ঠাকুরগাঁওয়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ২০১৪ সালে রাঙ্গাটুঙ্গি ইউনাইটেড মহিলা ফুটবল একাডেমি গড়ে তোলেন তাজুল ইসলাম। তৃণমূল ফুটবলে বিস্ফোরণ ঘটানো তাজুলের এই একাডেমি আজ সাড়া জাগিয়েছে গোটা দেশে। তার একাডেমি থেকেই উঠে এসেছেন সাগরিকা। যিনি সদ্য শেষ হওয়া অনূর্ধ্ব-১৬ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে হয়েছেন সর্বোচ্চ গোলদাতা।
শিষ্য সাগরিকার কীর্তিতে গুরুর অনুভূতিসহ নানান বিষয় নিয়ে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান এই ফুটবল একাডেমি গড়ে ওঠার নেপথ্য কাহিনীও।
সাগরিকার কীর্তিতে খুশি তাজুল বলেছেন, ‘সাগরিকা সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সেরা খেলোয়াড় হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। সাগরিকা আমার একাডেমি থেকে বেড়ে উঠেছে, গড়ে উঠেছে। ওর কীর্তিতে আমি ভীষণভাবে আনন্দিত। ঠাকুরগাঁও জেলা খুবই প্রত্যন্ত অঞ্চল। তাই সারা দেশের মতো ঠাকুরগাঁও জেলার মানুষও খুব আনন্দিত।’
এমনিতেই বাংলাদেশের সমাজ রক্ষণশীল। সেখানে ঠাকুরগাঁওয়ের প্রত্যন্ত একটা গ্রাম থেকে উঠে এসে দক্ষিণ এশিয়ায় সাড়া জাগিয়েছেন সাগরিকা। তার ফুটবলের আতুরঘর রাঙ্গাটুঙ্গি একাডেমিতেও ফুটবল খেলা শেখানো হয় মেয়েদেরকেই। শুধু মেয়েদেরকে নিয়েই একাডেমি গড়ার পেছনের কাহিনী জানতে চাইলে তাজুল ইসলাম শুনিয়েছেন নেপথ্যের গল্প।
বলেন, ‘আমি গ্রামে থাকি, একটা উপজেলা সদরে। শিক্ষকতা করতাম। যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলাম, তখন থেকেই আমার মধ্যে একটা বোধ কাজ করত, আমারও তো দেশের জন্য কিছু করা উচিত। আমি গ্রামে শিক্ষকতা করতাম, ওখানেই রাঙ্গাটুঙ্গি গ্রামের মাঠে একটা টুর্নামেন্ট হয়- আদিবাসী ওয়ানডে ফুটবল টুর্নামেন্ট। ২০১৪ সালে আমি একবার প্রধান অতিথি হিসেবে সেই টুর্নামেন্টে যাই। হঠাৎ দেখতে পাই একটা মেয়ে ফুটবল নিয়ে কারিকুরি দেখাচ্ছে। তখনই মাথায় আসে এদের নিয়ে চাইলেই একটা ফুটবল দল গড়া সম্ভব। আমি মেয়েটির কাছে জানতে চাই সে কিংবা তারা ফুটবল খেলতে চায় কি না। তারা আগ্রহ দেখায়। পরে তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বললে তাদের পক্ষ থেকেও সম্মতি আসে। সেখান থেকেই শুরু। শুরুর দিকে প্রায় ৯০ শতাংশ মেয়েই আদিবাসী সম্প্রদায় থেকে এসেছে। ধীরে ধীরে ওদের উন্নতি দেখে অন্যরাও এগিয়ে আসা শুরু করে।’
শুধু সাগরিকাই না। সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়ন দলের তিনজন এই একাডেমি থেকে উঠে আসা। এমনকি ২০১৬ সালে জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া মুন্নি আক্তার আদরিও এই একাডেমির। সব মিলিয়ে ১৬ জন মেয়েকে জাতীয় দলের ফুটবলার হিসেবে গড়ে তুলতে পেরেছে তাজুল ইসলামের একাডেমি। একাডেমির এযাবৎকালীন সাফল্যগাথা কেমন? জানতে চাইলেই এই তথ্য।
তাজুল বলেন, ‘শুধু সাগরিকা আমার মাঠ থেকে আসেনি। রাঙ্গাটুঙ্গির মুন্নি আক্তার আদরি ২০১৬ সালে প্রথম জাতীয় দলে সুযোগ পায়। তারপর সাগরিকা, কাকলী, হান্না, কল্পনা, কোহাতি, রঞ্জনা, মমতাজ, শাবনুরদের মতো অনেকে বয়সভিত্তিক বিভিন্ন দলে পৌঁছেছে। সব মিলিয়ে ১৬ জন জাতীয় ও বয়সভিত্তিক দলে খেলেছে।’
তাজুল যোগ করেন, ‘২০২২ সালে সিনিয়র সাফ চ্যাম্পিয়ন দলের স্বপ্না রানী ও সোহাগী কিসকু রাঙ্গাটুঙ্গি থেকে উঠে এসেছে। জাতীয় দলের ক্যাম্পে ওরাসহ এখন তিনজন খেলোয়াড় রয়েছে। নেপালে সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়ন দলের তিনজন আমাদের একাডেমির। ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে সমতাসূচক গোলের কর্নার কিক নেওয়া অনন্যা মুর্মু বীথি রাঙ্গাটুঙ্গির। আর দুজন হলেন রেশমী ও সুমি। অনূর্ধ্ব-১৯ চ্যাম্পিয়ন দলের সহ অধিনায়ক স্বপ্না ও সাগরিকাকে এখন সবাই চেনেন। এ মাসের ২৮ তারিখ বিকেএসপি একটি টুর্নামেন্ট খেলতে স্পেনের মাদ্রিদে যাবে। সেই দলেও রাঙ্গাটুঙ্গির দুজন রয়েছে আফসানা ও কবিতা।’
ফুটবল অন্তপ্রাণ তাজুল অবশ্য পেশায় কলেজ শিক্ষক ছিলেন। রানীশংকৈল কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। অবসর নিয়েছেন ২০২০ সালে। ষাটোর্ধ্ব তাজুলের ভাবনা এখন এই একাডেমিকে নিয়ে। স্বপ্ন দেখেন একাডেমির মান বাড়ানোর। ভবিষ্যতে এটাকে একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়াই তার লক্ষ্য।
দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের একাডেমিতে ৪০ জন খেলোয়াড় রয়েছেন। এর মধ্যে অনূর্ধ্ব-১৪ পর্যায়ে আছে প্রায় ২০ জন। এখন আমার স্বপ্ন হলো একাডেমিটাকে একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। এর জন্য কয়েকটা বিষয় প্রয়োজন। সবার আগে মাঠ। আমাদের মাঠ আছে কিন্তু সেটা গ্রামের বুনো মাঠ। স্ট্যান্ডার্ড লেভেলে খেলতে গেলে ন্যূনতম পর্যায়ে মাঠের অবস্থা যা হওয়া উচিত, তেমন সুন্দর একটি মাঠ দরকার। নিয়মিত প্রশিক্ষক প্রয়োজন। প্রয়োজন খেলোয়াড়দের পুষ্টিমান নিশ্চিত করা। নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পুষ্টির চাহিদা পূরণের জন্য যে অর্থসংস্থান দরকার সেটির অভাব রয়েছে।’
তাজুল যোগ করেন, ‘আরেকটা জিনিস প্রয়োজন, আর সেটা হলো অবকাঠামো। আমাদের জেলা প্রশাসকের সহযোগিতায় একটি কমপ্লেক্স হয়েছে। এখন এখানে একটা জিমের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। ফিটনেসের জন্য একটা জিমের খুব প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি আমরা। এ ছাড়া খেলোয়াড়দের বছরে ৩ জোড়া বুট প্রয়োজন হয়। এভাবে ৪০ জন খেলোয়াড়ের পেছনে কিছু খরচ থাকেই। সব মিলিয়ে বছরে ৮-১০ লাখ টাকা প্রয়োজন হয় একাডেমি চালাতে।’
একাডেমির খরচ চালাতে প্রধানমন্ত্রীসহ দেশের বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানান তাজুল বলেন, ‘বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গণের অভিভাবক মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমরা যারা প্রান্তিক পর্যায়ে কাজ করছি তাদের জন্য আর্থিক কিংবা লজিস্টিক (উপকরণভিত্তিক) সহযোগিতা প্রত্যাশা করি। দেশের বিত্তবানদের প্রতিও আমার একই অনুরোধ। যাতে করে রাঙ্গাটুঙ্গির মতো প্রান্তিক একাডেমিগুলো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।’
নারী ফুটবলের ঘরোয়া কাঠামোর বর্তমান করুণ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বাফুফের মনযোগ বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে তাজুল বলেন, ‘আমি মনে করি আপনি যদি কোনো লক্ষ্যে পৌঁছাতে চান, তাহলে খেলোয়াড়দের শুধু অনুশীলন নয় খেলার জায়গা দিতে হবে। সে জন্য লিগ চালু রাখাটা খুবই দরকার। এতে খেলোয়াড়রা একটা চর্চার মধ্যে থাকে। সে বুঝতে পারে তার অবস্থানটা কোথায়। সে অনুযায়ী নিজেকে তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক সাপোর্টের একটা ব্যবস্থা হয়। এটাও কিন্তু খুব জরুরি। নিজেকে তৈরি করার জন্য যেমন খেলা প্রয়োজন, তেমনি জীবিকার জন্যও প্রয়োজন। সুতরাং লিগ যদি বন্ধ হয়ে যায় বা যেভাবে চলছে এভাবে চলতে থাকে, একটা সময়ে এসে সবাই উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে। আর মেয়েরা যদি উৎসাহ হারিয়ে ফেলে তাহলে আমি বা আমার মতো কেউ চাইলেও ফুটবল আর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে না। বাফুফের এই দিকে অনিবার্যভাবে মনোযোগ দেওয়া দরকার।’
কলসিন্দুর, রাঙ্গাটুঙ্গির মতো প্রান্তিক জায়গাগুলো থেকে বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলে-জাতীয় দলে খেলোয়াড় আসছে। তাদের পায়ের জাদুতে সাফল্যও পাচ্ছে বাংলাদেশ। তারপরও নারী ফুটবলারদের ভবিষ্যৎ যে অনিশ্চিত। এ বিষয়ে তাজুল বলেন, ‘দেখুন একজন চাকরি থেকে অবসরে গেলে সে পেনশন পায়। তেমনিভাবে একজন খেলোয়াড় যখন অবসরে যায়, আমার মনে হয় তাকে কিছু সম্মানী দিয়ে অবসরে পাঠানো উচিত।’
তাজুল যোগ করেন, ‘আমাদের বাফুফে সভাপতি এক মিটিংয়ে বলেছিলেন, প্রান্তিক পর্যায় থেকে কোনো খেলোয়াড় যখন আসবে, তখন সেই খেলোয়াড়কে পেলাম যাদের সুবাদে, সেই একাডেমিকে সম্মান জানাতে উৎসাহমূলক অর্থ প্রদান করা হবে। আমার কাছে মনে হয় এ প্রস্তাবটি যথোপযুক্ত ও অত্যন্ত সময়োপযোগী ছিল। সেটি আলোর মুখ দেখেনি। সে রকমভাবে একজন খেলোয়াড় যখন দেশের জন্য খেলে অবসরে যাবে বা দেশকে সার্ভিস দেওয়ার পরে থাকবে না, সেই খেলোয়াড়কেও সম্মান জানানো উচিত। সেটা হতে পারে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে।’
প্রান্তিক প্রান্তর থেকে ফুটবল অঙ্গনে বিস্ফোরণ জাগানো এই সংগঠককে নাড়া দিয়েছে সাফজয়ী ফুটবলার রাজিয়ার অকালমৃত্যুও। তিনি বলেন, ‘একটা মানুষ যখন দেশের জন্য কিছু করছে, তখন জাতির কাছেও তো তার একটা পাওনা থাকতেই পারে। জাতীয় পর্যায়ে অবদান রাখা আমাদের সাদি ভাই মারা গেলেন, রাজিয়া মারা গেলেন। সবাই কি এভাবেই চলে যাবে। এ গল্প আর কত দিন চলবে?’