ঘরে-বাইরে

১৯৬৩ সালে দৈনিক সংবাদের মাধ্যমে শুরু করেন সাংবাদিকতা জীবন। ১৯৬৪ সালে দৈনিক পয়গাম ও আজাদে কাজ করার পর ১৯৬৫ সালে যোগ দেন ইত্তেফাকে। ঘরে-বাইরে শিরোনামে কলাম লিখতেন ‘সন্ধানী’ ছদ্মনামে। ২০১২ সালে ভূষিত হন একুশে পদকে। ছিলেন ইত্তেফাকের উপদেষ্টা সম্পাদক ও বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান। বরেণ্য এই সাংবাদিক ২০১৫ সালের ১৪ জুন মৃত্যুবরণ করেন। অতীতের সঙ্গে অধুনার সংযোগ ঘটানোর উদ্দেশ্যে ছাপা হচ্ছে সন্ধানীর সেই উপসম্পাদকীয়

শরৎবাবুর ‘চন্দ্রনাথ’ নিয়ে এক দফা ঝড় বয়ে গেছে। মৃত শরৎবাবু আপাতত আদালতের কাঠগড়া থেকে নিস্তার পেয়েছেন। আবার কোন ‘মহৎ ব্যক্তিয়’ পাল্লায় পড়ে হেনস্তা হতে হয় বলা যায় না। এখন ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েছে ঐতিহ্যবাহী যাত্রাশিল্প।

যাত্রা এবং ছায়াছবি সম্পর্কিত বিষয় হয়তো চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রপত্রিকায় লেখাই ভালো ছিল। কিন্তু একে এখানে টেনে আনতে হচ্ছে কতিপয় স্পষ্ট কারণে। এক, মানুষ, মানুষের সমাজ নিয়ে যে রাষ্ট্রনীতি আবর্তিত, সাংবাদিকতা তার প্রতি উদাস দৃষ্টি নিয়ে বসে থাকতে পারে না। কেননা মানুষ আর মানুষের সমাজই এ পেশার প্রধান উপজীব্য। তাই যেখানে সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, জন্ম-মৃত্যু সেখানে মূক ও বধিরের ভূমিকায় অভিনয় করা যায় না। ছায়াছবি এবং যাত্রা প্রসঙ্গটাও এখানে এ কারণেই এসেছে। সমাজে সুস্থ-সাবলীল একটা পরিবেশ গড়ে উঠুক প্রত্যেকে আমরা তা চাই। কিন্তু সুস্থ পরিবেশ জঙ্গলের আগাছার মতো নিজের পুলকে কণ্টকিত হয় না। কিছু লোককে কিছু দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হয়। সে দৃষ্টান্তের ওপর ভর করেই সমাজ এগিয়ে চলে। ‘চন্দ্রনাথ’ আমাদের ছায়াছবি জগতে একটি উত্তম দৃষ্টান্ত। বেগম বদরুন নাহার আলমগীর পিকচার্সের ব্যানারে ছবিটি তৈরি করেন। চমৎকার ছবি। দেখার এবং দেখে কিছু শেখার মতো ছবি। শরৎ সাহিত্য অবলম্বনে ছবি আগেও বহু তৈরি হয়েছে। কোনো সময়ই কোনো ছাড়পত্র নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। কোনো মহল সে প্রশ্নও তোলেননি। দেশের আইনে সে রকম প্রশ্ন তোলার অবকাশ থাকলে আগে যেসব ছবি তৈরি হয়েছে সেসব ছবির ক্ষেত্রেও তোলা যেত। কিন্তু তবু আত্মীয় বলে কথিত এক মহিলার নাম ভাঙিয়ে জনৈক ‘বিদগ্ধ ব্যক্তি’ মামলা ঠুকে দেন। কেউ কেউ বলেন এর উদ্দেশ্য ছিল ছবিটির মুক্তি বিলম্বিত করে ’৮৪-এর পুরস্কার থেকে বঞ্চিত করা। আমরা অবশ্য সে রকম কোনো মন্তব্য করার পক্ষপাতী নই। কার মনে কী আছে অন্তর্যামী জানেন। আমরা বিষয়টি দেখেছি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। সেটি ভালো-মন্দের বিতর্ক।

প্রায়ই অভিযোগ করা হয়, এ দেশে ভালো ছবি তৈরি হয় না। যদি এ অভিযোগ যথার্থ হয় তাহলে যিনিই ভালো ছবি নির্মাণ করার চেষ্টা করুন, তারই প্রশংসা পাওয়া উচিত। কিন্তু নিন্দার ব্যাপারে আমরা যত দরাজ-দিল, প্রশংসার ব্যাপারে ততটা নই। তখন কোথা থেকে সংকোচ এসে যেন পথরোধ করে দাঁড়ায়। এটা কি বাঞ্ছিত? যাত্রার প্রসঙ্গটি ভিন্ন প্রকৃতির। যাত্রা এ দেশের ঐতিহ্যবাহী লোকজ নাট্যসম্পদ। প্রাচীন সংস্কৃতির এ ধারা যুগ যুগ ধরে গ্রাম-বাংলার মানুষকে আনন্দ দিয়ে আসছে। যাত্রায় শুধু যে রাজ-রাজন্যবর্গের কাহিনী থাকে তা নয়, এতে ফুটে উঠে গ্রাম-বাংলার জীবনালেখ্য। তার, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের ছবি। যাত্রা থেকে উপাদান সংগ্রহ করেই দেশের ইতিহাস সমৃদ্ধ হতে পারে। অবশ্য সে ইতিহাস সমাজের ইতিহাস, দেশের সত্যিকার ইতিহাস ওপর থেকে ওপর-অলাদের নির্দেশে তৈরি সরকারি ইতিহাস নয়। পক্ষান্তরে যাত্রাশিল্প দেশের লাখ লোকের জীবন-জীবিকার উৎস। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১৫০ থেকে ১৬০টি যাত্রা দল আছে। শিল্পী, কলা-কুশলী মিলিয়ে এতে প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট লোকের সংখ্যা অন্যূন ১১ হাজার। এরা প্রত্যেকেই পরিবারের কর্তা, আর না হয় প্রধান অবলম্বন। প্রতিজনের পরিবারে গড় সদস্য সংখ্যা যদি সাতজন হয় তাহলে এদের ওপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল লোকের সংখ্যা প্রায় ৮৫ হাজার। এর ওপর আছে যাত্রা মঞ্চ তৈরি হতে মাইক সরবরাহকারী পর্যন্ত নানা শ্রেণির লোক। প্রতিটি যাত্রামঞ্চের জন্য গড়ে বিশ-বাইশ জন কর্মচারী নিয়োগ করতে হয়। বস্তুত সর্বসুদ্ধ এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত লোকসংখ্যা দুই লাখের কম নয়।

যাত্রার একটা বৈশিষ্ট্য এই যে, প্রধানত যাত্রা অনুষ্ঠিত হয় শীত মৌসুমে। শীতের সময় গ্রামাঞ্চলে তেমন কিছু কাজকর্ম থাকে না। গ্রামীণ সমাজ থাকে আপাত অবসর। এ ছাড়া এ সময়ই দেশ জুড়ে আয়োজিত হয় বিভিন্ন প্রকার মেলা। এ মেলায় যাত্রার আয়োজন হয়ে থাকে। শীত চলে যাওয়ার পর এ ক্ষেত্রে শুরু হয় ভাটার টান। গ্রীষ্ম এবং বর্ষা মৌসুমে যাত্রা প্রায় হয় না বললেই চলে। তখন যাত্রাশিল্পীরা অন্যান্য কাজে লিপ্ত হয়। মৌসুমের সময় যারা দু’পয়সা বেশি আয় করতে পারে তারা সে আয় সম্বল করে দিন কাটায় অথবা ছোটখাটো ব্যবসা করে। পক্ষান্তরে যাত্রায় কিছু শিল্পী থাকে যাদের অফ সিজনেও একটা মাসোহারা দেওয়া হয়। এদের বেশিরভাগই মহিলা শিল্পী। এই শিল্পী এবং কুশলীদের বেশিরভাগেরই জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস যাত্রা।

কারও পেটে লাথি মারা উচিত নয়। এই নিষ্ঠুর কাজ করার আগে দশবার চিন্তা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের মতো দেশে এ প্রয়োজন আরও বেশি। কারণ, এখানে একটা কাজ জোগাড় করা আর সুইয়ের ছিদ্রপথে উট প্রবেশ করানো প্রায় সমান কষ্টসাধ্য ব্যাপার। নানা কারণে কর্মসংস্থানের সুযোগ এখানে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। একজন অবসরগ্রহণ না করা বা মৃত্যুবরণ না করা পর্যন্ত আরেকজনের সুযোগ সৃষ্টি হয় না। এ অবস্থায় লাখ লোকের জীবন-জীবিকা নিয়ে টান দেওয়ার পূর্বে বহু কথা ভাবা উচিত। আরও উচিত ছিল, লোকজ সংস্কৃতির বিকাশ না বিনাশ আমাদের কাম্য তা বিবেচনা করা।

যাত্রা অনুষ্ঠানের জন্য আগে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্রই যথেষ্ট ছিল। ডিসির অনুমতি নিয়ে তখন যাত্রা করা যেত। হঠাৎ এ নিয়ম বদল করে জানানো হয় যে, শুধু ডিসির অনুমোদনে চলবে না। ডিসির অনুমোদন করার পরও ভিন্নতর মহল হতে ছাড়পত্র গ্রহণ করতে হবে। নিঃসন্দেহে বিষয়টা ছিল কঠিন এবং ব্যয়বহুল। ফলে যাত্রাশিল্পে সৃষ্টি হয়েছিল অচলাবস্থা। বহু দেন-দরবার এবং আবেদন-নিবেদনের পর শেষ পর্যন্ত কিছু কিছু অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু সম্প্রতি এক কোপে সব সাবাড় করে ফেলা হয়েছে। সরকার যাত্রা অনুষ্ঠানের ওপর এক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। এই নিষেধাজ্ঞার কী হেতু খবরে এর উল্লেখ নেই। তবে নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জেলা প্রশাসকগণ যাত্রা বন্ধ করে দিয়েছেন। দেশের যেখানে যত যাত্রা হচ্ছিল সেখানে এখন তা বন্ধ। হাজার হাজার কলাকুশলী, অভিনেতা-অভিনেত্রী এখন বেকার এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল লাখ লাখ লোকের জীবন বিপন্ন।

যাত্রাশিল্পের সঙ্গে তিন-চারজন শিল্পী এবং কুশলী সাক্ষাৎ করে জানিয়েছেন, ‘যাত্রা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা বেকার হয়ে পড়েছি। আয়ের বিকল্প কোনো পথ নেই। কী করে চলবে। বলতে পারেন?’ বলা বাহুল্য, এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার কোনো সাধ্য ছিল না। মাসের সাত দিন না যেতে যার নিজেরই চলার নিশ্চয়তা নেই, অন্যকে সে কি পরামর্শ দিতে পারে? তাই চুপ করে থাকা ছাড়া উপায় ছিল না। কিন্তু যে পেশার চাপরাস অঙ্গে ধারণ করেছি তা চুপ করে থাকতে দেয় না। তাই বিষয়টি তুলে ধরতে হলো। এতে ভালো জিনিসের পৃষ্ঠপোষকতা বাড়বে কিংবা যাত্রার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হবে, এত বড় আশা করতে পারি না। তবু বিষয়টি তুলে ধরলাম এ আশায় যে, ‘জীবনের ধন কিছুই যায় না ফেলা।’

লেখক: হাবিবুর রহমান মিলন

দৈনিক ইত্তেফাক

১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৫