আমি তখন সাপ্তাহিক একতার ফটোগ্রাফার। একতা থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি তোলার অ্যাসাইনমেন্ট পেলাম। ১৯৭৩ সালের ১৭ মার্চ, বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন। আমি ভোরবেলাই চলে গেছি ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে। ছবি তোলার জন্য নিচে অপেক্ষা করছি। বঙ্গবন্ধু নামলেন। বসার ঘরে এসে বসলেন। খেলাঘরের শিশুরা বঙ্গবন্ধুকে ফুল দিল। তারা ‘আমরা করবো জয়’ গানটা গাচ্ছিল। ছবি তুলে যখন গাড়ি বারান্দায় এসেছি, তখন শেখ কামালকে দেখলাম। কামাল ভাই আর মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ভাই ওখানে দাঁড়ানো ছিলেন।
রাস্তায় লোকজনের ভিড়। কেউ পিঠা নিয়ে এসেছেন, কেউ ফল নিয়ে। ওর মধ্যে কয়েকটা কেকও দেখলাম। ওগুলো কেটে কামাল ভাই সবাইকে খেতে দিচ্ছিলেন। আমাকে একটা পিস দিয়ে বললেন, তুমি কোথায় কাজ করো? জানালাম সাপ্তাহিক একতায়। কামাল ভাই বললেন, ‘তুমি কি আমাদের আবাহনীর ছবি তুলে দিবা?’ আবাহনী! আবাহনী শুনেই তো আমার হার্টবিট বেড়ে গেল। আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বঙ্গবন্ধুর ছেলে। তিনি আমাকে কমান্ড করতে পারতেন। তার বদলে তিনি অনুরোধের মতো করে বলেছেন। কামাল ভাই আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কি আবাহনী অফিস চেনো?’ আমি বললাম, না। আবাহনীর অফিস তখন ছিল জাফরাবাদে। মানে শংকরের গলির ভেতরে। বললেন, ‘তুমি সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে চলে আসবে। আমরা সবাই বঙ্গবন্ধুকে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য গণভবনে যাব।’ আমার তখন নাচার মতো অবস্থা!
ওখান থেকে পল্টনের স্টুডিও শাহজাহানে এলাম, যেখানে সব ফটো সাংবাদিকরা ছবি প্রিন্ট করেন। সবাইকে বললাম এই কাহিনি। আমার আর সময় কাটছে না। কখন যে ৭টা বাজবে। ৭টা বাজার একটু আগেই চলে গেলাম জাফরাবাদে। গেটে লোকমান আমাকে আটকে দিল। লোকমান দেখতে খুবই কালো। ও সবাইকে মাসাজ করত। আমাকে দেখে সে খুব গম্ভীর হয়ে বলল, কোথায় যাবেন? আমি বললাম, ভেতরে যাব। জিজ্ঞেস করল কার কাছে যাবেন? বললাম, আমাকে কামাল ভাই পাঠিয়েছেন। বলামাত্র লোকমানের মুখের সাদা দাঁত বেরিয়ে এলো। সঙ্গে সঙ্গে বলল, আসেন আসেন। আমি আবাহনীর ম্যানেজার সুভাষ বাবুর রুমে গিয়ে বসলাম। একটু পরেই দেখি শর্টস পরে সালাহউদ্দিন, নান্নু, অমলেশ দাস। তারা তখন স্টার।
কিছুক্ষণ পর কামাল ভাই এলেন। এসেই যেন খুব দেরি হয়ে গেছে এভাবে সবাইকে বলছেন, এই ওঠো ওঠো। চার-পাঁচটা গাড়ি। সবাই গাড়িতে উঠে পড়ল। আমি দাঁড়িয়ে আছি। কামাল ভাই আমাকে দেখেছেন কি না তাও বুঝতে পারছি না। হঠাৎ কামাল ভাই আমাকে বললেন, আরে তুমি আমার গাড়িতে আসো। তার ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে আমাকে বসালেন। তার সঙ্গে গণভবনে যাচ্ছি। অন্যরকম একটা ফিলিংস। গণভবনের গেট ক্রস করলাম। আবাহনীর পুরো টিম এবং অফিশিয়ালরা ছিলেন।
আমরা ঢুকলাম গণভবনে। আমি দূর থেকে যে শর্টটা মিস করলাম, সেই শর্টটার জন্য আজও আফসোস হয়। বঙ্গবন্ধু সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে বসে আছেন। তার পাশে সবুজ লনের লাইটগুলো জ্বলছে। আকাশে তখনো আলো আছে। তখন আমি অত ফাস্ট না। আমার ক্যামেরাও না। ক্যামেরা রেডি করতে করতে সবাই বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে ফেললেন। আমি আর ওই ছবিটা তুলতে পারলাম না।
কামাল ভাই ফুলের মালা দিচ্ছেন, বঙ্গবন্ধু হাসছেন। কামাল ভাই সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। অমলেশদা ইনজুরড হয়েছিলেন, বঙ্গবন্ধু তার খোঁজখবর জিজ্ঞেস করছেন। হঠাৎ কামাল ভাইয়ের কণ্ঠ ‘পাভেল, পাভেল’। কামাল ভাই তো বঙ্গবন্ধুর কাছে। আমি উল্টা দিকে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছি। কাছে গেলাম। যাওয়ার পরেই কামাল ভাই আমার পিঠে ধাক্কা দিয়ে বললেন, আব্বা, ও হচ্ছে আমাদের আবাহনীর ফটোগ্রাফার। আমি তো তখন ফটোগ্রাফারও না তেমন। আমি একদম জড়সড় হয়ে গেছি। আমার আর পা চলছে না। তখন কামাল ভাই আবার ধাক্কা দিলেন। বঙ্গবন্ধু রিলাক্স হয়ে বসেছিলেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘কী! তোদের আবাহনীতে আবার ফটোগ্রাফার আছে নাকি!’ কামাল ভাই বলছেন, ‘হ্যাঁ আব্বা, আছে তো। ও হচ্ছে পাভেল।’
পাভেল নামটা কামাল ভাই খুব পছন্দ করতেন। আমার নামটা বলার সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধু আমার হাতটা ধরে টান দিলেন। এমনভাবে টান দিলেন যে আমি ক্যামেরাসহ বঙ্গবন্ধুর গায়ের ওপর গিয়ে পড়লাম। বঙ্গবন্ধু একটা নিচু চেয়ারে বসেছিলেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘পাভেল! কী চমৎকার নাম তোমার!’ তিনি ওনার ডান হাত দিয়ে আমার বাম গালে আদর করলেন। বঙ্গবন্ধুর পার্সোনাল ফটোগ্রাফার মোহাম্মদ আলম ভাই কিন্তু দাঁড়ানো। তিনি ছবিটা তুললেন না। বঙ্গবন্ধু জানতে চাইলেন, ‘তোমার বাবার নাম কী?’ আমি বললাম, মজিবর রহমান। তিননি বললেন, ‘আমার নামও মুজিবুর রহমান’। একদম শিশুর মতো আর কী। ওই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার পরিচয়।
[সাহাদাত পারভেজ রচিত ‘আলোকচিত্রালাপ : পাভেল রহমানের সঙ্গে’ গ্রন্থ থেকে]