অবহেলায় ৩৪ লাখ পথশিশু

বলা হয় ইট টেকস আ ভিলেজ টু রেইজ আ চাইল্ড একজন শিশুকে বেড়ে তোলার জন্য গোটা একটি গ্রামের দরকার। মানবশিশু অন্য অনেক প্রাণীর মতো একা বড় হতে পারে না, তার দরকার যতœ, স্নেহ এবং পরিচর্যা। অথচ, বাংলাদেশের অগণিত শিশু পরিত্যক্ত অবস্থায় বড় হচ্ছে চরম অনাদর আর অবহেলায়। সংখ্যাটা অনেক ৩৪ লাখ। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও ইউনিসেফ বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে ‘চাইল্ড সেনসিটিভ সোশ্যাল প্রোটেকশন ইন বাংলাদেশ ফেইজ-২’ প্রকল্পের অধীনে পরিচালিত এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে।

‘বাংলাদেশে পথশিশুদের পরিস্থিতি-২০২৪’ শীর্ষক এই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চরম দারিদ্র্য, পারিবারিক অস্থিরতা এবং শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের পটভূমি থেকে বেড়ে ওঠা শুরু হয় পথশিশুদের। অর্থনৈতিক চাপ প্রায়ই এসব শিশুকে শ্রমে বাধ্য করে, তাদের শিক্ষার সুযোগ কমিয়ে দেয় এবং দারিদ্র্যের একটি চক্রকে স্থায়ী করে। পিতা-মাতার অবহেলা, অপব্যবহার এবং পরিত্যাগসহ পারিবারিক কর্মহীনতা সরাসরি তাদের রাস্তায় বেরিয়ে আসতে প্রভাবিত করে। গবেষণাপত্রে বলা হয়, পথশিশুরা বেঁচে থাকার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে, যার মধ্যে রয়েছে জনগণের সহানুভূতি চাওয়া, অনানুষ্ঠানিক শ্রমে জড়িত হওয়া এবং কিছু ক্ষেত্রে অবৈধ কার্যকলাপের অবলম্বন করে।

বাংলাদেশে অনেক পথশিশু থাকার তথ্য দিয়ে ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি শেলডন ইয়েট বলেন, তাদের জীবন আমাদের থেকে অনেক আলাদা এবং কঠিন। এই রিপোর্টের মাধ্যমে এসব শিশুর প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। এই রিপোর্টে শুধু চ্যালেঞ্জগুলোই তুলে ধরা হয়নি; বরং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উপায়ও বলে দেওয়া হয়েছে। পথশিশুরা তাদের দৈনন্দিন জীবনে যে সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হচ্ছে তা মোকাবিলার জন্য একটি সমন্বিত নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের জন্য সুপারিশও করা হয়েছে।

সুপারিশগুলোতে অরক্ষিত পরিবারের জন্য অর্থনৈতিক সহায়তা, কাউন্সেলিং এবং শিক্ষায় প্রবেশাধিকার প্রদানের নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও  শিক্ষা ও দক্ষতা বিকাশের সুবিধার্থে পথশিশুদের জন্য উপযোগী শিক্ষা এবং বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান করার কথা বলা হয়েছে সুপারিশে। পাশাপাশি নারী ও শিশুদের জন্য সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী ও প্রসারিত করা, আইনি ও সামাজিক সুরক্ষার উন্নতি করা, জনসচেতনতা ও অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো এবং সরকার থেকে এসব শিশু ও নারীর জন্য তহবিল বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

এসবের বাইরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি। ইউনিসেফ বাংলাদেশের চাইল্ড প্রোটেকশন সেকশন চিফ নাটালি ম্যাক্কলি বলেন, পথশিশুদের বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। মানুষ যেন এসব শিশুর প্রতি সহানুভূতিশীল হয়, তার জন্য সচেতনতার প্রয়োজন। একই সঙ্গে এসব শিশুর জন্য সরকারি প্রকল্প নিতে হবে। শিশুদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সমাজকল্যাণমন্ত্রী দীপু মনি আশ্বাস দিয়েছেন শিশুরা যেসব বিপজ্জনক কাজে জড়িত, তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সরকার কাজ করছে। একই সঙ্গে তিনি মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে আহ্বান জানিয়েছেন সরকার ও এনজিওর বাইরে তারাও যেন অন্তত একটি করে শিশুর দায়িত্ব নেওয়ার চেষ্টা করেন। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সিমিন হোসেন রিমি বিত্তশালীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।

শিশুদের অযত্নে অবহেলায় বড় হওয়া কেবল যে একটি বড়সড় মানবিক বিপর্যয় তাই না, দেশের ভবিষ্যতের জন্য এক মারাত্মক হুমকিও।