‘প্রতিবাদ করাই আমার ভুল ছিল, সব সময় নিরাপত্তাহীনতয় ভুগি’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অপমৃত্যু উত্তাপ সৃষ্টি করেছে। একে একে বেরিয়ে আসছে রহস্য। গত শুক্রবার ফাইরুজ অবন্তীকার আত্মহত্যার পর এখন সবার নজরে আসে আরেক শিক্ষার্থীর যৌন হয়রানির অভিযোগ।

ফাইরুজের মতো শিক্ষক কর্তৃক যৌন হয়রানি ও কুপ্রস্তাবের শিকার হন ফিল্ম ও টেলিভিশন বিভাগের ১৩তম আবর্তন ব্যাচের এক শিক্ষার্থী। আজ ১৮ মার্চ (সোমবার) দেশ রূপান্তরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজেই এ তথ্য জানিয়েছেন তিনি।

ঘটনার শুরু কিভাবে জানতে চাইলে তিনি জানান, দুই বছর আগে ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগের শিক্ষক আবু শাহেদ ইমন কতৃর্ক যৌন হয়রানি ও মানসিক অত্যাচারের শিকার হন তিনি। এখনো বিচার পাননি। বরং নানাভাবে তাকে নির্যাতন করা হচ্ছে ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তাকে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি তাকে ও তার মা-বাবাকে অভিযোগ প্রত্যাহারের চাপ দেওয়া হয়েছে।

সাক্ষাৎকারে ওই শিক্ষার্থী বলেন, কুপ্রস্তাবে রাজি না হয়ে অন্যায় করেছি বলে আমার মনে হয়। কারণ আমার চরিত্র নিয়ে কথা বলে। কোনো নারী শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে আমাকে দরজা আটকে জোর জবরদস্তি করা হয়। আমি হয়তো অবন্তীর মতো সাহসী হতে পারিনি। তার জন্য হয়তো আমি মারা যাই নাই। কে জানে এর পর আমি বেঁচে থাকব কি-না। কিন্তু মূল্যহীন হয়ে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া শ্রেয়। আমাকে একঘরে করে দিয়েছে শিক্ষকেরা। আমাকে অনার্সের ভাইভায় ফেল করানো হয়েছে। প্রতিবাদের ফলস্বরূপ আজকে আমি অনার্স ফেল এবং আমার জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই।

তিনি বলেন, আমি যখন অভিযোগ দায়ের করি, তখন কোনো সেল ছিল না। কোনো সেল না থাকায় আমাকে সরাসরি উপাচার্য স্যার বরাবর অভিযোগ দায়ের করতে হয়েছিল। উপাচার্য স্যার বরাবর অভিযোগ দায়ের করায় আমার ওপর অনেক ধরনের প্রেশার আসে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছি তারা আমার গ্রামের বাড়িতে পর্যন্ত গিয়েছিল। আমার বাবা-মা অসুস্থ, তাদের ওপর প্রেশার করেছে অভিযোগ প্রত্যাহার করার জন্য। অভিযোগ প্রত্যাহার না করায় আমাকে বিভাগের রুমে কোনো নারী শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে দরজা আটকে জোর জবরদস্তি করা হয়।

ওই ছাত্রী আরও বলেন, আমার একটা অভিযোগ দায়ের করার কারণে ওইটা যেন অপরাধ হয়ে উঠেছে। আমাকে এইট সেমিস্টারে ফেল করানো হয়েছে। আমার অ্যাসাইনমেন্ট টিচাররা নিতে চায় না। আমাকে সেভেন সেমিস্টারে ফেল করানো হয়েছে। আমাকে অনার্স ফাইনাল ইয়ারের ভাইভায় ফেল করানো হয়েছে।

তিনি বলেন, আমি আজীবন পড়াশোনা ব্যতীত কিছুই করিনি। আমি ননপলিটিক্যাল ছাত্রী। আমি কোনো অর্গানাইজেশনে জড়িত না। সেখান থেকে আমার জন্য সহজ ছিল না প্রতিবাদ করার। আমার দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার কারণে প্রতিবাদ করেছি। সেই প্রতিবাদের ফলস্বরূপ আজকে আমি অনার্স ফেল। প্রতিবাদ করা আমার অন্যায় ছিল। আমার বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে আমি মিশতে পারি না। আমার কি তাহলে উচিত ছিল ওই শিক্ষকের কুপ্রস্তাবে রাজি হওয়া। আমি রাজি না হয়ে অনেক বড় অন্যায় করেছি।

তিনি আরও বলেন, আজকে যে অবন্তীকা মারা গেল, দেড় বছর আগে থেকে যুদ্ধ করে আসছে- মেয়েটা যদি বিচার পেত তাহলে কি আজ মারা যেত? এটা তো খুন। এটা টেকনিক্যালি মার্ডার। এভাবে সমাজে একের পর এক মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের খুন করে ফেলা হচ্ছে। সে বিচার পেলে আজ এঘটনা হতো না।

অভিযুক্তের বিষয়ে ওই শিক্ষার্থী আরও জানায়, উনি ছিলেন ইমপ্রেস টেলিফিল্মসের একজন এক্সিকিউটিভ প্রডিউসার। উনি সিনেমা নির্মাণ করেন, আবার আমার বিভাগের লেকচারার ছিলেন। এখনো উনি বহল আছেন। উনি আমাকে কাজে জন্য উনার অফিস রুমে ডেকে নিয়ে হেনস্তা করেন। এটা নিয়ে আমি অনেকদিন ভুগেছি। আমার বাবাকে বলা হচ্ছে- আপনার মেয়েকে বহিষ্কার করে দেব।

নতুন করে যে কিমিটি করা হয়, এখন যিনি ভিসি আছেন তিনি ওই কমিটির একজন সদস্য ছিলেন। ভিসি সাদেকা হালিম ম্যাডাম অনেক নারীবান্ধব। কিন্তু ম্যাডামের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও আমি এখন পর্যন্ত বিচার পেলাম না। কয়েক দফা রিপোর্ট আসা সত্ত্বেও ওই আবু শাহেদ ইমন যিনি শিক্ষক এবং উনাকে সাহায্যকারী আমাদের বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক জুনাইদ হালিম এতগুলো তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আসার পরও উনারা সুপ্রিম কোর্টে রিট করেছেন। একজন শিক্ষক কতটা বেহায়া হলে নিজের দোষ ঢাকতে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যায়। সুপ্রিম কোর্ট থেকেও তারা হেরে গেছেন। তারা সিন্ডিকেটের প্রতিবেদন না মেনে সুপ্রিম কোর্টে রিট করেছেন।

ওই বিভাগের অন্য শিক্ষার্থীরা অভিযোগ না করা প্রসঙ্গে ওই শিক্ষার্থী বলেন, ফেল করার ভয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক আবু শাহেদ ইমনের বিরুদ্ধে ছাত্র-ছাত্রীরা কোনো কথা বলে না। আমিতো ফেল করে গেছি। আমারতো স্টুডেন্ডশিপের কোনো ভয় নেই। আমি রাস্তা দিয়ে যখন চলাফেরা করি- তখন আততায়ীরা আমাকে মেরে ফেলতে পারে। আমি সারাক্ষণ অনিরাপত্তায় ভুগি। আমার পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। একজন শিক্ষার্থী যখন যৌন হয়রানির অভিযোগ দেয়- তখন তার চরিত্র নিয়ে যেসব কথা বলা হয় তা প্রকাশ করা যায় না।

ভিক্টিম দেশ রূপান্তরকে আরও জানান, আমি আমার অন্যায়ের বিচার চাই। আমি আমাদের ভিসি সাদেকা হালিম ম্যামের কাছে বিচার চাই। উনার প্রতি আমি আশ্বস্ত। অবন্তীর মতো আর কোনো প্রাণ যেন না ঝরে।

এবিষয়ে চানতে চাইলে উপাচার্য সাদেকা হালিম বলেন, আমি আসার আগের ঘটনার দায়ভার আমি নেব না। তবে আমি এখন সেগুলো নিয়ে সোচ্চার হব। পরবর্তী সিন্ডিকেট সভায় এসব বিষয়া উত্থাপিত হবে। সবার বিরুদ্ধে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিভাগের চেয়ারম্যানের পরীক্ষায় কেন সে তিন পেল এই বিষয়টি দেখার জন্য উনার সাথে মিটিং এ বসব।

অভিযুক্ত শিক্ষককে একাধিকবার ফোন করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক জুনাইদ হালিমের সাথে যোগাযোগ করতে গেলে উনি সাংবাদিকের সাথে অপ্রত্যাশিত আচরণ করেন।