৫ জন। তথ্যানুযায়ী শ্রমজীবী শিশুদের সবচেয়ে বড় অংশ নিয়োজিত রয়েছে অটোমোবাইল খাতে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী শহীদুজ্জামান সরকার বলেন, ২০২৫ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের, তবে সেটি খুবই চ্যালেঞ্জিং। তিনি বলেন, ‘পরিসংখ্যানগুলোর ওপর ভিত্তি করে সমাধান বের করা হবে। সরকার এসব তথ্য ব্যবহার করে পরবর্তী কর্মসূচি হাতে নেবে। আপনারা দেখছেন, সরকার ইতিমধ্যেই মিড-ডে মিলের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
গ্রাম ও শহর বিবেচনায় এই খাতে কর্মরত শিশুর ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ পল্লী এবং ৬৪ দশমিক ৩ শতাংশ শহর এলাকায় বসবাস করে। এই জরিপের মাধ্যমে একটি শ্রমজীবী শিশু ঝুঁকিপূর্ণ সেক্টরগুলোতে কাজ করার সময় কী কী ধরনের বিপজ্জনক কাজ করতে পারে তা চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে।
আনুমানিক ১৯ দশমিক ১ শতাংশ ছেলে এবং ৭ দশমিক ৭ শতাংশ মেয়েশিশু ভারী বোঝা বহন, মালামাল টানার কাজে, অধিক ওপরে বা ফ্লোর থেকে অতি উচ্চতায় উঠে কাজ করে প্রায় ৮ দশমিক ১ শতাংশ ছেলে এবং শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ মেয়েশিশু।
আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থার (আইএলও) সহযোগিতায় বিবিএস বাংলাদেশে তার নিজস্ব পদ্ধতিতে এই জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এই জরিপে ৫টি ঝুঁকিপূর্ণ সেক্টরে নিযুক্ত ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের একটি জাতীয় প্রাক্কলন মূল্যায়ন করে।
এই জরিপের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল ২০২৩ সালের ৩ থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত। এ জরিপটি নির্বাচিত ৫টি সেক্টরে নিয়োজিত শিশুদের কাজের প্রকৃতি এবং শিশুদের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরে। জরিপ প্রতিবেদনটি এই সেক্টরগুলোর শ্রমজীবী শিশুদের জীবনের বিভিন্ন দিক যেমন পারিবারিক বৈশিষ্ট্য, আর্থসামাজিক বৈশিষ্ট্য এবং কর্মসংস্থান সম্পর্কিত প্রেক্ষাপট তুলে ধরে।